

নজমুল হক,গাজীপুর
একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার তরুণদের স্বপ্ন, সাহস এবং কর্মক্ষমতার ওপর। যে জাতির তরুণরা আশাবাদী, উদ্ভাবনী এবং কর্মমুখী, সেই জাতি দ্রুত উন্নতির পথে এগিয়ে যায়। আর যে দেশের তরুণরা হতাশা, বেকারত্ব ও অনিশ্চয়তার ভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়ে, সেই দেশের উন্নয়নের গতি থমকে যেতে বাধ্য। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় এই সত্যটি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক। কারণ আজকের বাংলাদেশ একদিকে যেমন সম্ভাবনার দেশ, অন্যদিকে তেমনি তরুণদের স্বপ্নভঙ্গেরও এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশই তরুণ। বিভিন্ন সরকারি ও আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ ১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশকে “ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড” বা জনমিতিক সুবিধাপ্রাপ্ত দেশ হিসেবে উল্লেখ করে আসছে। অর্থাৎ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর আধিক্য বাংলাদেশের জন্য এক বিরাট সুযোগ। কিন্তু এই সুযোগ তখনই কাজে লাগবে, যখন তরুণদের স্বপ্ন, মেধা ও শক্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো যাবে। অন্যথায় এই সম্ভাবনাই একসময় বড় সংকটে পরিণত হতে পারে। বর্তমানে দেশের লাখো তরুণের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো কর্মসংস্থান। প্রতিবছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সনদ নিয়ে বের হচ্ছে। কিন্তু শ্রমবাজার সেই অনুপাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারছে না। ফলে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। একটি সরকারি চাকরির জন্য লাখো আবেদন জমা পড়ার ঘটনা এখন আর নতুন কিছু নয়। অনেক তরুণ বছরের পর বছর চাকরির প্রস্তুতি নিতে নিতে জীবনের মূল্যবান সময় হারিয়ে ফেলছে। সনদ হাতে নিয়ে পরিবার ও সমাজের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারার কষ্ট তাদেরকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলছে।
এই হতাশা শুধু ব্যক্তিগত নয়; এটি একটি জাতীয় সংকট। কারণ একজন তরুণ যখন স্বপ্ন হারায়, তখন একটি পরিবার আশা হারায়। আর যখন লাখো তরুণ স্বপ্ন হারায়, তখন একটি জাতি তার ভবিষ্যৎ হারানোর ঝুঁকিতে পড়ে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তরুণদের মধ্যে মানসিক চাপ, বিষণ্নতা এবং আত্মহত্যার প্রবণতা নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। কর্মসংস্থানের অভাব, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক চাপ অনেক তরুণকে হতাশার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই পরিস্থিতির জন্য কি শুধু তরুণরাই দায়ী? নিশ্চয়ই নয়। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, কর্মসংস্থান কাঠামো এবং সামাজিক মানসিকতারও বড় দায় রয়েছে। এখনও আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা অনেকাংশে সনদনির্ভর। শিক্ষার্থীদের শেখানো হয় পরীক্ষায় ভালো ফল করতে, কিন্তু শেখানো হয় না কীভাবে বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধান করতে হয়, কীভাবে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হয় কিংবা কীভাবে নিজের দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে আত্মনির্ভর হতে হয়। ফলে শিক্ষা ও কর্মবাজারের মধ্যে একটি বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
