
সভ্যতার ক্রমবিকাশে মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের চাবিকাঠি হলো শিক্ষা। প্রাচীনকাল থেকেই শিক্ষার উদ্দেশ্য ছিল মানুষের ভেতরের অন্ধকার দূর করে আলোর পথে নিয়ে আসা। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে এসে আমরা শিক্ষার সংজ্ঞাকে সংকীর্ণ করে ফেলেছি। বর্তমানে শিক্ষার মাপকাঠি কি কেবল একাডেমিক সার্টিফিকেট? নাকি এর গভীরে আরও বড় কোনো সত্য লুকিয়ে আছে?আজকের প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে সার্টিফিকেট নিঃসন্দেহে প্রয়োজনীয়। এটি কর্মসংস্থানের চাবিকাঠি, পেশাগত যোগ্যতার প্রমাণপত্র। কিন্তু এই কাগজের টুকরোটি কি মানুষের ব্যক্তিত্বের গভীরতা মাপতে পারে? উত্তরটা সম্ভবত আমাদের চারপাশেই ছড়িয়ে আছে। আমরা প্রায়ই দেখি উচ্চশিক্ষিত ডিগ্রিধারী ব্যক্তিও অনেক সময় মানবিক মূল্যবোধ হারিয়ে ফেলেন, আবার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার গণ্ডি না পেরোনো একজন অতি সাধারণ মানুষ তার সততা ও বিবেকবোধ দিয়ে সমাজের আদর্শ হয়ে দাঁড়ান।প্রকৃতপক্ষে, সার্টিফিকেট আপনাকে একটি সম্মানজনক চাকরি দিতে পারে, কিন্তু জীবন পরিচালনার কৌশল শেখাতে পারে না। স্বশিক্ষা বা জীবনমুখী শিক্ষা হলো সেই অদৃশ্য শক্তি, যা একজন মানুষের ব্যক্তিত্ব গঠন করে। বইয়ের পাতার বাইরেও আমাদের চারপাশের জগত, সমাজ এবং মানুষের অভিজ্ঞতা থেকে শেখার অবারিত সুযোগ রয়েছে। স্বশিক্ষিত মানুষ কোনো ধরাবাঁধা সিলেবাসের মুখাপেক্ষী নন; বরং নিজের কৌতূহল আর পর্যবেক্ষণ দিয়ে তিনি জীবনকে চিনতে শেখেন।শিক্ষার সার্থকতা সার্টিফিকেটের গ্লানিতে নয়, বরং বিবেকের জাগরণে। একজন প্রকৃত শিক্ষিত মানুষের পরিচয় পাওয়া যায় তার পরিশীলিত আচরণে, অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধে এবং তার নীতি-নৈতিকতায়। যে শিক্ষা মানুষকে পরোপকারী করে না, যা সংকীর্ণতা থেকে মুক্তি দেয় না, তা কেবল পুঁথিগত বিদ্যা ছাড়া আর কিছু নয়।আমরা যদি কেবল সার্টিফিকেটের পেছনে ছুটি, তবে হয়তো মেধাবী জাতি পাব, কিন্তু বিবেকবান সমাজ পাব না। সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নয়নের জন্য আমাদের এমন শিক্ষার প্রয়োজন যা মানুষের হৃদয়কে প্রসারিত করবে। মনে রাখতে হবে, ডিগ্রি মানুষকে উচ্চাসনে বসাতে পারে, কিন্তু উচ্চমানসম্পন্ন মানুষ তৈরি করে কেবল তার স্বশিক্ষা এবং নৈতিক মূল্যবোধ।তাই আসুন, সার্টিফিকেটের পাশাপাশি নিজেকে মানুষ হিসেবে গড়ার শিক্ষায় শিক্ষিত হই। কারণ দিনশেষে আমাদের পরিচয় আমাদের উপাধিতে নয়, বরং আমাদের কাজ আর ব্যক্তিত্বের মধ্যেই বেঁচে থাকে।লেখক: সাংবাদিক ও গীতিকার।
2026 © Amar Dorpon. All Rights Reserved