
কাজল মালেক
২০তম পর্ব
বাড়ি ফিরতে গিয়ে পথেই বিষন্ন জুমন ক্লান্তিতে নেতিয়ে পড়ে। তার নজরে আসে তাদের বাড়ির দেউড়ির বাইরে আমগাছের নিচে স্থূলকায় একটা খাশি মাটির পাত্রে মুখ ডুবিয়ে রেখেছে। পাত্রে দেয়া ভাত আর কচি আমপাতা মুখে তুলে নিয়ে আপনমনে চিবুচ্ছে সে। জুমন শাহনের হাত থেকে বন্দুকটা নেয়। বলে,
"টুটা বাইর কর।" টুটা মানে কার্তুজ, বন্দুকের গুলি।
বেল্ট থেকে কার্তুজ বের করে জুমনের হাতে দেয় শাহন। ইঞ্চিদেড়েক লম্বা কার্তুজগুলো সোনালী রংয়ের সুদৃশ্য চামড়ার বেল্টের সারিবদ্ধ পকেটে সাজিয়ে রাখা। শিকারে বেরোনোর সময় কাঁধে বন্দুক আর বেল্টটা বগলের নিচে দিয়ে মালার মতো তার গলায় পরা থাকে। কার্তুজ রাখার এই বেল্ট কখনো কোমরেও কাঁচুলির মতো বেঁধে রাখে শাওন। গুলি ভরে খাশিটার দিকে বন্দুক তাক করে জুমন। মুহূর্তে গুলির শব্দ। খাশিটা রক্তাক্ত হয়ে মাটিতে পড়ে গিয়ে আবার উঠে দাঁড়ায়। ছড়রা গুলিতে পাখি মরে, জন্তু মরেনা। শুধু আহত হয়। যন্ত্রণায় ছটফট করছে তহরজানের পালিত খাশি। গলায় রশি দিয়ে খুঁটির সাথে বাঁধা,ছুটতে গিয়ে শুধু চারদিকে ঘুরছে।
"শাহন, ছুরি আন। শুক্কুইরারে লইয়া অইডারে জবো কর। এইডাই আউজকার শিহার। বাঘটারে গুলি করলে, দ্যাকছচ, এইরহম, লাফাইতো। মরতো না। আমি মরতাম।" হন হন করে বাড়ির ভেতরে ঢুকে যায় জুৃমন আলী প্রধান। ভয়ে শাহন কথা বাড়ায়না। বাঘের মুখের থেকে আজ ফিরে এসেছে ছোট প্রধান। শাহন আর শুক্কুরালী মিলে খাশিটা জবাই করে মাংস কেটে নেয়। তার মনে পড়ে হাসিখালি বাইদের কথা। বাঘটাকে পাখি মারার স্বল্পশক্তির এই কার্তুজ দিয়ে গুলি করলে ঠিকই জান নিয়ে বাড়ি ফেরা হতোনা আজ। খবর হতো, জুমনকে বাঘে খেয়েছে।
আউশধান কাটার সময় হয়েছে। কালচে রংয়ের চাহইল্যা ধান পেকে ক্ষেতের মধ্যেই ডুবতে বসেছে। কদিনের একটানা বর্ষণে ক্ষেতেখলায় যে পানি জমেছে তা এখনো সরেনি।
চৈত্রে শুকিয়ে যাওয়া পগার,জলাশয় আর ছোট পুকুরগুলো এখন পানিতে টইটম্বুর। শুক্কুরালী ফজরের আগে বেরিয়ে গেছে উজিয়ে আসা মাছ ধরতে। এই সময় নতুন পানির স্রোতের সাথে খালবিল, নদীনালা থেকে নানা জাতের মাছ উজিয়ে এসে ক্ষেতে, জলাশয়ে জমা হয়। ডিম ছেড়ে আবার ভাটির টানে নেমে যেতে থাকে। প্রাকবর্ষার নয়া পানিতে মাছেদের উৎসবে পাগলপারা আনাগোনার মাঝে তারা সহজেই জালে আটকা পড়ে। ভারী বৃষ্টি নামলে জাল, জালি ও টেঁটাসহ মাছ শিকারের আয়োজন শুরু হয়ে যায়।গাঁয়ের লোকেরা বিভিন্ন উপকরণ নিয়ে মাঠে জনস্রোতের বিপরীতে গিয়ে দাঁড়ায়। নতুন পানিতে আনন্দে আত্মহারা বিলনদীর উজানে উঠে আসা মাছ অধিকাংশই আর ফিরে যেতে পারেনা।