বিশ্ব অর্থনীতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি, অটোমেশন, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং উদ্ভাবননির্ভর কর্মসংস্থানের যুগে প্রবেশ করেছে বিশ্ব। কিন্তু বাংলাদেশের অনেক তরুণ এখনও সেই পরিবর্তনের জন্য পর্যাপ্তভাবে প্রস্তুত নয়। প্রযুক্তিগত দক্ষতা, ইংরেজি ভাষাজ্ঞান, সৃজনশীলতা এবং সমস্যা সমাধানের ক্ষমতার অভাব তাদের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দিচ্ছে। ফলে অনেক তরুণ সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তবে হতাশার এই চিত্রই পুরো বাস্তবতা নয়। বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে অসাধারণ সম্ভাবনাও রয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশি তরুণদের সাফল্য ইতোমধ্যে বিশ্বে প্রশংসিত হয়েছে। ফ্রিল্যান্সিং, সফটওয়্যার উন্নয়ন, ডিজিটাল মার্কেটিং, অনলাইন ব্যবসা এবং স্টার্টআপ খাতে নতুন প্রজন্মের অনেক তরুণ সফলতার নজির সৃষ্টি করছেন। কৃষিতেও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে শিক্ষিত তরুণরা নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছেন। অর্থাৎ সুযোগ পেলে এবং সঠিক সহায়তা পেলে বাংলাদেশের তরুণরাই দেশের অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন শিক্ষাব্যবস্থার যুগোপযোগী সংস্কার। শুধু সনদ নয়, দক্ষতা ও উদ্ভাবনকে শিক্ষার মূল ভিত্তি করতে হবে। কারিগরি শিক্ষা, প্রযুক্তি শিক্ষা, গবেষণা এবং উদ্যোক্তা উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে চাকরিপ্রার্থী নয়, দক্ষ ও আত্মনির্ভর নাগরিক তৈরির কারখানায় পরিণত করতে হবে। একইসঙ্গে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে হবে। সহজ শর্তে ঋণ, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং বাজারসুবিধা নিশ্চিত করা গেলে হাজার হাজার তরুণ নতুন উদ্যোগ নিতে পারবে। একজন উদ্যোক্তা শুধু নিজের কর্মসংস্থানই নিশ্চিত করেন না, বরং আরও অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেন। তাই উদ্যোক্তা তৈরিতে বিনিয়োগ মানেই ভবিষ্যতের অর্থনীতিতে বিনিয়োগ। রাষ্ট্রের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো যোগ্যতার ভিত্তিতে সুযোগ নিশ্চিত করা। যখন একজন মেধাবী তরুণ দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি বা রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে বঞ্চিত হয়, তখন তার স্বপ্ন ভেঙে যায়। আর একটি ভাঙা স্বপ্ন শুধু একজন মানুষের ক্ষতি নয়; এটি দেশেরও ক্ষতি। তাই নিয়োগ ও সুযোগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
পরিবার ও সমাজকেও তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। চাকরিকেই একমাত্র সাফল্য হিসেবে দেখার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। একজন কৃষি উদ্যোক্তা, প্রযুক্তি উদ্যোক্তা, ফ্রিল্যান্সার বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীও সমানভাবে সম্মানের দাবিদার। তরুণদের স্বপ্নকে পেশার সংকীর্ণ মানদণ্ডে বিচার না করে তাদের সৃজনশীলতা ও সক্ষমতাকে মূল্যায়ন করতে হবে। বাংলাদেশের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এই দেশের প্রতিটি বড় অর্জনের পেছনে তরুণদের অবদান রয়েছে। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, গণতান্ত্রিক আন্দোলন কিংবা প্রযুক্তিগত অগ্রগতি—সবখানেই তরুণরাই নেতৃত্ব দিয়েছে। সেই তরুণদের যদি আজ হতাশার অন্ধকারে হারিয়ে যেতে দেওয়া হয়, তবে দেশের ভবিষ্যৎও অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়বে।
তাই আজ সময়ের সবচেয়ে বড় আহ্বান হলো—তরুণদের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখা। তাদের জন্য শিক্ষা, কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন এবং ন্যায্য সুযোগ নিশ্চিত করা। কারণ একটি জাতির সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ তার প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, তার তরুণ প্রজন্ম। তাদের চোখে যদি আশার আলো জ্বলে, তবে দেশের অর্থনীতি এগোবে; সমাজ এগোবে; রাষ্ট্র এগোবে। বাংলাদেশকে একটি সমৃদ্ধ, আধুনিক ও মর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে হলে তরুণদের স্বপ্নকে রক্ষা করতেই হবে। কারণ সত্যটি অত্যন্ত সরল—তরুণদের স্বপ্ন বাঁচলে বাঁচবে বাংলাদেশ।
2026 © Amar Dorpon. All Rights Reserved