
নজমুল হক, স্টাফ রিপোর্টার গাজীপুর
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ২০২৫-২০২৬ শিক্ষাবর্ষের স্নাতক (সম্মান) ভর্তি পরীক্ষা এক অভূতপূর্ব উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে দেশজুড়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে। দেশের উচ্চশিক্ষা প্রসারে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় যে বিশাল ভূমিকা পালন করে আসছে, এই ভর্তি পরীক্ষাটি ছিল তারই একটি বলিষ্ঠ প্রতিফলন। ২৫ এপ্রিল, শনিবার অনুষ্ঠিত হওয়া এই পরীক্ষাটি নির্ধারিত সময় অনুযায়ী সকাল ১১টায় শুরু হয় এবং এমসিকিউ (MCQ) পদ্ধতিতে এক ঘণ্টা সময়সীমার মধ্যে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হয়। লাখো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন পূরণের এই পরীক্ষাটি বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনে এক নতুন প্রাণচাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. এ এস এম আমানুল্লাহ সশরীরে গাজীপুরের টঙ্গী সরকারি কলেজ কেন্দ্র পরিদর্শন করেন। পরীক্ষার হল পরিদর্শনের সময় তিনি শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং কেন্দ্রের প্রশাসনিক তৎপরতা ও সুষ্ঠু পরিবেশ দেখে গভীর সন্তোষ প্রকাশ করেন। পরিদর্শন শেষে উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের সাথে আলাপকালে ভাইস-চ্যান্সেলর বলেন, "আমরা ভর্তি পরীক্ষার স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করেছি।" তিনি আরও আশ্বস্ত করেন যে, আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ জনবল ব্যবহার করে অত্যন্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যে পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা হবে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা কোনো ধরনের দীর্ঘসূত্রতা বা সেশন জটের দুশ্চিন্তা ছাড়াই দ্রুত তাদের একাডেমিক জীবন শুরু করতে পারবে। ভাইস-চ্যান্সেলর আরও জানান, ফলাফল প্রকাশের পরপরই নির্ধারিত নিয়ম ও মেধা তালিকা অনুযায়ী কেন্দ্রীয়ভাবে অনলাইন ভর্তি প্রক্রিয়া শুরু করার সকল প্রস্তুতি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের রয়েছে।
টঙ্গী সরকারি কলেজ কেন্দ্র পরিদর্শন শেষে ভাইস-চ্যান্সেলর বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আইসিটি ভবনে স্থাপিত কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল রুমে প্রবেশ করেন। সেখান থেকে ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তায় এবং সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলের কেন্দ্রগুলোর পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হয়। এবারের ভর্তি পরীক্ষার পরিসংখ্যান অত্যন্ত বিশাল ও তাৎপর্যপূর্ণ। সারাদেশের ৮৮০টি কলেজের বিপরীতে মোট ৪ লাখ ৫৩ হাজার ১৪৮ জন পরীক্ষার্থী এই লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করেছেন। এই কলেজগুলোর মধ্যে সরকারি কলেজের সংখ্যা ৩৭৫টি এবং বেসরকারি কলেজের সংখ্যা ৫০৫টি। দেশের বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনা করে এবং যাতায়াত কষ্ট লাঘব করতে সারাদেশে মোট ১৩৮টি সুসজ্জিত পরীক্ষা কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছিল। কেন্দ্রগুলোর সুষম বণ্টন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ঢাকা মহানগরীতে ১৮টি এবং ঢাকা বিভাগে ২৭টি কেন্দ্র ছিল। এছাড়া বরিশাল বিভাগে ১৩টি, চট্টগ্রাম বিভাগে ২৩টি, খুলনা বিভাগে ১৮টি, রাজশাহী বিভাগে ১৭টি, রংপুর বিভাগে ১৩টি এবং সিলেট বিভাগে ৯টি কেন্দ্রে পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়। প্রতিটি কেন্দ্রেই স্থানীয় প্রশাসন ও কলেজ কর্তৃপক্ষের নিবিড় তত্ত্বাবধান লক্ষ্য করা গেছে।
ভর্তি পরীক্ষার এই বিশাল কর্মযজ্ঞ তদারকিতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের পাশাপাশি দেশের প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ ও সরকারের উচ্চপদস্থ অতিথিবৃন্দ সক্রিয়ভাবে উপস্থিত ছিলেন। কন্ট্রোল রুমে পর্যবেক্ষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, শেরে-বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন স্বনামধন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর, ডিন এবং জ্যেষ্ঠ শিক্ষকবৃন্দ। এছাড়াও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় গাজীপুর মহানগর পুলিশ কমিশনারসহ প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার বিষয়টি কঠোরভাবে দেখাশোনা করেন।
সংশ্লিষ্ট সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা, মেধা ও শ্রমের বিনিময়ে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা বা অভিযোগ ছাড়াই এ বছরের ভর্তি পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এটি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক সক্ষমতার একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই বিপুল সংখ্যক মেধাবী শিক্ষার্থীর ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার মাধ্যমে দেশের উচ্চশিক্ষা অঙ্গনে যে নতুন গতির সঞ্চার হবে, তা জাতীয় উন্নয়ন ও দক্ষ মানবসম্পদ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে শিক্ষাবিদগণ মনে করছেন। পরিশেষে, একটি সুন্দর ও নিরপেক্ষ ভর্তি পরীক্ষা উপহার দেওয়ায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মাঝেও স্বস্তির আভাস দেখা গেছে।
2026 © Amar Dorpon. All Rights Reserved