

কাজল মালেক
২৫তম পর্ব
প্রত্যুষে উঠে ফজরের নামাজ আদায় করে তহরজান। আজও নামাজ শেষ করে জায়নামাজে বসে দূআ দরুদ পড়ছিলো। বাড়ির উঠানে কারো আগমনের শব্দ শুনে সচকিত হয় সে। এই সাতসকালে কে আসবে? দরোজার কাছে গিয়ে কান খাড়া করে। ডাকছে তাকে। গলা শুনে চমকে উঠে তহরজান। এতো তার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা রুছমতের কন্ঠ।
আবার ডাক শুনে দরোজা খুলে দেয় সে। রুছমত বোনের কাছে এসে বলে, "ভিতরে যাইতি দিতিনা?" মুহূর্তে অভিমানে তহরজানের কন্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসে। আঁচলে চোখ মুছে। পাশে দাঁড়িয়ে রুছমত। তার চোখেও জল।বাষ্পরুদ্ধ কন্ঠে বলে সে, "কী যে অইলো তহর। আমি পারিনা। আমার কইলজা ফাইট্টা যায়। আক্কু এইডা কি করলো?" এবার নিজেকে আর সামলে নিতে পারেনা তহরজান। উচ্চৈঃস্বরে কেঁদে উঠে। বলে, "তুই চইলা যা বড়দাদা। তরে কেডা কইছে আইবার। পরদানীরে জেলে ডুহাইয়া এহন কোন মুহে এই বাইত আইচছ? যাইগগা তুই। হোয়াগ দেহান লাগতোনা।" " আমারে ভুল বুঝিছনা বইন" সহোদরার হাত ধরে রুছমত সরকার। আবেগের বশে আবার বলে,"আমি আর পারিনারে। আমি আর পারিনা। তুই আমার আদরের বইন। ক,তর এই অবস্থা দেইহা কেমনে সইজ্য হরি। কেমনে চুপ থাকবার পারি। জবান ক্যান কিছু কয়না? আরঅ আক্কুরে তাল দেয়।"
তহরজান জানে রুছমত গৃহবিমুখ বাউল প্রকৃতির এক উদাসীন মানুষ। সংসারের জটিলতা, কুটিল কৌশল কিংবা আপন মানুষের সঙ্গে শত্রুতার মতো নীচতা তার স্বভাবে নেই। আর এ সম্পর্কে কোন খবরও সে রাখেনা। সাদাসিধা এই মানুষটি নিজেকে ছাড়া আর সবাইকে ভালবাসে। ভালবাসে তার ছন্নছাড়া বন্ধনহীন পথচলাকে। নতুন পথের নেশায় জীবনভর অশান্ত পথচর সে।
"আয়, ঘরে আয় দাদা।" হাত ধরে তাকে ঘরে নিয়ে যায় তহরজান। তার সহোদর, মাদবরবাড়ির জ্যেষ্ঠজন। আবার বলতে থাকে রুছমত,"আমি বাড়িত ছিলাম না রে। জাহাজে চইড়া রেঙ্গুন গেছিলাম। তর লাইগ্যা চুরুট আনছি(রেঙ্গুন থেকে আগেরবার চুরুট এনে তাতে সে আগুন ধরিয়ে বোনদের দিয়ে বলছিলো, খা,এইডারে কয় বার্মিজ চুরট। টান দে। দ্যাখ কি মজার গন্ধ। তহরজান চুরুটে টান দিয়ে মুখ দিয়ে ধোয়া বের করে। এভাবে ভাইয়ের প্রেরণায় রেঙ্গুনের চুরুট তাকে ধীরে ধীরে ধূমপায়িনী করে তুলে)। কিন্তুক বাড়িত আইয়া হুনি এই ঘটনা। এইডাতো নিচ্চিত, এইডা আক্কুর ষড়যন্ত্র, আর আংগর মাদবরসাবের বুদ্ধি। আমি লইজ্জায় আইনাই। আর জবানও সাবধান কইরা দিলো, কইলো,"খাতির কইরা পরদানীবাড়ি যাইচনা আবার। পাইলে ধইরা ঠ্যাং ভাইঙ্গা দিবো। পরদানীর জেলে যাওয়ার শোধ উডাইবো। হুনছচনা অরা আংগরে সব দুষ দিতাছে।"
"দাদাগো! এই বাচ্চাগরে লইয়া আমি কেমনে থাহি? ক্যান আমার সব্বনাশ করলি তরা" তহর আকুল কান্নায় ভাসে।
