কাজল মালেক
১৭শ পর্ব
ছোট প্রধানবাড়ির দুইদিকে ঝোপঝাড়, তারপর শুরু হয়েছে বন বনান্তর যা ক্রমশঃ গভীর হয়ে ভাওয়ালের অরণ্যে গিয়ে মিশেছে। বাড়ির চারপাশে ফলজ বৃক্ষ। পূর্বদিকে বেশ কয়েকটা বড় বড় পুরনো আমগাছ। গাছের দীর্ঘ ডালগুলো ঘন শ্যামল পত্রপল্লবে আবৃত। চৈত্রদিনের দুপুরে যখন গনগনে রোদ, এইসব বৃক্ষের নিচে তখন ছায়ার চাদর বিছানো থাকে। সেখানে কাঠের বেঞ্চ পাতা। বাড়ির পশ্চিমসংলগ্ন একটা বরইগাছ,তার শাখায় পাতার ফাঁকে থোকায় থোকায় বরই। কাটাসমৃদ্ধ ছোট্ট গাছটি শীতের সময় ফলের ভারে নুয়ে পড়ে। পশ্চিম কোণায় একশো গজ দূরে পাট ক্ষেতের আইলের উপর অনেকটা জায়গাজুড়ে একটা তিত জামগাছ। পুরনো বৃক্ষটি বেশ দীর্ঘ, তাতে অসংখ্য ছোট বড়ো ঝাকড়া শাখা প্রশাখার কচি কচি পাতায় বাতাসের দোলা। এতো বড়ো বৃক্ষ অথচ এর ফল খুব ছোট, গোলাকৃতির, ছোলাবুটের থেকে একটু বড়ো, অনেকটা বৈঁচির মতো। এই ফলকে তিতজাম বলে। কাঁচা অবস্থায় সবুজ আর পাঁকলে টসটসে রসে ভরা কুচকুচে কালো। টকমিষ্টি তবে আরও একটু ভিন্ন স্বাদের জিভে জল আনা এক অসাধারণ ফল। গ্রামের মানুষের কাছে খুব প্রিয়। ঝোপঝাড়ে বেস্টিত প্রাচীন তিতজামবৃক্ষটা রাতের অন্ধকারে কালো একটা দৈত্যের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। রাতে একা ওদিকটা কেউ মাড়ায়না। একটু উজিয়ে লালমামুদ মুন্সির বাড়ি। মুন্সি সপরিবারে কুমিল্লা থেকে এখানে এসে স্থায়ীভাবে বসত শুরু করেছেন। বাড়ির দক্ষিণে ২০০ গজ দূরেই প্রশস্থ সরকারি রাস্তা,যেটি শ্রীপুর রেলস্টেশন পর্যন্ত গিয়েছে। এই অঞ্চলে মাত্র কয়েকটি পরিবার বাস করে। রাতে বন্যজন্তুর আক্রমণ হয়। বাঘ আসে। বাড়ির কাছে ওই জামগাছটার নিচে এসে ডাকে। বুক কাঁপে তহরজানের।
বাড়ির উত্তর পাশটায় ঘরসংলগ্ন কলাবাগান, এরপর জাম্বুরা, পেঁপে, আতা,লেবু, ডেওয়া,করমচা এইসব দেশীয় ফলের গাছের একপাশে তরতরকারির বাগান। ঘরের পাড় ঘেঁষে নাগা মরিচগাছের সারি। এক দেড় হাত উচ্চতার উর্ধমুখী বহুশাখা বিস্তৃত
গাছগুলোতে কানের ঝুমকার মতো অসংখ্য মরিচ ধরেছে। অতিরিক্ত ঝালের এই মরিচকে স্থানীয় ভাষায় ফোটকা মরিচ বা বোম্বাই মরিচ বলে। পাটপালান ও ধানক্ষেত পার হয়ে জনাবালী মাদবর ও চেরুখাঁর বাড়ি।
বাড়ির দক্ষিণ পশ্চিম দিকে ভিটাসংলগ্ন পাট চাষোপযোগী উর্বর জমি। এরপর ধানী জমি, ফসলের বিস্তীর্ণ মাঠ। মাঠের পরে আলীমুদ্দির বসত ও আমবাগান। অসম্ভব টকফল জয়নাগোটার আকাশ ছোঁয়া বিশাল বৃক্ষটার নিচে ছেলেমেয়েরা বৈকালিক খেলার আসর বসায়।