শুক্কুর আলীর খালুইতে ভরা চকচকে পুঁটি, টেংরা,মলা,চাপিলা,পাবদাসহ ছোট মাছ। কয়েকটা সরপুঁটি আর একটা বোয়ালও পেয়েছে। সরজানকে মাছগুলো কেটেকুটে ভালো করে ধুয়ে
আনতে বলে তহরজান। শোনায়, "মাছ ধোয়া সাতবার, মাংস ধোয়া একবার, বুঝছচ খাতুন। আরও এগুলান ছোডো মাছ। লবন দিয়া কচলাইয়া ডলা দিয়া ধুইছ কিন্তুক। নাইলে আইশট্যা গন্ধ করবো।" সরজান হেসে উত্তর দেয়,"হ। বুজজি তো। তে আমনেহ যেভায় কচলাইয়া ডইল্লা ধইতে কইতাছুইন, তাইলে মাছ তো আর একটাও থাকতোনা, ডলার লগে মিশ্যা ভত্তা অইয়া যাইবো।"
"অইচে অইচে বুদ্ধির ডেহি - তরে যা কইচি করগা। মাছ ভত্তা অইলে খবর আছে।" তহর জান বারেককে কোল থেকে নামিয়ে বিছানায় শুইয়ে দেয়। তিনমাসের বাচ্চা, জন্মের সময় মুমূর্ষু ছিলো তহরজান। মা আর নবজাতকের জীবন নিয়ে যমে মানুষে টানাটানি চলেছে তখন। ডাক্তার কবিরাজ মিলে ছোট প্রধানবাড়িতে তাদের বাসা বানিয়ে নিয়েছিলো। পুনরায় ছেলে হওয়াতে জুমন প্রধানের মান অভিমানের সুযোগ ছিলোনা। এটা আল্লাহর ইচ্ছা আর ভাগ্য বলে মেনে নিয়েছে সে।
আল্লাহর রহমতে মা ছেলে উভয়ই সুস্থ এখন। তহরজানের শরীর ভেঙ্গে পড়েছে। এখনো প্রসব পরবর্তী নানা জটিলতা তার দেহে। তবু সংসারের কাজ থেকে তার মুক্তি নেই।
বোয়াল মাছ ভোনা আর সরপুঁটি মশলাভাজা করে মাটির পেয়ালায় সাজিয়ে রাখে তহরজান। বোয়াল মাছের কাঁটা কম। হাসেম আর কাশেম খুব পছন্দ করে। জুমনের পছন্দ শুকনো শুকনো ঝোল কম কচি ডাটার সঙ্গে চাপিলামাছ আর ঝিঙা ও সাতসতীনের সাথে বেশি করে পেয়াজ-কাঁচামরিচ মিশিয়ে মলা-ডেলার চচ্চড়ি। সাতসতীন ঝিঙাজাতীয় সব্জী। দেখতে একইরকম খাঁজকাটা আকৃতির হলেও সাইজে আঙ্গুলের মতো ক্ষুদ্র। ঝিঙা গাছের মতোই লতানো গাছের একই বৃন্তে একসঙ্গে অনেকগুলো(৭/৮টা) ফল ধরে ঝুলে থাকে বলে একে সাতসতীন বলে। এই এলাকায় এটি হাতন্তী নামে অধিক পরিচিত।
সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পূর্ববর্তী ইস্কান্দার মির্জা সরকারকে উৎখাত করে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান ক্ষমতা কুক্ষিগত করেন। পাকিস্তানের সামরিক শাসনকে বৈধতা ও গণতান্ত্রিক রূপ দেয়ার জন্য এক অভিনব প্রচেষ্টা চালান তিনি। ১৯৬০ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারি একটি পরোক্ষ গণভোট অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে ভোটারদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিলো যে, ১৯৫৮ সাল থেকে অধিষ্ঠিত সামরিক প্রেসিডেন্ট আরও পাঁচ বছরের জন্য এই পদে থাকবেন কি না। পাকিস্তানের জনগনের প্রত্যাশায় বারবার আঘাত এসেছে। গণতন্ত্র চর্চা ব্যাহত হয়েছে। প্রথম দশ বছরের ধুঁকতে থাকা গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাওয়ার আগেই আরোপিত সামরিক শাসন