

নজমুল হক, স্টাফ রিপোর্টার গাজীপুরঃ
বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে বিশ্বমানের উচ্চশিক্ষার চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে গবেষণায় পিছিয়ে পড়ার বাস্তবতা—এই দুইয়ের মাঝে নতুন ভিসি হিসেবে প্রফেসর ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলামের আগমন শুধু প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়, বরং একটি নতুন প্রত্যাশার সূচনা। ২০২৬ সালের মার্চে তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন এমন এক সময়ে, যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের সুশাসন, গবেষণা আউটপুট এবং বৈশ্বিক র্যাংকিং নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। দীর্ঘ একাডেমিক ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা—বিশেষত বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা—তাকে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি শক্ত ভিত্তি দিয়েছে। ওবায়দুল ইসলামের কর্মজীবন প্রায় চার দশকজুড়ে বিস্তৃত। ১৯৯০-এর দশকে প্রভাষক হিসেবে যাত্রা শুরু করে তিনি অধ্যাপক পদে উন্নীত হন এবং গবেষণা, পাঠদান ও প্রশাসনে সমান দক্ষতার পরিচয় দেন। তার গবেষণার ক্ষেত্র মূলত পদার্থবিজ্ঞান, বিশেষ করে সোলার সেল ও থিন-ফিল্ম প্রযুক্তি—যা ভবিষ্যতের টেকসই জ্বালানি উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তবে কেবল গবেষক বা শিক্ষক হিসেবেই নয়, একজন সংগঠক ও নীতিনির্ধারক হিসেবেও তিনি সুপরিচিত। শিক্ষক সমিতি, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক একাডেমিক প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় অংশগ্রহণ তার নেতৃত্বের অভিজ্ঞতাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। এই বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতাই তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি জটিল প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য প্রস্তুত করেছে।
বর্তমানে ঢাবির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো গবেষণা আউটপুটের ঘাটতি। আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে পিছিয়ে থাকা, গবেষণায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাব এবং আধুনিক ল্যাব সুবিধার সীমাবদ্ধতা দীর্ঘদিনের সমস্যা। নতুন ভিসি ইতোমধ্যেই গবেষণা বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ক্যাম্পাস গড়ার কথা বলেছেন। তবে বাস্তবতা হলো—বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা ব্যয় এখনও মোট জিডিপির তুলনায় অত্যন্ত কম। উন্নত দেশগুলো যেখানে জিডিপির ২-৩% গবেষণায় ব্যয় করে, সেখানে বাংলাদেশে এই হার ১% এরও নিচে। এই প্রেক্ষাপটে শুধুমাত্র নীতিগত ঘোষণা নয়, বাস্তবায়নের দৃঢ়তা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। এখানেই ওবায়দুল ইসলামের নেতৃত্বের পরীক্ষা। তিনি ইতোমধ্যে একটি “গিফট-ফ্রি প্রশাসন” বার্তা দিয়ে ব্যক্তিগত সততা ও স্বচ্ছতার ইঙ্গিত দিয়েছেন, যা প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যা—রাজনীতি, সেশনজট, শিক্ষক নিয়োগে বিতর্ক—এসব সমাধানে কেবল ব্যক্তিগত সততা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। একইসঙ্গে, ছাত্রবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ। শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য, আবাসন সংকট এবং ক্যাম্পাস নিরাপত্তা—এই বিষয়গুলোতে কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া উন্নয়নের কথা বলা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। সবশেষে বলা যায়, ওবায়দুল ইসলামের সামনে সুযোগ যেমন বড়, চ্যালেঞ্জও তেমনই কঠিন। তার কর্মমুখর জীবন, গবেষণাভিত্তিক চিন্তা এবং প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা যদি বাস্তব পরিবর্তনে রূপ নেয়, তবে ঢাবি আবারও জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসেবে তার ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার করতে পারবে। অন্যথায়, নেতৃত্ব বদলালেও সংকটের চক্র অব্যাহত থাকবে। ঢাবির এই নতুন অধ্যায় তাই কেবল একজন ভিসির গল্প নয়—এটি বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যতের এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
2026 © Amar Dorpon. All Rights Reserved