হাসেমের জন্মের পাঁচ বছর পর তহরজানের কোলে আরেক সন্তান এসেছে, মিলিয়ে নাম রেখেছে কাশেম। জুমন প্রধান এবার মেয়ের মুখ দেখতে চান। ধনেজনে অনেক বড়,অনেক সমৃদ্ধির সংসার গড়ার স্বপ্ন তার। ইতোমধ্যে বোনজামাই মাগন সরকারের ঋণ পুরোটাই পরিশোধ করা হয়েছে। পানাউল্লা সরকার ভিটা বাড়ি ও জমি ক্রয়ের জন্য যে টাকা দিয়েছিলেন তা কিছুতেই ফেরত নেবেননা। জুমন সে টাকা ফেরত দিলে তাকে ফিরিয়ে দেন। বলেন,"বহুত টেহাওয়ালা অইছচ। তরে পাইল্যা বড় করছি তর কামাই খাওনের লাইগ্যানি।" স্ত্রীকে ডেকে বললেন, "নগরী, তারে কইয়া দেও, আমি আমার ছেলেকে বাড়ি করবার টেহা ফিরত নিতে পারমুনা। অর টেহা বেশি অইলে পুস্কুনিত ফালাইয়া দিতে কও। তারে কও, এইসব লইয়া য্যান চিন্তা না করে। মাগনের টেকা দিয়া দিছে, বেশ করছে। হে তার ছোডো বইনের জামাই।" জুমন মা'র কাছে গিয়ে বলে, "বাবারে কইছ, জুমন এহন বড় অইছে, খাটতে পারে। অনেক দিচোইন, আর কিছু দেউন লাগতোনা। দূ আ করতে কইচ।"
এখন ধান পাট বোনার মওসুম। চৈত্র মাসে বৃষ্টি হলেই পাটবীজ বোনার জন্য জমি প্রস্তুত করতে হয়। সাধারণত এই অঞ্চলে বাড়িভিটা সংলগ্ন অপেক্ষাকৃত উঁচু জমিতে পাটের ভালো ফলন হয়। ছোট প্রধানবাড়ির তিনদিকে পাটের ক্ষেত। তাতে দুইজন কামলা (মজুর) লাঙ্গল চালিয়ে জমি কর্ষণ করছে। লাঙ্গল চালাতে সাধারণত বলদ গরুর প্রয়োজন হয়। পাশাপাশি দুটো বলদের কাঁধের জোয়ালের সাথে আবার লাঙ্গলের অগ্রভাগ বাঁধা থাকে। গরু লাঙ্গল টেনে নিয়ে যায়,
চাষি তার হাতল ধরে গরুর সাথে যেতে থাকে। স্থানীয় ভাষায় লাঙ্গলের হাতলকে বলে কুডি। এই কুডি ধরে হাল বাইতে হয়। দুটি গরু জোয়ালের সাহায্যে লাঙ্গল টানে আর লাঙ্গলের নিচে বাঁকা অংশের অগ্রভাগে ধারালো লোহার ফলা লাগানো থাকে। এই ফলা জমির কঠিন মাটি চিড়ে ফালা ফালা করে দেয়।
জুমনপ্রধান কর্ষিত জমিতে শুকনো গোবর সার ছড়িয়ে দিচ্ছে। তার গোয়ালে ছোট বড়ো ২৫ টি গরু। সেগুলোর মধ্যে দুধেল গাভী দুইটি। বাকীগুলো বেশির ভাগই বলদ কিংবা ষাঁড়। হাল বাইতে বলদ লাগে, সেগুলোর আবার আলাদা যত্ন নিতে হয়। গাভীদুটির দেখা শোনার দায়িত্ব তহরজানের। দুটো বড়ো গামলায় আলাদা করে ভাতের ফেন, থেকে যাওয়া ভাত, চালকুমড়া, শশা ও অন্যান্য তরকারির অংশ সাজিয়ে লবন মেশানো পানি গাভী দুটির সামনে দেয়া তার রোজকার কর্ম। আবার মা হবে তহরজান। ভারী পেট নিয়ে নিচু হতে কষ্ট হয়। তার ছোটবোন সরজান খাতুন বেশিরভাগ সময় প্রধানবাড়িতে কাটায়,পোয়াতী বোনের টুকটাক কাজ করে দেয়। সরজান খাতুনের সদ্য বিয়ে হয়েছে। তার স্বামীর নাম কাদিরালী। ছোট প্রধানবাড়ির পাশে তহরজানের সহায়তায় বাড়ি করেছে সে। তাদের পূর্ব পুরুষেরা কুমিল্লার মানুষ। অল্পকিছুদিন হলো অন্য ভাইদের সঙ্গে পূর্ব গাজীপুরে এসে বসত নিয়েছে কাদির। খুব সচ্ছল নয়। তহরজান তাদের নানাভাবে সাহায্য করে। গৃহস্থ বউয়েরা প্রতিদিন গোবর ও পঁচনশীল আবর্জনা বাড়ির পাশের একটা জায়গায় ফেলে রাখে। সারাবছরের জমাকৃত গো মল তরিতরকারীর উচ্ছিষ্টের সাথে পঁচে উৎকৃষ্ট জৈব সারে পরিণত হয়। চৈত্র মাসে কৃষকেরা এই সার ফসলের জমিতে প্রয়োগ করে। সচ্ছল গৃহস্থবাড়িতে সারাবছরের জন্য একাধিক চাকর থাকে। এদেরকে বলে "বছইরা কামলা।" জুমন আলী প্রধান বাড়িতে বছরজুড়ে কাজ করার জন্য