দেশবাসীর স্বপ্ন, আশা-আকাঙ্ক্ষাকে চূর্ণ করে দিলো। ১৪ আগস্ট এলে স্বাধীনতা উৎসবে মেতে উঠে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মানুষ। কোটি কন্ঠে ধ্বনিত হয়," খাইবার ধারে তার পতাকাবাহী, মেঘনার কোলে যতো বীর সিপাহি।" কিন্তু সম্মিলিত দেশপ্রেমের ভেতরও ক্রমশঃ শুরু হলো রক্তক্ষরণ। খাইবার আর মেঘনার জল কখনো এক স্রোতে প্রবাহিত হয়নি,হবার কথাও নয়। বরং দুই নদীর চার তীরের অধিবাসীদের মনে অসন্তোষ দানা বাঁধতে শুরু করলো। বিশেষ করে পূর্ব পাকিস্তানের অধিবাসীরা বুঝতে পারলো এই স্বাধীনতা একটা অলীক স্বপ্ন মাত্র, বাস্তবে ভাঁওতাবাজি। পূর্ববঙ্গের সম্পদে বিত্তবান হচ্ছে পশ্চিম পাকিস্তানের ব্যবাসয়ী আর শাসকবর্গ। জিনিসপত্রের যোগান ও দ্রব্যমূল্যসহ সবকিছুতে সর্ব্যাপী বৈষম্য। পাট উৎপন্ন হয় পূর্ববঙ্গে, আর পাট ও পাটজাত দ্রব্যের ব্যবসায়িক লাভালাভের হিসাব হয় করাচীতে। সরকারি চাকরি ও সেনাবাহিনীর উচ্চ পদে পূর্ব পাকিস্তানের অংশ শূন্য। জনসংখ্যায় গরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও রাষ্ট্রের শাসন ক্ষমতায় পূর্ব পাকিস্তানের নেতাদের মূল্যায়ন নেই,তাদের অংশগ্রহন নেই। এইসব বিষয় নিয়ে জনমানুষের অসন্তোষ এড়িয়ে যাওয়ায় পাকিস্তান সম্পর্কে তাদের ইতিবাচক ধারণার পরিবর্তন ঘটতে থাকে। সেখানে জন্ম নেয় ক্ষোভ, ঘৃণা আর পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস।
তহরজানের আরও একটি ছেলে হলো। নাম রেখেছে আবদুর রশীদ প্রধান। জুমন এসব নিয়ে আর কথা বলে না। পবিত্র কোরানের সূরা "শুরের" কথা মনে পড়ে। প্রত্যহ ভোরে ফজরের নামাজ আদায় করে কোরান তেলাওয়াত করে সে। আল কুরআনো হাক্কুন, কোরান সত্য।
রশীদ তার বাবার চেহারা পেয়েছে। সেরকম নাকচোখ,হাতের আঙ্গুলগুলো, মুখের গড়ন, তহরজান এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে ছেলের মুখের দিকে। মনে মনে বলে, 'তাও হের মন ভরলো না। রশীদ ত তার চেহারাই পাইছে। তাও কোলে নেয়না। পরধানী কী কঠিন।" রশীদ জন্মের সময় তহরজান মুমূর্ষু ছিলো। আগেরবাও বারেককে একই অবস্থা। অসুস্থ শরীরেও বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই তার পেটে বাচ্চা আসে। এ যেন তার নিয়তি। কাঁকড়ার ও মাকড়শার মতো জীবন তার। কাঁকড়া ও মাকড়সার বাচ্চারা তাদের বুকের মাংস খেয়ে বড় হতে থাকে। যেদিন বাচ্চারা মায়ের পেট থেকে পিল পিল করে বেরিয়ে আসে সেদিন মায়ের মাংস আর অবশিষ্ট নেই। পুরোটা তাদের সন্তানেরা খেয়ে ফেলেছে। কাঁকড়া ও মাকড়সার তাদের বুকের মাংসের বিনিময়ে জন্ম দেয় তাদের পরবর্তী প্রজন্ম। আর তাদের প্রাণহীন দেহের খোলসটা অযত্নে পড়ে থাকে।
