

নজমুল হক গাজীপুর
শিক্ষার মূল লক্ষ্য শুধু একটি সনদ দেওয়া নয়। মানুষের সামনে সম্ভাবনার দরজা খুলে দেওয়া। যে শিক্ষার্থী কোনো কারণে প্রচলিত ধারায় যেতে পারেনি, তার জন্যও পথ থাকা দরকার। কারণ একটি শিক্ষাব্যবস্থার সাফল্য শুধু কতজন এগিয়ে গেলেন, তা দিয়ে মাপা যায় না। কতজনকে পিছিয়ে পড়া থেকে ফিরিয়ে আনা গেল, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। এই জায়গা থেকেই বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাউবি) ‘নিশ-৩’ উদ্যোগটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। কওমি ধারার আগ্রহী শিক্ষার্থী এবং আলিয়া ধারার ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য এসএসসি ও এইচএসসি পর্যায়ে দুটি বিশেষ প্রোগ্রাম চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বাউবি। ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ এ বিষয়ে দুই দিনের কর্মশালাও হয়েছে। উক্ত কর্মশালায় শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনের মতামতের ভিত্তিতে কোর্স লেআউট ও রেগুলেশন চূড়ান্ত করা হয়েছে। ২০২৭ সালের শুরু থেকে প্রোগ্রাম দুটো চালুর লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছে। এটি নিছক একটি নতুন প্রোগ্রাম চালুর খবর নয়। এর মধ্যে আছে শিক্ষার একটি বড় দর্শন। সেই দর্শন হলো- শিক্ষার দরজা কারও জন্য স্থায়ীভাবে বন্ধ থাকবে না।
কওমি শিক্ষার নিজস্ব ঐতিহ্য ও বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এ ধারায় কোরআন, হাদিস, আরবি, ফিকহসহ ধর্মীয় শিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। ২০১৮ সালের আইনের মাধ্যমে কওমি মাদরাসার দাওরায়ে হাদিস (তাকমীল) সনদকে ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবিতে মাস্টার্স ডিগ্রির সমমান দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সমস্যা ছিল অন্য জায়গায়। দাওরায়ে হাদিসের আগের স্তরগুলো থেকে প্রচলিত এসএসসি-এইচএসসি কাঠামোয় সরাসরি প্রবেশের পথ সীমিত। ফলে কোনো কওমি শিক্ষার্থী যদি পরবর্তী সময়ে সাধারণ উচ্চশিক্ষায় যেতে চান, তখন তাকে একটি শিক্ষাগত সেতুর প্রয়োজন হয়। ‘নিশ-৩’ সেই সেতুর একটি সম্ভাব্য রূপ। বাউবির পরিকল্পনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কওমি শিক্ষার্থীদের নিজস্ব ধর্মীয় শিক্ষা বাদ দেওয়া হচ্ছে না। বরং তাদের শিক্ষার স্বকীয়তা বজায় রেখেই সাধারণ শিক্ষার প্রয়োজনীয় বিষয় যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। কোরআন, হাদিস, আরবি ও ফিকহের পাশাপাশি বাংলা, ইংরেজি, গণিত এবং অন্যান্য সাধারণ বিষয় থাকবে। এই সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আজকের পৃথিবীতে শুধু একটি বিষয়ে জ্ঞান যথেষ্ট নয়। ভাষাজ্ঞান দরকার। গণিত দরকার। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মৌলিক ধারণা দরকার। তথ্য বোঝার ক্ষমতা দরকার। যোগাযোগ দক্ষতা দরকার। কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর সক্ষমতা দরকার। একজন শিক্ষার্থীর ধর্মীয় জ্ঞান যেমন মূল্যবান, তেমনি আধুনিক জ্ঞানও প্রয়োজনীয়। এই দুইয়ের মধ্যে বিরোধ তৈরি করার দরকার নেই। বরং উপযুক্ত শিক্ষাক্রমের মাধ্যমে দুটিকে পাশাপাশি এগিয়ে নেওয়াই হতে পারে সময়ের দাবি।