মায়ের কান্নার শব্দে বারেক আর রশীদের ঘুম ভেঙ্গে যায়। হাত দিয়ে দুচোখ কচলিয়ে বারেক বলে, "মা,তুই কান্দচ ক্যায়া।"রুছমত ওদের দুই ভাইকে বুকে জড়িয়ে নেয়। তহরজানকে বলে,"চিন্তা করিচনা। আমি আছিনা! আমি আইয়া তরে দেইহা যাইয়াম।"
ভাইয়ের বুকে মুখ রেখে তহরজান ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে। ভাইয়ের চোখের তপ্ত জলধারা বোনের চোখের জলের সাথে মিশে একই ধারায় গড়িয়ে পড়ে। স্বীয় বক্ষ থেকে ভগিনীর মুখটি দুহাতে তুলে ধরে বলে, "দেহিছ, অগোর সব ষড়যন্ত্রের কতা আমি পুলিশরে কইয়া দিবাম। হাসেমের বাপের পক্ষে আমি স্বাক্ষী দেম।" অঘোরে ঘুমাচ্ছিলো ছোট্ট শিশু বকুল। ততক্ষণে বকুলও জেগে উঠেছে। রশীদ তাকে কোলে নেবার চেষ্টা করে।
কিন্তু জুমন আলী প্রধানের কপালের লিখন অন্যভাবে লেখা ছিলো। উত্তর ঢাকার চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী এতো বড়ো একটা গ্যাং কেইসের তারিখ পড়লে আদালতের শুনানিতে আগ্রহী লোকজন এসে ভীড় জমায়। তারা জানতে চায় একটা এলাকার অর্ধেক মানুষ, যাদের অনেকেই সচ্ছল, বিত্তবান, নেতৃস্থানীয় সুধীজন তারা কেমন করে চুরি ডাকাতির মতো এমন হীন কাজে লিপ্ত হলো। আদালতে রাষ্ট্র পক্ষের নাম করা সব উকিল, আইনবিশারদগন সমাজে সাধু ও ভদ্রবেশে লুকিয়ে থাকা এইসব অসাধু এবং দুষ্কর্ম্মে লিপ্ত ভন্ডদের মুখোশ খুলে দিতে তাদের অক্লান্ত চেষ্টা করে যাচ্ছেন। আদালতে তারা আসামীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবী করেন। আসামীর কাঠগড়ায় জুমনআলী প্রধান, ওপাশে ডাকাত দলের সহযোগী বর্তমানে রাজস্বাক্ষী শাহন আলী অবনত মস্তকে দাঁড়িয়ে আছে। সরকারি পক্ষের উকিলের তীব্র জেরার পরও জুমনের কাছ থেকে ডাকাতির তথ্য বেরা করা যাচ্ছেনা। সব অভিযোগ জুমন অস্বীকার করছে। এসব তার বিরুদ্ধে মিথ্যা, ষড়যন্ত্র। চিৎকার করে বলছে, "হুজুর, আমি যে ডাকাতির লগে জড়িত তার একটা পরমান দ্যান, শাহনরে দিতে কন। আমি অর মতকো সাপকে দুধকলা দিয়া পালছি। আর সে আমার বিরুদ্ধে মিছা সাক্ষী দিতাছে। আরে শাহন, একবার ভাইব্বা দ্যাখ তরে আমি কেমনে আদর কইরা মাতাত তুলছি।" জজ সহেবের নির্দেশনা গেলো, অর্ডার, অর্ডার।" সেদিকে খেয়াল না করে জুমন আবার বলে,"অরা হিংসা করে এসব অভিযোগ করছে। আমার কঠোর পরিশ্রমের ফল আমার এই উন্নতি তারা সইজ্জ করতে পারেনাই। আর এইডাই হইলো আমার শশুরবাড়ির আত্মীয়দের হিংসার কারণ।" এবার রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান উকিল আহাম্মদ আলী এজলাসে দাঁড়িয়ে কোর্টকে জোর গলায় বলেন , "মহমান্য আদালত, প্রমান আছে। সেই প্রমান বের করে দেখালে প্রধান সাহেবের এই উঁচু গলা মাটির সাথে মিশে যাবে। তার জবান বন্ধ হয়ে যাবে। মহামান্য আদালত, অনুমতি হলে এখন আমি আপনার সামনে একটা প্রামানিক জিনিস