'কাইল্যা' আর 'বাঘা' নামের দু'জন সুঠামদেহী যুবককে বছইরা কামলা হিসেবে নিয়োগ করেছে। এরা তার দূর সম্পর্কের আত্মীয় এবং বিশ্বস্থ। এছাড়াও অতিরিক্ত কাজের মওসুমে
মাসোরা কামলা আর প্রতিদিনের জন্য দিনমজুরও রাখতে হচ্ছে।
১৯৫৩-৫৪ সাল পাকিস্তানের, বিশেষ করে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসে বাক পরিবর্তন ঘটে। এই সময়ে কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে অনৈক্য, রাজনৈতিক দলগুলোর মতপার্থক্য ও প্রদেশগুলোর সঙ্গে মতবিরোধ দেশে চরম রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্ম দেয়। জনমতের প্রতিফলন ঘটাতে তখন সরকার তড়িঘড়ি করে নির্বাচনের আয়োজন করে। ক্ষমতাসীন মুসলিমলীগকে মোকাবিলা করার জন্য ১৯৫৩-৫৪সালে ঐতিহাসিক যুক্তফ্রন্ট গঠিত হলো। মুসলিম লীগের একচ্ছত্র আধিপত্য ও দুঃশাসনের বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলায় শেরে বাংলা একে ফজলুল হক, মাওলানা ভাসানী এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে বিরোধী দলগুলো এই যুক্তফ্রন্টের মাধ্যমে একটি নির্বাচনী জোট গঠন করে।
১৯৫৪ সালের মার্চ মাসে পূর্ব বাংলা আইনসভার সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট মোট ৩০৯টি আসনের মধ্যে ২২৩টি আসনে জয়লাভ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। এই ভোটযুদ্ধে শাসকদল মুসলিম লীগ শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়।
সেবার ১৪ আগস্টে স্বাধীনতা উৎসব করার আয়োজনে জুমনের ডাক পড়ে। কিন্তু তার পক্ষে কাজ ফেলে জমকালো কুচকাওয়াজ ও পিটি-প্যারেডের অগ্রিম সাংগঠনিক কাজে অংশ নেয়া সম্ভব হয়নি। আগস্ট এলেই এলাকার ঘরে ঘরে গিয়ে স্বাধীনতা উৎসব পালনের জন্য স্বেচ্ছাসেবক তরুণেরা দলবেঁধে টাকা পয়সা তুলতে শুরু করে। ধনী-গরিব নির্বিশেষে যারা নগদ টাকা দিতে পারেনা তারা খুশি মনে ৫/১০ সের করে ধান দেয়। এভাবে ওরা ১৫/২০ মন ধান সংগ্রহ করে। এই ধান বিক্রয়লব্ধ টাকা উৎসব উদযাপনে ব্যয় কল্পে স্বেচ্ছাসেবক দলের কমিটির বিশেষ তহবিলের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। সারা দেশের সাথে গাজীপুর ও তৎপার্ববর্তী এলাকার সর্বস্তরের মানুষও ১৪ই আগস্টের অনুষ্ঠানে স্বতস্ফুর্ত অংশগ্রহন করে। এবার জুমন শুধু কুচকাওয়াজে অংশ নেয়া ছাড়া অন্যকিছুতে জড়িত হতে পারবেনা,কমান্ডার বাছিরকে জানিয়ে দিয়ে নিজেও মন খারাপ করে বসে আছে। পূবের বিশাল আমগাছের নিচে বেঞ্চিতে এমন বিমর্ষ হয়ে বসে থাকতে দেখে একটা হাতপাখা নিয়ে তার পাশে এসে বসে পোয়াতি তহরজান বেগম। স্বামীকে বাতাস করতে করতে কোমল কন্ঠে বলে, "অতো ভাবনার কি অইলো। আমনেহ অগর লগে না গেলে উছছব কেমনে অইবো?" ঘাড় ফিরিয়ে তাকায় জুমন,স্ত্রীকে দেখে।
2026 © Amar Dorpon. All Rights Reserved