
নজমুল হক, স্টাফ রিপোর্টার গাজীপুরঃ
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় (বাউবি) দেশের দূরশিক্ষা ব্যবস্থার এক অনন্য প্রতিষ্ঠান, যেখানে শিক্ষা কেবল পাঠ্যবই বা পরীক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়—বরং এটি শিক্ষার্থীদের জীবনের বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। এই বিশাল ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে “স্টুডেন্ট সাপোর্ট সার্ভিসেস (এসএসএস) বিভাগ”—যা বাউবির শিক্ষার্থীদের জন্য একপ্রকার প্রাণভোমরা হিসেবে কাজ করে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই গুরুত্বপূর্ণ বিভাগটি কি তার প্রত্যাশিত ভূমিকা যথাযথভাবে পালন করতে পারছে? বাউবির অধীনে বর্তমানে প্রায় ৩ লক্ষাধিক সক্রিয় শিক্ষার্থী এবং সারাদেশে ১,৪৫০টিরও বেশি স্টাডি সেন্টার রয়েছে। এই বিপুল শিক্ষার্থীসমাজের একাডেমিক ও প্রশাসনিক সহায়তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব মূলত এসএসএস বিভাগের ওপর বর্তায়। ভর্তি কার্যক্রম, পাঠ্যসামগ্রী বিতরণ, টিউটোরিয়াল ক্লাসের সমন্বয়, পরীক্ষা পরিচালনা, ফলাফল প্রকাশ তথ্য—সবকিছুতেই এই বিভাগের সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে। অর্থাৎ, শিক্ষার্থীর বিশ্ববিদ্যালয়-জীবনের প্রতিটি ধাপেই এসএসএস বিভাগের ভূমিকা অপরিহার্য। আর এই কাজে সাহায্যের হাত নিয়ে নিয়োজিত আছে এসএসএস বিভাগের আওতাধীন দেশব্যাপী বিস্তৃত ১২টি আঞ্চলিক কেন্দ্র ও ৬৩টি উপআঞ্চলিক কেন্দ্রের জনবল। অনতিবিলম্বে আরও ১৭টি উপআঞ্চলিক কেন্দ্রের কার্যক্রম শুরু হবে।তবে বাস্তব চিত্র অনেক ক্ষেত্রে ভিন্ন। নানা গবেষণা ও শিক্ষার্থী অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, এসএসএস বিভাগের সেবার মান ও গতি অনেক সময়ই প্রত্যাশার তুলনায় পিছিয়ে থাকে।
বিশেষ করে পাঠ্যসামগ্রী সরবরাহে বিলম্ব, পরীক্ষার সময়সূচি ও ফলাফল প্রকাশে জটিলতা এবং তথ্যপ্রাপ্তির সীমাবদ্ধতা শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা তৈরি করে। দূরশিক্ষা পদ্ধতিতে যেখানে শিক্ষার্থীরা সরাসরি শিক্ষক-শ্রেণিকক্ষের সংস্পর্শে থাকে না, সেখানে এই ধরনের সেবা-ঘাটতি শিক্ষার মানকে সরাসরি প্রভাবিত করে। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো—ডিজিটাল যুগে এসএসএস বিভাগের কার্যক্রম এখনো অনেকাংশে ম্যানুয়াল ও কাগজনির্ভর। যদিও বাউবির নিজস্ব আইসিটি অবকাঠামো রয়েছে, তবুও পূর্ণাঙ্গ অনলাইন সাপোর্ট সিস্টেম এখনো গড়ে ওঠেনি। ফলে শিক্ষার্থীদের ছোটখাটো সমস্যার সমাধানেও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। এই বাস্তবতা শুধু সেবার মান কমায় না, বরং শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততাও হ্রাস করে।
অন্যদিকে, বিশ্বব্যাপী ওপেন ও দূরশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ইতোমধ্যে উন্নত স্টুডেন্ট সাপোর্ট সিস্টেম চালু করেছে। অনলাইন হেল্পডেস্ক, ২৪/৭ সাপোর্ট (সপ্তাহে ৭ দিন, দিনে ২৪ ঘন্টা নিরবচ্ছিন্ন সেবা বা সহায়তা প্রদান), লাইভ চ্যাট, মোবাইল অ্যাপভিত্তিক সেবা—এসব এখন আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পরিণত হয়েছে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা দ্রুত সেবা পায়, সমস্যার সমাধান হয় এবং শিক্ষার প্রতি আগ্রহও বৃদ্ধি পায়। বাউবির এসএসএস বিভাগকে এই মানে উন্নীত করতে না পারলে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়া অবশ্যম্ভাবী।
তবে সম্ভাবনার দিকটিও উজ্জ্বল। বাংলাদেশে বর্তমানে ১৩ কোটির বেশি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী এবং দ্রুত বর্ধনশীল স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাউবির জন্য এক সুবর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। যদি এসএসএস বিভাগকে একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে রূপান্তর করা যায়—যেখানে শিক্ষার্থীরা ভর্তি থেকে শুরু করে পরীক্ষা ও ফলাফল পর্যন্ত সবকিছু অনলাইনে সম্পন্ন করতে পারবে—তবে সেবার মানে বিপ্লব ঘটানো সম্ভব।
এক্ষেত্রে প্রয়োজন সুস্পষ্ট নীতিমালা, দক্ষ মানবসম্পদ এবং প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ। পাশাপাশি, শিক্ষার্থীদের মতামত ও অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিয়ে সেবা উন্নয়নের একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া চালু করতে হবে। এসএসএস বিভাগকে শুধু প্রশাসনিক ইউনিট হিসেবে নয়, বরং শিক্ষার্থীদের সহযাত্রী ও মানবিক মুখ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। সবশেষে বলা যায়, বাউবির শিক্ষাব্যবস্থার সাফল্য অনেকাংশেই নির্ভর করে এসএসএস বিভাগের কার্যকারিতার ওপর। এই বিভাগ যদি দক্ষ, আধুনিক ও শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক হয়ে উঠতে পারে, তবে বাউবি সত্যিকার অর্থে তার লক্ষ্য—“সবার জন্য শিক্ষা”—বাস্তবায়নে সফল হবে। এখন সময় এসেছে, এসএসএস বিভাগকে নতুন করে ভাবার এবং তাকে যুগোপযোগী রূপে গড়ে তোলার।
2026 © Amar Dorpon. All Rights Reserved