উপস্থাপন করবো।" অর্ডার অর্ডার বলে জজ সাহেব অনুমতি দিলেন। এডভোকেট আহাম্মদ আলী তার সহকারীর নিকট থেকে কালো কাপড়ে মোড়ানো একটা পুটলা চেয়ে নিলেন। পুটলার ভেতর থেকে বের করলেন একটা ঝকমকে কাঁসার বড়ো বাটি। এজলাসের উজ্জ্বল আলোয় কাঁচা সোনারংয়ের বাটিটা আর চকচক করে উঠলো। বাটি উঁচিয়ে ধরে তিনি জুমনকে দেখিয়ে বললেন, "প্রধান সাহেব। দেখেন তো এই জামবাটিটা আপনি চেনেন কিনা?" জুমন চমকে উঠে, এযে হাসেমের দুধ খাওয়ার বাটি। মাথা নিচু করে রাখে সে। বিকট একটা হাসি দিয়ে উকিল আহম্মদ আলী জজের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললেন, ''ইয়োর অনার স্যার। মৌণতাই সম্মতির লক্ষণ। আসামীর নীরবতাই প্রমাণ করছে এই বাটিটার সাথে তার সম্পর্ক আছে। আর অস্বীকারইবা করবেন কি করে, এটাতো তার রান্নাঘর থেকেই আনা হয়েছে।" উকিলের দীর্ঘায়ত নিঃশব্দ হাসির মাধ্যমে বুঝিয়ে দিলেন, এটা খুব অর্থবহ এবং তাদের কৌশলগত অস্ত্র। তিনি তার উপস্থাপিত বাটি কোর্টের হেফাজতে রাখতে দিলেন। বললেন, "হুজুর, এই বাটি সময়ে কথা বলবে।" আসামী পক্ষের আইনজীবী মিয়া মোহাম্মদ তার আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। পরিহাসচ্ছ্বলে বললেন,"মহামান্য আদালত, আমার প্রতিপক্ষ লার্নেট এডভোকেট সাহেব এতক্ষণ ধান ভানতে শিবের গীত গাইলেন। জানিনা তুচ্ছ একটা কাঁসার বাটির সাথে খুনখারাপি আর ডাকাতির কী সম্পর্ক। আমি জানি মহামান্য আদালত, আমার প্রতিপক্ষ গল্প বানাতে পছন্দ করেন এবং তা অসাধারণ দক্ষতায় উপস্থাপনও করতে পারেন। তিনি একজন রাজনৈতিক বাগ্মীও বটে। আদালত অনুমতি দিলে আমি এ বিষয় তার কাছে কয়েকটি তথ্য জানতে চাই।" জজ সাহেব টেবিলের নির্দিষ্ট স্থানে হাঁতুড়ি পিটিয়ে বললেন, "অর্ডার, অর্ডার। অনুমতি দেয়া হলো।" এডভোকেট মিয়া মোহাম্মদ তার প্রতিপক্ষকে জিজ্ঞেস করলেন, "এবার বলুন লার্নেট ফ্রেন্ড, এই বাটি দিয়ে আবার কোন ফাঁদ পাতা হয়েছে। আসলে আসামীকে দোষী সাব্যস্থ করার জন্য এই আয়োজন তা পুরোটাই তো একটা ভয়ানক ফাঁদ।"
"অবজেকশন ইয়োর অনার। আমার বন্ধু এই ধরনের আপত্তিকর মনগড়া কথা বলে অযথা সময় নষ্ট করছেন। আমি আমার বক্তব্যের পক্ষে প্রমাণ দেবো।"
"ওকে ইউর অনার। ধরে নিলাম বাটিটা অভিযুক্তের রান্না ঘর থেকে নিয়ে আসা হয়েছে। তাতে কি প্রমান হয়? পূর্ব পাকিস্তানে কি এই একটি মাত্র কাঁসার বাটি, যাকে বিজ্ঞ প্রতিপক্ষ সোনার পাথরবাটি ভেবে বসে আছেন"