জন্ম দেয়ার আগে যে সন্তানের আগমন চায়নি তহরজান বরং তার আগমন প্রতিহত করার জন্য কতোনা প্রার্থনা করতো, আর সেই সন্তান ভূমিষ্ট হবার পর এখন তার জন্য কী মায়া, অন্তরের কী অবিনাশী টান। বরং ভয়ে বুক কাঁপে তার। কোন কুক্ষণে এমন সর্বনাশের কথা ভাবতে পেরেছিলো সে। এই ছেলে যদি কোলে না আসতো, তার জীবন অপূর্ণ থেকে যেতো। তহরজানের দুচোখ গড়িয়ে অশ্রুর বন্যা নামে। দু'হাত তুলে আল্লাহর কাছে মুনজাত করে, "আমার সন্তানরে ভালো রাইহো খোদা। তার বালা মছিবদ দূর কইরা দিও।" বারেকের কান্না থামাতে পারছেনা সরজান। তাকে তহরজানের কোলে দিয়ে যায় সে। মায়ের কোল পেয়ে দুধের ভাগ নিতে চায় বারেক। খুব রাগী আর একগুঁয়ে হয়েছে ছেলেটা। মায়ের বুক থেকে রশীদের মুখ সরিয়ে সে নিজেই দুধ খেতে শুরু করে। রশীদ ট্যা ট্যা করে কাঁদে। দুটি শিশুর মধ্যে বয়সের ব্যবধান একবছরও হবেনা।
জনাবালী মাদবর মারা যাবার পর সংসারের হাল ধরবার কথা ছিলো রোছমতের। কিন্তু বাউন্ডেলে রোছমত কাঁচা টাকা পেয়ে প্রমোদ ভ্রমণে আজ রেঙ্গুন, কাল কলকাতা, পরশু করাচী ঘুরে বেড়ায়। সংসার তাকে বাঁধতে পারেনি অধিকন্তু বাবা জনাবালী মাতব্বরের রেখে যাওয়া নগদ টাকা পেয়ে সে চঞ্চল হয়ে উঠে। কাউকে না জানিয়ে ঘরে বউ ছেলেমেয়ে ফেলে রেখে ১০/১২ দিনের জন্য উধাও হয়ে৷ যায় রুছু। ঘরবিমুখ এক অদ্ভুত বাঁধন হারা পাখির মতো নির্ভাবনায় দিন কাটে তার। কিন্তু সঠিক ব্যবহার না করলে অর্থসম্পদ বানের জলের চেয়েও দ্রুত ভেসে যায়। বিচক্ষণ জবানালী কিঞ্চিৎ লেখাপড়া জানে। এলাকার লোকজন এজন্য তাকে সরকার বলে। মাদবরের ২য় সন্তান সে। সংসারের লাগাম টানার ভার তার উপর। এরমধ্যে সর্বকনিষ্ঠ ভাই মাহমুদের অকাল মৃত্যু হয়েছে। একটি প্রতিবন্ধী বাচ্চা নিয়ে সদ্য বিধবা ফজিলাতুন্নেছা পণ করেছে স্বামীর ভিটা ছেড়ে কোথাও যাবে না সে। তার বয়স অল্প,দেখতে সুন্দরী। এরকম যুবতী নারীকে এই বাড়িতে রাখা অস্বস্তিকর। ভুলভ্রান্তি মানুষেরই হয়। এছাড়া মানুষের মুখে বিষ। কখন কি কু কথা তুলে না আবার বাড়ীর সম্মান প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়। এদিকে মাহমুদের সব সম্পত্তির মালিক তার একমাত্র সন্তান এই বিশেষ শিশু। তার জমিজমার পরিমাণও অনেক। জবানালী সরকার সিদ্ধান্ত নিলেন এই সম্পত্তি তিনি বেহাত হতে দেবেন না। মসজিদের ইমাম সুবেদালীকে ডেকে তিনি ফজিলাকে নিজের ২য় স্ত্রী হিসেবে ঘরে নিলেন। মৃত সহোদর অনুজের বিধবা স্ত্রীকে বিয়ে করায় সমাজে সাময়িক ডি ডি পড়লেও এটা বেশিদূর গড়ালোনা। ইমাম সাহেব জানিয়ে দিলেন যে,শরীয়ত মতে এই বিয়ে বৈধ। বরং অসহায় এক যুবতী বিধবা ও তার অসুস্থ প্রতিবন্ধী ছেলেকে নিজের ঘরে ঠাঁই দেয়া নেকীর কাজ।
2026 © Amar Dorpon. All Rights Reserved