
নজমুল হক, স্টাফ রিপোর্টার গাজীপুর
বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার বিস্তার বেড়েই চলছে। সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা এখন ১৭৫টি, প্রতি বছর লাখো শিক্ষার্থী স্নাতক ডিগ্রি নিয়ে বের হচ্ছে। কাগজে-কলমে এটি মানবসম্পদ উন্নয়নের ইতিবাচক চিত্র। কিন্তু বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়ালে দেখা যায় ভিন্ন এক দৃশ্য—ডিগ্রির সংখ্যা বাড়লেও দক্ষতার ঘাটতি দিন দিন তীব্র হচ্ছে, আর সেই সঙ্গে বাড়ছে শিক্ষিত বেকারত্ব। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশে বেকারের সংখ্যা কয়েক মিলিয়নের ঘরে, যার একটি বড় অংশই উচ্চশিক্ষিত তরুণ। বিভিন্ন জরিপ বলছে, বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতকদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১৩ শতাংশের বেশি—যা সামগ্রিক গড়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে উচ্চ। অর্থাৎ, ডিগ্রি অর্জন করেও চাকরি নিশ্চিত হচ্ছে না; বরং অনেক ক্ষেত্রে তা বেকারত্বের সারিতে যোগ দিচ্ছে। এই সংকটের মূলে রয়েছে শিক্ষা ও শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে স্পষ্ট অসামঞ্জস্য। দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো তাত্ত্বিক জ্ঞানকেন্দ্রিক পাঠদান চালু রয়েছে, যেখানে বাস্তব দক্ষতা অর্জনের সুযোগ সীমিত। ফলে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় ভালো ফল করলেও কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত জ্ঞান, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা কিংবা পেশাগত দক্ষতায় পিছিয়ে থাকে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বারবার যে ‘স্কিল গ্যাপ’-এর কথা বলছে, সেটিই আজ বাংলাদেশের শ্রমবাজারে প্রকট বাস্তবতা।
একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে, দেশের প্রায় ৬০ শতাংশ স্নাতক এমন বিষয়ে পড়াশোনা করে যার সঙ্গে সরাসরি চাকরির বাজারের চাহিদার মিল নেই। এর ফলে একদিকে তৈরি হচ্ছে বেকার গ্রাজুয়েট, অন্যদিকে শিল্পখাতে দক্ষ কর্মীর অভাব রয়ে যাচ্ছে।এই দ্বৈত সংকট অর্থনীতির জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গার্মেন্টস, নির্মাণ, তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা—প্রায় সব খাতেই দক্ষ কর্মীর চাহিদা বাড়ছে। বিশেষ করে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রেক্ষাপটে প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতার গুরুত্ব বহুগুণ বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুযায়ী শিক্ষাব্যবস্থার রূপান্তর ঘটেনি। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান বাধ্য হয়ে বিদেশি দক্ষ কর্মী নিয়োগ করছে, যা দেশের জন্য একদিকে অর্থের অপচয়, অন্যদিকে স্থানীয় কর্মসংস্থানের সুযোগ হারানোর শামিল।
বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা দৃশ্যমান। বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর লক্ষাধিক কর্মী বিদেশে গেলেও তাদের বেশিরভাগই অদক্ষ বা স্বল্পদক্ষ। ফলে তারা কম মজুরি পায় এবং দেশের সম্ভাব্য রেমিটেন্স আয়ের বড় একটি অংশ হাতছাড়া হয়। অথচ বিভিন্ন গবেষণা বলছে, দক্ষ কর্মীরা অদক্ষদের তুলনায় দ্বিগুণ পর্যন্ত আয় করতে পারে। অর্থাৎ, দক্ষতা উন্নয়নই হতে পারে রেমিটেন্স বৃদ্ধির অন্যতম কার্যকর উপায়। এই বাস্তবতায় বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশে এখনো এই খাতটি প্রান্তিক অবস্থানে রয়েছে। মোট শিক্ষার্থীর একটি ছোট অংশই কারিগরি শিক্ষায় যুক্ত, যেখানে উন্নত দেশগুলোতে এই হার অনেক বেশি। জার্মানি বা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশে শিল্পোন্নয়নের পেছনে কারিগরি শিক্ষার অবদান সুস্পষ্ট।
সমস্যার আরেকটি বড় দিক হলো সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি। আমাদের সমাজে এখনো বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রিকেই সাফল্যের একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে দেখা হয়, আর কারিগরি শিক্ষাকে তুলনামূলকভাবে অবমূল্যায়ন করা হয়। ফলে অনেক শিক্ষার্থী নিজেদের আগ্রহ ও দক্ষতার বাইরে গিয়ে শুধুমাত্র ‘ডিগ্রি’ অর্জনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়, যা পরবর্তীতে তাদের কর্মজীবনে হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য জরুরি কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। প্রথমত, শিক্ষাব্যবস্থাকে দক্ষতাভিত্তিক করতে হবে—যেখানে তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি বাস্তব প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক হবে। দ্বিতীয়ত, মাধ্যমিক স্তর থেকেই কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে। তৃতীয়ত, শিল্পখাত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পায়।
সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি। ‘ডিগ্রি’ নয়, ‘দক্ষতা’—এই ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। একজন দক্ষ কারিগর বা টেকনিশিয়ান যেমন দ্রুত কর্মসংস্থান পায়, তেমনি দেশের অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। বাংলাদেশ আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দাঁড়িয়ে। বিপুল তরুণ জনসংখ্যাকে যদি দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করা যায়, তবে এটি দেশের জন্য বিশাল সম্পদে পরিণত হবে। অন্যথায়, ডিগ্রির ভিড়ে দক্ষতার এই সংকট আরও গভীর হয়ে ভবিষ্যতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
2026 © Amar Dorpon. All Rights Reserved