"মহামান্য আদালত। আমি প্রমাণ করে ছাড়বো এই বাটি ডাকাতির মাল। রাজস্বাক্ষী ডাকু শাহনও এই বাটির সাথে জড়িত। তাহলে আমাকে আজ থেকে এক বছর পাঁচ মাস পূর্বে একটি ডাকাতির ঘটনার কথা স্মরণ করতে হয়। সেদিন জুমন প্রধানের নির্দেশমতো তার দলের ডাকাতরা ফুলবাড়িয়া গ্রামের ধনবান গৃহস্থ ও ব্যবাসয়ী দয়ালচন্দ্র দাসের বাড়িতে ডাকাতি করে। অতপর সেখান থেকে টাকাপয়সা, গয়নাগাটি ও প্রচুর জিনিসপত্র নিয়ে আসে। এগুলো জুমন সাহেব সিংহভাগ নিজের জন্য রেখে বাকী অর্থ ও মালামাল দলের লোকদের মধ্যে ভাগ করে দেন। আজকের ঘটনায় সম্পৃক্ত জামবাটি প্রধানগৃহিণীর খুব পছন্দ হয়। তিনি এটা সযত্নে তার রান্নাঘরে রেখে দেন।"
" মহামান্য আদালত। ওনার কথা মানলাম। ডাকাতি হয়েছিলো সেটা থানার রেকর্ড দেখলে প্রমান হবে। তবে এই কাঁসার বাটি যে দয়াল চন্দ্র দাসের এবং ডাকাতির সময় তা নিয়ে আসা হয়েছে তার কি কোন প্রমান দাখিল করবেন?" মিয়া মোহাম্মদের কথা আবারও কেড়ে নিলেন আহাম্মদ আলী। চেঁচিয়ে বললেন,"মহামান্য আদালত, সে প্রমাণ আমি নিয়ে এসেছি। এই বাটি দয়াল চন্দ্র দাসের কিনা তা তিনি নিজে সনাক্ত করবেন। আদালতের অনুমতি হলে দয়াল চন্দ্র দাসকে এখানে হাজির করা হবে।"
জজ সাহেব অনুমতি দিলেন। ঘন শুভ্র শশ্রুমন্ডিত অশীতিপর এক বৃদ্ধ প্রণামের ভঙ্গিতে দুই হাত কপালে ঠেকিয়ে কাঠগড়ায় এসে দাঁড়ালেন। এডভোকেট আহাম্মদ আলী তাকে জিজ্ঞেস করেন, " আপনি দয়াল চন্দ্র দাস?" বৃদ্ধ উত্তর করলেন, "আজ্ঞে। "
"আপনার বাড়ি কি কালিয়াকৈর থানার ফুলবাড়িয়া গ্রামে?"
"আজ্ঞে।"
"আপনার বাড়িতে ডাকাতি সংঘটিত হয়েছিলো?"
"আজ্ঞে।"
"বাবু। মনে আছে আপনার কবে ঘটনাটা ঘটেছিলো?"
"তা বছর দড়েক তো হবেই।"
"আচ্ছা, এবার আসল কথায় আসি। আপনার বাড়ি থেকে সেদিন ডাকাতরা যেসব জিনিসপত্র নিয়ে গিয়েছিলো তাতে একটা কাঁসার বাটি পাওয়া গেছে। বাটিটা দেখলে আপনি কি চিনতে পারবেন?"
"জে আজ্ঞে। খুব চিনতে পারাম। এইরম বড়ো বাডি ত হুজুর খুব একডা পাওয়া যায়না।"
কোর্ট বাটিটা তার সামনে উপস্থাপন করে। দয়াল চিৎকার বলে উঠেন, "এইডাই, এইডাই আমার বাডি।
আসামী পক্ষের উকিল মিয়া মোহাম্মদ তাকে জেরা করেন। এক পর্যায়ে জিজ্ঞেস করেন, "এই বাটিই যে আপনার, তার কি প্রমান আছে?"
দয়াল চন্দ্র দাস দৃঢ়তার সঙ্গে এর উত্তর দেন, "আছে হুজুর। আছে। আমার ছেলের নাম কার্তিক চন্দ্র দাস।
বাডির তলায় অর নাম কার্তিক
আর জম্মের তারিক লেখা আছে। পরখ কইরা দেহেন। না অইলে ওডা আমার না।"
যাচাই করে দেখা হলো। জজ সাহেব দয়ালের কথার সত্যতা খুঁজে পেলেন।
জুমন আলী একবার শাহনালীর দিকে তাকালো। শাহন মাথা নত করে আঁড়চোখে একবার সেদিকে তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নেয়। জুমন বলে উঠে,"শাহন,তা হইলে আমারে বিপদে ফালবার জইন্য তুই তর বইনেরে এই বাডি দিছিলি। আল্লাহ তরে হেদায়াত দান করুক।" দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে জুমন। আজকের কোর্টের কাজের সমাপ্তি ঘোষণা করে এজলাস ছেড়ে ভেতরে যাওয়ার জন্য জজ সাহেব উঠে দাঁড়ালেন।
2026 © Amar Dorpon. All Rights Reserved