

কাজল মালেক
২৬তম পর্ব
গ্যাং কেইসের ২০ জন আসামীর সকলেই গাজীপুর ও পার্শ্ববর্তী গ্রামের গণ্যমান্য ব্যক্তি। এছাড়াও এই কেইসে আরও অজ্ঞাত ৪০জনকে আসামী করা হয়েছে। একটা এলাকার অধিকাংশ মানুষ বিশেষ করে এমন বিত্তবান এবং সম্মানিত ব্যক্তি যারা সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় কাজে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন তারাই চুরি,রাহাজানি, ডাকাতিসহ নানা অপকর্মের পৃষ্ঠপোষক তাও আবার আদালত কর্তৃক প্রমাণিত। এ যে কল্পকাহিনীকেও হার মানায়। যারা ধরা পড়েছেন তারা নিজেদের নির্দোষ দাবী করেছেন। যাদের পুলিশ ধরতে পারেনি তারা আত্মগোপনে চলে গেছেন। বাদী পক্ষের কয়েকটি প্রভাবশালী পরিবার ছাড়া প্রায় পুরো গ্রামের পুরুষেরা গ্রাম ছাড়া, পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। পুলিশ যাদের আটক করেছিলো তাদের মধ্যে নয়া পাড়ার ইয়াকুব আলী, নিজমাওনার ওমর ফরাজী, আদম মৈশাল, পশ্চিম গাজীপুরের মনসুর মাদবর, আদম আলী, পূর্ব গাজীপুরের আলীমুদ্দী, আশ্রবালী,ইমাম উদ্দীন, নেয়ামত খাঁ ও জহিরুদ্দিন এরা জামিন পেয়ে বেরিয়ে এসেছেন। জামিন পায়নি জুমন আলী প্রধান। বরং তার বিরুদ্ধে রাজস্বাক্ষীর অভিযোগ ও বক্তব্য সত্য বলে প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছে। ডাকাতির মালামাল পাওয়া গেছে তার বাড়িতে। আজ আবার মামলার তারিখ পড়েছে। আজ রায় হবে। এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে জুমন আলী প্রধানের ফাঁসি হবে। না হলে যাবজ্জীবন কারাবাস হবে একথা নিশ্চিত। আজ কোর্ট এলাকা লোকে লোকারণ্য। পুলিশ বল প্রয়োগে তাদের রাজবাড়ীর বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছে। ভাওয়ালের রাজবাড়ী এখন মহকুমা অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এখানেই নিম্ন আদালতে গাজীপুর গ্যাং কেইসের বিচার কার্য চলছে। এই কেইসের বাদী স্বয়ং রাষ্ট্র। আসামীকে আদালতে আনা হয়েছে।
বাদী বিবাদীর আইনজীবী, পরামর্শকেরা উপস্থিত হয়েছেন। জুমন প্রধানের ফাঁসির আদেশ শোনার জন্য মানুষ উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করছে। তার সাথে আর যারা অভিযুক্ত তারা যতো ক্ষমতাবান আর টাকাওয়ালা হোক, আইন তাদের ছাড়বেনা। তাদেরও যাবজ্জীবন কিংবা ১২ বছরের জেল হয়ে যাবে। এতসব ভাবনায় একটা পক্ষ আনন্দের স্বপ্নে বিভোর। প্রধানের শাস্তি হলে তাদের সাম্রাজ্যে কেউ আর মাতব্বরি বা খবরদারী করতে আসবেনা। তাদের মতে জুমন প্রধান উড়ে এসে জুড়ে বসেছিলো। তারপর আবার আক্কুর সাথে পাঞ্জা লড়তে যায়। আক্কু ডাকাত অবশ্য জনসমক্ষে খুব একটা বের হয়না। ভয় আছে তার, কখন আবার পুলিশের চোখে পড়ে। ছয়-সাতটা কেস রয়েছে তার বিরুদ্ধে। দাগী ফেরারী আসামী। জুৃমন আলী প্রধান চোর ডাকাতদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলো। তাদেরকে প্রতিরোধ করার জন্য এলাকার কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ও সাধারণ মানুষ নিয়ে সমিতি গড়ে তুলেছিলো। ডাকাতদের উপর নজরদারি করে পুলিশের কাছে ধরিয়ে দেবার শপথ ছিলো তাদের। তাদের নেতা জুমন আলী প্রধান। কথাগুলো মনে পড়লে আক্কুর গায়ে আগুন ধরে যায়। মনে মনে বলে, "সেদিনের বৈরাগী আইজ ভাতেরে কয় অন্ন। এখন মজা বুঝুক।" দাঁত কিড়মিড় করে আক্কাছ। কল্পনায় দেখে ফাঁসির দড়িতে ঝুলছে জুমন।
