
নজমুল হক, স্টাফ রিপোর্টার গাজীপুর
টেকসই উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হলো মানবসম্পদ, আর সেই মানবসম্পদ গড়ে ওঠে শিক্ষার মাধ্যমে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—যে শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত গড়ে তোলেন শিক্ষকরা, তাদের অবস্থান যদি দুর্বল হয়, তবে কি মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব? বাংলাদেশের বাস্তবতা বলছে, উত্তরটি স্পষ্ট—না।বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৪ লাখ ৮১ হাজার শিক্ষক বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকলেও এর মাত্র ৫.৯ শতাংশ সরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। অর্থাৎ অধিকাংশ শিক্ষকই বেসরকারি বা এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে, যেখানে তাদের বেতন ও সুবিধা তুলনামূলকভাবে অনেক কম।
উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রভাষকদের সহকারী অধ্যাপক অর্থাৎ গ্রেড ৬ এর উপর যাওয়ার সুযোগ নেই এবং মাধ্যমিক পর্যায়ে সহকারী শিক্ষকরা বিএড থাকলে ১০ম গ্রেডে, আর বিএড না থাকলে ১১তম গ্রেডে বেতন পেয়ে থাকেন, যা থেকে বিভিন্ন কাটছাঁটের পর হাতে থাকে আরও কম। অন্যদিকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা ১৩তম গ্রেডে বেতন পান যা আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় অত্যন্ত কম—প্রায় ১৫০ ডলারের কাছাকাছি। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ যেমন ভারত, নেপাল বা পাকিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশের শিক্ষকরা সর্বনিম্ন বেতন পান। ফলে শিক্ষকতা পেশা আর আকর্ষণীয় থাকছে না। মেধাবী শিক্ষার্থীরা এই পেশায় আসতে অনাগ্রহী—এটাই স্বাভাবিক। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিক্ষার মানে। শিক্ষক সংকট, বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষকের অভাব এবং দুর্বল প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার কারণে শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান অনুযায়ী মাধ্যমিকে ঝরে পড়ার হার প্রায় ৩৩ শতাংশ, যা একটি উদ্বেগজনক সংকেত। বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করছেন—শিক্ষক সংকট, দুর্বল প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষায় পিছিয়ে পড়ার কারণে বাংলাদেশ বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে যাচ্ছে। এমনকি অনেক শিক্ষক জীবিকা নির্বাহের জন্য কোচিং বা অতিরিক্ত আয়ের পথ বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন, যা মূল শিক্ষাদানের গুণগত মানকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সরকারকে কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে।
প্রথমত, শিক্ষক পেশাকে আর্থিকভাবে আকর্ষণীয় করতে হবে। একটি সম্মানজনক জীবনযাপনের উপযোগী বেতন কাঠামো নিশ্চিত না করলে মেধাবীরা কখনোই এই পেশায় আসবে না। শুধু বেতন বাড়ালেই হবে না—বিভিন্ন ভাতা, বাসস্থান সুবিধা ও চিকিৎসা নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষকতার সামাজিক মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা জরুরি। উন্নত দেশগুলোতে শিক্ষকতা একটি সম্মানজনক পেশা হিসেবে বিবেচিত হয়।
বাংলাদেশেও সেই মানসিকতা গড়ে তুলতে গণমাধ্যম, নীতি ও সামাজিক প্রচারণার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তৃতীয়ত, শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় গুণগত পরিবর্তন আনতে হবে। দক্ষতা-ভিত্তিক নিয়োগ, নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাদানের সক্ষমতা বাড়াতে বিনিয়োগ জরুরি। বর্তমানে প্রশিক্ষণ কাঠামো থাকলেও তা পর্যাপ্ত নয় এবং অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকর নয়। চতুর্থত, শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ নিশ্চিত না হলে শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত দুর্বলই থেকে যাবে। সবশেষে, শিক্ষাকে ব্যয় নয়, বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে। একটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন নির্ভর করে তার শিক্ষার মানের ওপর। আর সেই মান নির্ধারণ করেন শিক্ষকরা। তাই শিক্ষককে অবহেলা করে টেকসই উন্নয়নের স্বপ্ন দেখা আত্মপ্রবঞ্চনা ছাড়া কিছু নয়। বাংলাদেশকে যদি আমরা সত্যিই উন্নত ও জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্রে পরিণত করতে চাই, তবে এখনই শিক্ষক পেশাকে পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে। কারণ, মানসম্মত শিক্ষক ছাড়া মানসম্মত শিক্ষা অসম্ভব—আর মানসম্মত শিক্ষা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন কেবলই একটি স্লোগান হয়ে থাকবে।
[
2026 © Amar Dorpon. All Rights Reserved