বাউবির উদ্যোগের আরেকটি বড় দিক হলো নমনীয়তা। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাপদ্ধতিই মূলত এমন শিক্ষার্থীদের জন্য তৈরি, যারা প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার নিয়মিত কাঠামোয় সব সময় থাকতে পারেন না। বয়স, পেশা, সামাজিক অবস্থা বা জীবনের নানা বাস্তবতার কারণে অনেকেই নিয়মিত শিক্ষায় টিকে থাকতে পারেন না। তাদের জন্য দ্বিতীয় সুযোগ দরকার। এই প্রয়োজনের বাস্তব চিত্র আমরা সাম্প্রতিক এসএসসি ফলেও দেখেছি। ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেয়। পাস করে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন। অর্থাৎ ৬ লাখ ৯০ হাজার ৬০৮ জন পাস করতে পারেনি। জাতীয় পাসের হার ছিল ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ। এই সংখ্যা শুধু একটি পরীক্ষার পরিসংখ্যান নয়। এর পেছনে আছে লাখ লাখ পরিবারের উদ্বেগ। আছে হাজারো শিক্ষার্থীর থেমে যাওয়ার আশঙ্কা। আছে শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ঝুঁকি। অবশ্যই এসএসসি পরীক্ষায় ফেল করা সবাই স্থায়ীভাবে ঝরে পড়ে না। অনেকেই আবার পরীক্ষা দেয়। কেউ অন্য শিক্ষাপথে যায়। কেউ কারিগরি শিক্ষায় যুক্ত হয়। কেউ কাজ শুরু করে। কিন্তু যারা শেষ পর্যন্ত শিক্ষা থেকে দূরে সরে যায়, তাদের জন্য বিকল্প পথ থাকা জরুরি। এখানেই বাউবির অভিজ্ঞতা কাজে লাগতে পারে। তবে ‘নিশ-৩’কে শুধু কওমি শিক্ষার্থীদের জন্য একটি বিশেষ সুবিধা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি হতে পারে অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার একটি মডেল। কওমি ধারার আগ্রহী শিক্ষার্থীর পাশাপাশি আলিয়া ধারার ঝরে পড়া শিক্ষার্থীরাও এই সুযোগ পাবে। অর্থাৎ মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত শিক্ষার বাইরে থাকা মানুষকে শিক্ষার ভেতরে ফিরিয়ে আনা। তবে এখানেই একটি বড় প্রশ্ন আছে। শুধু বিকল্প পথ তৈরি করলেই কি সমস্যার সমাধান হবে? উত্তর হলো- না। মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থায় কেন এত শিক্ষার্থী পিছিয়ে পড়ছে, সেটিও দেখতে হবে। ২০২৬ সালের এসএসসি ফলের দিকে তাকালে প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কেন পাসের হার এত কমল? কোথায় দুর্বলতা? শিক্ষকস্বল্পতা আছে কি না। পাঠদানের মান কেমন। শিক্ষার্থীর পারিবারিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা কী। মূল্যায়ন পদ্ধতি কতটা কার্যকর। এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। একদিকে মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থার মান উন্নত করতে হবে। অন্যদিকে যারা তবু পিছিয়ে পড়বে, তাদের জন্য দ্বিতীয় সুযোগ রাখতে হবে। এই দুই কাজ একসঙ্গে চলতে হবে।
‘নিশ-৩’-এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো উচ্চশিক্ষার সম্ভাবনা। কোনো শিক্ষার্থী যদি এই প্রোগ্রামের মাধ্যমে এসএসসি ও এইচএসসি সম্পন্ন করেন, তাহলে প্রচলিত যোগ্যতার ভিত্তিতে স্নাতক পর্যায়ে যাওয়ার পথ তৈরি হতে পারে। বাউবির ঘোষিত উদ্দেশ্যের মধ্যেও উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের কথা রয়েছে। তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট রাখা দরকার। এসএসসি-এইচএসসি সনদ পেলেই সব বিশ্ববিদ্যালয় বা সব বিষয়ে স্বয়ংক্রিয় ভর্তি নিশ্চিত হবে না। সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি নীতি, বিষয়ভিত্তিক যোগ্যতা এবং অন্যান্য শর্ত প্রযোজ্য হবে। তাই শিক্ষার্থীদের শুরু থেকেই এ বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা থাকা প্রয়োজন। সনদের গ্রহণযোগ্যতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আরেকটি বিষয় জরুরি। কারিকুলাম যেন শুধু সনদ পাওয়ার জন্য তৈরি না হয়। এটি হতে হবে জীবন ও কর্মমুখী। বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় কার্যকর যোগাযোগ। মৌলিক গণিত। ডিজিটাল দক্ষতা। তথ্য