
মাহমুদুল হাসান চন্দন
পদ্মা পাড়ের দুই গর্ব—ঐতিহাসিক হার্ডিঞ্জ ব্রিজ ও লালন শাহ সেতু এখন বালুর পাহাড়ের আড়ালে ঢাকা পড়েছে। কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা প্রান্তে সেতুর গোড়ায় গড়ে ওঠা বিশাল বালুর স্তূপের কারণে চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে এই গুরুত্বপূর্ণ দুই স্থাপনা। বিষয়টি নিয়ে জনমনে ক্ষোভের সৃষ্টি।
সরেজমিনে দেখা যায়, শতবর্ষী রেল সেতু হার্ডিঞ্জ ব্রিজ এবং পাশে অবস্থিত সড়ক সেতু লালন শাহ সেতুর পিলারের কোল ঘেঁষে দিনের পর দিন বালু স্তূপ করে রাখা হয়েছে। স্থানীয় প্রভাবশালী একটি চক্র রেলওয়ের জায়গা লিজ নেওয়ার দোহাই দিয়ে বছরের পর বছর এখানে বালুর রমরমা ব্যবসা চালিয়ে আসছিল। বালুর পাহাড়গুলো এতই উঁচু হয়েছিল যে, দূর থেকে সেতু দুটির সৌন্দর্য দেখা তো দূরে থাক, সেতুর নিচের মূল কাঠামো পর্যন্ত চোখে পড়ে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সেতুর পিলারের এতো কাছে বালু স্তূপ করে রাখা এবং ভারী ট্রাকে করে বালু পরিবহন করার ফলে সেতুর কম্পন ও স্থিতিশীলতা নষ্ট হতে পারে। এটি কেবল সৌন্দর্য নষ্ট করছে না, বরং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই 'কেপিআই' (Key Point Installation) এলাকাকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
এ বিষয়ে গত ৫ এপ্রিল বিকেলে ভেড়ামারা উপজেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) ডা. গাজী আশিক বাহারের নেতৃত্বে একটি বিশেষ উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। অভিযানে সেতুর পাশে অবৈধ দোকানপাট ও অস্থায়ী স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। এর আগেও ২০২৩ সালের জুলাই মাসে বালু সরানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু ব্যবসায়ীরা তা আমলে নেয়নি।
রেলওয়ের পাকশী বিভাগীয় কর্মকর্তারা জানান, ইতিপূর্বে অবৈধ বালুর স্তূপ সরিয়ে নিতে সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। রেলওয়ের পাকশী বিভাগীয় সেতু প্রকৌশলী আরিফুল ইসলাম বলেন, “ঐতিহাসিক এই ব্রিজের পিলারের কাছে বালু রাখা বা উত্তোলন করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। আমরা বিষয়গুলো খতিয়ে দেখে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছি।”
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, শুধুমাত্র লোকদেখানো অভিযান নয় বরং প্রভাবশালী সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে চিরস্থায়ীভাবে এই ‘বালুর খোলা’ বন্ধ করতে হবে। নতুবা অচিরেই দেশের অন্যতম প্রধান এই জাতীয় সম্পদ বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে।
বালুমহালের ব্যবসায়ীরা জানান, জমি ভাড়া নিয়েই তারা বালু স্তূপ করে বিক্রি করছেন। সরেজমিনে মঙ্গলবার দুপুরে গিয়ে দেখা যায়, নির্দিষ্ট বিরতি দিয়ে ট্রাক-ট্রাক্টর আসছে ও বালু নিয়ে চলে যাচ্ছে। বালু বোঝাইয়ের পর নির্দিষ্ট ব্যক্তির হাতে টাকা দিচ্ছে। এখানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ হাজার ট্রাক ও ট্রাক্টর বালু বিক্রি হয়। টাকার হিসাবে এসব ঘাট থেকে প্রতিদিন ২০-৩০ লাখ টাকার বালু বিক্রি হয়। ট্রাকপ্রতি এবং বালুর ফুট হিসাব করে এসব খোলা থেকে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা চাঁদা আদায় হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল জলিল জানান,
"আমরা এখন আতঙ্কে থাকি। আগে নদী অনেক দূরে ছিল, কিন্তু বালি উত্তোলনের ফলে নদীর পাড় এখন আমাদের ঘরের কাছে চলে এসেছে। বর্ষাকালে নদী ভাঙন শুরু হলে আমাদের আর পালানোর জায়গা থাকবে না। এছাড়া সারাদিন ট্রাকের ধুলোবালিতে বাড়ির ছোট ছেলেমেয়েদের শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। প্রশাসনের লোক আসে, দেখে যায়, কিন্তু বালি ব্যবসায়ীদের দাপটে কিছুই বন্ধ হয় না।"
ভেড়ামারা উপজেলা নির্বাহী অফিসার রফিকুল ইসলাম জানান, এলাকায় অবৈধভাবে বালি মজুদ বা উত্তোলনের বিরুদ্ধে আমরা কঠোর অবস্থানে রয়েছি। বালু ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন অনুযায়ী, সেতুর নির্দিষ্ট সীমানার মধ্যে এই ব্যবসা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আমরা ইতিমধ্যে বেশ কয়েকবার ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে জরিমানা করেছি। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকেও জানানো হয়েছে যেন তারা তাদের জমি ইজারা দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকে। জনস্বার্থে এবং জাতীয় সম্পদ রক্ষায় অচিরেই বড় ধরনের উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে।
নাম পরিচয় গোপন রাখার শর্তে একজন ব্যবসায়ী বলেন, "আমরা তো জোর করে জায়গা দখল করিনি। আমরা রেলওয়ের কাছ থেকে নিয়ম মেনেই জমি ইজারা নিয়েছি। বালু রাখা যদি অপরাধ হয়, তাহলে আমাদের ইজারা দেওয়া হলো কেন? আমরা এখানে শত শত শ্রমিকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছি। যদি প্রশাসন আমাদের সরিয়ে দিতে চায়, তবে আমাদের বিকল্প জায়গার ব্যবস্থা করে দেওয়া উচিত। হঠাৎ করে ব্যবসা বন্ধ করে দিলে আমরা অনেক বড় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ব।"
2026 © Amar Dorpon. All Rights Reserved