কাজল মালেক
ধপ করে একটা শব্দ হলো। সানজনা এদিক ওদিক ঘুরে দেখে। কিসের শব্দ? তাদের বেড়ালটা তার পায়ে লেজ ঘষে তার পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে। জানালার কার্নিশ থেকে লাফিয়ে নেমেছে নবাব। কোথায় গেলো মার্জার? সানজনা তাদের চারতলা বাসার দক্ষিণের বারান্দায় বসে শরীরে চাঁদের আলো মাখছে আর শব্দহীন জোছনার গান শুনছে।
এমন মায়াবী জোছনা সচরাচর মেলেনা। হঠাৎ কোন কোন রাতের ভিন্নতর উপহার এমন বরফসাদা জোছনা। । সবাই এর সৌন্দর্যের মাধুর্য উপভোগ করার সুযোগ পায়না। চোখ থাকলেই মানুষ সব দেখেনা, মন থাকলেই সব কিছু বুঝেনা। চাঁদের আলোয় একধরনের রহস্যময়তা থাকে। সেই রহস্যময়তাকে আরও ঘনীভূত করেছে এই চারপায়ী ছোট্ট প্রাণীটির আগমন নির্গমন। ও কি তাদের নবাব না বহিরাগত। মাঝেমধ্যে নবাবের মেয়ে বন্ধুর আবির্ভাব ঘটে। আজ কি সে এসেছিলো? কী তার গায়ের রং ছিলো? সাদা না ধুসর বোঝা যাচ্ছিলোনা, তবে গলার পাশ দিয়ে হলুদাভ দাগ পেটের নিচ পর্যন্ত গিয়েছিলো। নবাবেরও এরকম দাগ রয়েছে। তার লোমশ দেহ। যাবে কোথায়? ঘরের ভেতরে প্রবেশের পথ বন্ধ। ওই পথ খোলা পেলে রাজ্যের মশা হুর হুর করে ঘরে ঢুকে। সানজনা দরজা বন্ধ করে বারান্দায় এসে বসেছে। শুক্লা দ্বাদশীর চাঁদ আকাশে। দুধসাদা রং ভরা জোছনার খল খল হাসি, ঢেউ তুলেছে তার মাখন নরম গায়ে। মধ্য শরতের এই সময়টায় এখনো গরম কাটেনি। বাসার পাশে একটু দূরে বিস্তৃত মাঠ। কারা জমি কিনে প্লট করে ফেলে রেখেছে। বাড়িঘর করেনি। সেখানে গড়ে উঠেছে কাশের রাজ্য। আর আজ চাঁদ নেমেছে সেই ধবলশুভ্র কাশের বনে। অমলধবল জোছনা লুটোপুটি খাচ্ছে সাদা সাদা কাঠিপুষ্প গুচ্ছে। বেড়ালটাকে ওখানে দেখে সানজনা। চরতলা থেকে কিভাবে নেমে এতো দূরে চলে গেলো? ওখানে দুয়েকটা জোনাকীর আনাগোনা। সানজনা বলে জোনাকপাখি। মিটমিট বিন্দু আলোর এই ক্ষুদ্র প্রাণীটির একটাকে কাছে পেয়ে মুঠোয় ভরে নিলো সে। এবার মুঠো খুলে তাকে দেখতে চায়। কখন আঙ্গুলের ফাঁক গলিয়ে বেরিয়ে গেছে বুঝতে পারেনি। হতাশ হলো সানজনা।
একটা কুকুর মার্জারটাকে তাড়া করলো। সাদামতো লোমশ ছোট্ট জন্তুটা খরগোশের মতো দ্রুত দৌড়ে এদিকে এগিয়ে আসছে। সানজনা উঠে ঘরে গিয়ে নিচে সিকিউরিওটি গার্ড কে ফোন করে। জানায়, বেড়ালটাকে পেলে ধরে যেন ওপরে পাঠিয়ে দেয়।
একটু পড়েই বিড়ালটাকে নিয়ে দারোয়ান আম্বর আলী হাজির। কিন্তু এটা তাদের বাসা বেড়াল নবাব না। আর হবেইবা কি করে, নবাব তো কখনো বাসার বাইরে যায়না। তার খাবার আলাদা,বিছানা আলাদা। মাসে কয়েক হাজার টাকার খাবার লাগে নবাবের। ডাক্তার, চিকিৎসা খরচ হিসেবে আনলে এর অর্ধেক খরচে একটা মানুষের খাবার হয়ে যাবে।
দারোয়ান বেড়ালটাকে নিয়ে বেরিয়ে গেলো। সানজনার মোবাইলটা বেজে উঠে। তাবিথ ফোন করেছে। "আসছি। আজ তোকে মায়াবী জোছনায় মৃত্যু দেখাবো। তোদের চারতলা থেকে লাফিয়ে মরবে অনীক। একটা মেয়েকে ভালবেসে প্রমিজ করেছে,মায়াবী জোছনায় মরে গিয়ে সে তাকে তার মরদেহ উপহার দেবে।" সানজনা ক্ষীপ্ত হয়ে বলে, "কী আশ্চর্য, তো আমাদের এখানে কেন? আম্মা বাসায়, এসব ইয়ার্কি সহ্য করবেনা।"