যাচাইয়ের সক্ষমতা। নাগরিক জ্ঞান। নৈতিকতা। কর্মদক্ষতা। প্রয়োজনে উদ্যোক্তা ও কারিগরি দক্ষতার প্রাথমিক ধারণাও যুক্ত করা যেতে পারে। তাহলেই একজন শিক্ষার্থী শুধু পরীক্ষায় পাস করবেন না। তিনি বাস্তব জীবনের জন্যও প্রস্তুত হবেন। সিলেবাস চূড়ান্ত করার সময় কওমি মাদরাসার শিক্ষক, শিক্ষাবিদ, ধর্মীয় শিক্ষাবিদ, কর্মসংস্থান বিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত নেওয়া প্রয়োজন। কারণ এই প্রোগ্রামের সাফল্য নির্ভর করবে এর গ্রহণযোগ্যতার ওপর। কওমি সমাজ যদি এটিকে নিজের শিক্ষার স্বকীয়তার প্রতি সম্মানজনক উদ্যোগ হিসেবে গ্রহণ করে, তাহলে অংশগ্রহণ বাড়বে। একই সঙ্গে মানের প্রশ্নেও কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না। বিশেষায়িত বলেই মানদণ্ড কম হবে- এমন ধারণা তৈরি করা যাবে না। বরং একই সঙ্গে স্বাতন্ত্র্য ও মান নিশ্চিত করতে হবে। পরীক্ষা হতে হবে বিশ্বাসযোগ্য। মূল্যায়ন হতে হবে স্বচ্ছ। শিক্ষক ও স্টাডি সেন্টারের মান নিশ্চিত করতে হবে। সনদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে যেন ভবিষ্যতে কোনো প্রশ্ন না ওঠে।
বাউবি ইতোমধ্যে এসএসসি ও এইচএসসির বিভিন্ন প্রোগ্রাম পরিচালনা করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটেও এসব প্রোগ্রামের নিয়মিত ভর্তি ও পরীক্ষাসংক্রান্ত তথ্য প্রকাশিত হচ্ছে। তাই ‘নিশ-৩’ বাস্তবায়নে সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো দরকার। আমাদের মনে রাখতে হবে, শিক্ষা কোনো একমুখী রাস্তা নয়। কারও পথ একটু দীর্ঘ হতে পারে। কারও পথ বদলে যেতে পারে। কেউ মাঝপথে থেমে যেতে পারেন। কিন্তু তাই বলে তার সামনে সব দরজা বন্ধ হয়ে যাবে- এটি হতে পারে না। একজন কওমি শিক্ষার্থী ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন করেছেন। এখন তিনি বাংলা, ইংরেজি, গণিত ও আধুনিক জ্ঞান অর্জন করতে চান। তাকে সেই সুযোগ দিতে হবে। একজন আলিয়া শিক্ষার্থী মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছেন। আবার পড়তে চান। তাকেও সুযোগ দিতে হবে। একজন কর্মজীবী মানুষ বহু বছর পর পড়াশোনায় ফিরতে চান। তাকেও সুযোগ দিতে হবে। এই দর্শনই উন্মুক্ত শিক্ষার শক্তি।
‘নিশ-৩’ তাই কেবল দুটি নতুন প্রোগ্রামের নাম নয়। এটি হতে পারে শিক্ষার সঙ্গে বিচ্ছিন্ন মানুষের কাছে ফেরার একটি সেতু। হতে পারে কওমি শিক্ষা ও মূলধারার শিক্ষার মধ্যে একটি কার্যকর সংযোগ। হতে পারে দ্বিতীয় সুযোগকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার একটি উদ্যোগ। ২০২৭ সালে যদি এর যাত্রা শুরু হয়, তবে লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু ভর্তি নেওয়া নয়। লক্ষ্য হওয়া উচিত সফলভাবে শিক্ষার্থীদের এগিয়ে নেওয়া। ২০২৯ বা তার পরের বছরগুলোতে যেন আমরা বলতে পারি- একটি উদ্যোগ সত্যিই বহু শিক্ষার্থীর সামনে নতুন দরজা খুলেছে। কারণ শিক্ষার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো- এটি মানুষকে দ্বিতীয়বার শুরু করার সুযোগ দেয়। একটি সনদ হয়তো হাতে দেওয়া যায়। কিন্তু একটি শিক্ষার সুযোগ একজন মানুষের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে। তাই কওমি থেকে বাউবিতে এসএসসি-এইচএসসি যাওয়ার এই পথকে শুধু একটি একাডেমিক কর্মসূচি হিসেবে নয়, সমান সুযোগ ও মানবসম্পদ উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে দেখা দরকার। শিক্ষার দরজা যত বেশি মানুষের জন্য খুলবে, দেশের সম্ভাবনাও তত বিস্তৃত হবে। ‘নিশ-৩’ সেই বিস্তৃত পথের একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু হয়ে উঠুক—এটাই প্রত্যাশা।
2026 © Amar Dorpon. All Rights Reserved