কিন্তু ওরা এলো। যথারীতি গোপন সিদ্ধান্ত হলো, চারতলার ওই বারান্দা দিয়ে লাফিয়ে পড়বে অনীক। প্রেমিকাকে চিঠি লিখে রেখেছে, সে চিঠি পড়তে দিলো সবাইকে। অনেক বৃত্তান্ত। শেষে লিখেছে,
" ধবধবে জোছনায় আমার লাশ গ্রহণ করো প্রিয়তমা।"
সানজনা জিজ্ঞেস করলো, "পুলিশ এলে আমরা কি জবাব দেবো? এই বাসায় কেন ভালবাসার মৃত্যু?" অনীকের উত্তর, " আমি নিচতলায় থাকি। ধবল জোছনায় মরতে হলে বিষ খেয়ে বা গলায় দড়ি দিয়ে মরলে তা রোমান্টিক হবেনা। রাস্তায় গাড়ি চাপায় মরতে পারতাম,কিন্তু সেখানে অনিশ্চয়তা আছে। গাড়ি ব্রেক করে মৃত্যু ঠেকাতে পারে,কেউ ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিতে পারে কিংবা গাড়ি চাপায় আংশিক মৃত্যু হওয়ার মানে আহত হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায়না। রোমান্টিক মৃত্যুর জন্য এই জোছনায় কোন উঁচু স্থান থেকে লাফিয়ে পড়াটাই সবচেয়ে ভালো উপায়। মৃত্যু নিশ্চিত।" সানজনা শিহরিত হয়। দারুণ রোমান্টিক। মা কিছুই জানবেনা।
ওরা রাজী হলো। অনীক চারতলা থেকে জানালার পূবের রেলিঙ ধরে উঠে নিচে লাফিয়ে পড়বে। জায়গাটা ফাঁকা আছে। চিৎ বা উপুড় হয়ে পড়বে, রক্তাক্ত দেহ খানিকক্ষণ নাড়াচাড়া করবে। তারপর শেষ। ঘটনা ওরা দুজন ছাড়া আর কেউ জানেনা। সানজনা বললো, "চা টা খেয়ে নে,মা ডাকছে।" অনীক বললো,"জীবনের শেষ চা, চল খেয়েই নিই। দেখিস, খালাম্মা যেন ঘুনাক্ষরেও না জানে যে আমরা কী করতে যাচ্ছি।" তাবিথ লাফিয়ে উঠে, "তাহলে সর্বনাশ, সব মজাই শেষ।" ওরা খাচ্ছে, মা পাকুড়া ভেজে দিয়েছেন। তাবিথ ঘটনার পুরোটাই লাইভ দেখাবে লাবন্যকে। লাবন্যর ইচ্ছে, মায়াবী জোছনায় প্রেমিকের মৃত্যু সরাসরি প্রত্যক্ষ করবে।
চা খাওয়া শেষ। ওরা বারান্দায় চলে এলো। রোদের মতো জোছনা চারদিকে। অনীক কার্নিশে উঠে দাঁড়ালো। তাবিথ তার মোবাইলের ক্যামেরা অন করে। সানজনা এক, দুই, তিন পর্যন্ত বলবে। আর সঙ্গে সঙ্গে নিচে লাফিয়ে পড়বে অনীক। সবথেকে ভালো ছবি আসে এরকম কোনায় গিয়ে দাঁড়ালো তাবিথ। "আমি তোমায় ভালোবাসি, লাবন্য" জোরে চেঁচিয়ে বলে লাফিয়ে পড়বে অনীক। সব প্রস্তুত। যেন সিনেমার শুটিং চলছে। অনীক কার্নিশে উঠে গেছে। ধপ করে একটা শব্দ, জানালা থেকে বেড়ালটা নামলো। হঠাৎ নিচে হৈচৈ। পুলিশের বাঁশি। ঘন ঘন বাজছে। চোর তাড়াচ্ছে। পোষা বেড়ালটা লেজ দিয়ে সানজনার পা ছুঁইয়ে দিলো। বুঝতে না পেরে "ও মাগো" বলে ভয়ে আঁতকে উঠে পা সরিয়ে নেয় সানজনা। ধপাস করে সে বারান্দায় বসে পড়ে। তাবিথ চিৎকার করে বলে, "অনীক, পুলিশ। লাফ দে,লাফ দে, নিচে না। লাফ দিয়ে নেমে আয় বারান্দার ফ্লোরে।"
2026 © Amar Dorpon. All Rights Reserved