ক'দিন আগে শাহনের বড় ছেলে কাশু অলি প্রধানের কাছে এসেছিলো। তাদের বাড়িতে অভাব। চোখে পানি নিয়ে অল্প বয়সের ছেলেটি জানালো অনাহারে দিন কাটাচ্ছে তাদের পুরো পরিবার। দুঃসময়ে কেউ পাশে দাঁড়ায়নি। এই দুঃসময়ের কবলে যারা তাদের ঠেলে দিয়েছে আজ তারা সরে পড়েছে। তার মা ছোট প্রধানবাড়িতে কাজ করতো। শাহন জুমনের প্রধানের বিশ্বস্ত লোক ছিলো। ওই বাড়িতে ছিলো তার অবাধ যাতায়াত।
তহরজানেরও ভক্ত সে। দিন কাটাতো ওখানেই। তাদের কোন অভাব ছিলো না। শাহনের সঙ্গে ছোট প্রধানের ভালো সম্পর্কে কে কাজে লাগিয়ে তাকে দিয়ে জুমনকে শায়েস্তা করবে তার অগ্রজ আক্কাছ ডাকাত। জবান সরকারের বাড়িতে সেদিনের মারের কথা ভুলতে পারেনি সে। জুমনের শক্ত হাতের চাপ এখনো অনুভব করে তার গলায়। দম আটকে যাবার যন্ত্রণা তাকে প্রতিশোধের নেশায় পাগলা কুকুরের মতো হিংস্র করে তুলে। শাহন পুলিশের কাছে জুমন প্রধানকে চুরি ডাকাতদের প্রধান বলে দাবী করায় খোয়াইজ্জার মা আর ছোট প্রধানবাড়িতে যেতে সাহস করেনা। সে শাহনের স্ত্রী, তাদের বড় ছেলে খুব ছোট থাকতে মারা যায়। ছেলের নামে তাকে খোয়াইজ্জার মা বলে ডাকে। কাশু তাদের দ্বিতীয় ছেলে। ভালো নাম কাশেম। কাশুর বড় জ্যেঠা আক্কুর শেখানো মতো শাহন জুমন আলী প্রধানকে ডাকাতের সর্দার বলেছে। আসলে সে নিজেই বড় ডাকাত,পালের গোদা। সে নিশ্চয়তা দিয়েছিলো শাহনের বিপদ হলে তার অবর্তমানে তাদের সংসারের দায়িত্ব নিবে। এখন তারা উপোষ করে মরছে,একবার এসে খোঁজ খবরটিও নেয়না, কোন সাহায্য তো করেইনা। এখন শাহনের পরিবার বড় অসহায়। নির্দোষ জুমনকে শুধু শুধু ফাঁসনোর জন্য অনেকেই তাকে দোষারোপ করে। কারো কাছে সাহায্য চাইতে গেলে এসব বলে দুকথা শুনিয়ে দেয়। আক্কুর কাছে কয়েকটা টাকা কর্জ চাইতে গিয়েছিলো, তাকে ফিরিয়ে দিয়েছে। উল্টো গালি দিয়ে বলেছে, "বাপটা যেরুম নিষ্কর্মা আছিলো তার পুতও অইছে হেইরম। ভিক্ষা চাইতে আইয়ো ক্যান, কামকাইজ করতে পারোনা?" এই কথা শুনে কাশুর মা আলতাভানু ওরফে খৌয়াইজ্জার মা তার ছেলেকে অলিপ্রধানের কাছে পাঠিয়েছে। বলে দিয়েছে, " তর পরধানী জেডারে আসল কতাখান কইয়া আয়। আংগরে কিন্তুক আক্কু ডেহাইত বিপদে ফালাইছে। আমার ভাওর অইলে কি অইবো, হে তো ডাহাইত দলের থাইপদার (পৃষ্ঠপোষক) মিচমিইচ্চা শয়তান।
আমরা পাপের ভাগীদার অইতাম চাইনা।
কাশু মায়ের শেখানো কথা বড় প্রধান জানায়। অলি প্রধান নিজেও বিশ্বাস করতেন গ্যাং কেইস কাহিনী একটা ভয়ানক ষড়যন্ত্রের ফসল। কিন্তু সব জেনেও সত্য প্রকাশের কোন সুযোগ নেই। কেউ এখন আর তার কথা বিশ্বাস করবেনা। অলি ভেবে পাননা কাঁসার থালাটা এলো কোত্থেকে। আর এটা ডাকাতির মাল পুলিশ এটাও কি করে জানতে পারলো। কাশুকে চাল কেনার জন্য একটা টাকা দিলেন। আর বললেন, "তুমি আমার সাতে লও। কোর্টে তোমার বাপরে আক্কুর কতাগুলান বলবা। কও তো হুনি 'জুমনের লগে থাকলে আইজ তোঙ্গর এই অবস্থা হইতো?" শাহন আগে থেকেই তার সংসারের দুরবস্থার কথা জানতে পেরেছিলো। সে নিজে চুরিডাকাতিতে লিপ্ত ছিলোনা। ভালো মানুষ হয়ে বাঁচতে চেয়েছিলো। সম্পর্কীয় বোনজামাই জুমনকে তার সত্যবাদিতা,সৎ সাহস আর কর্মদক্ষতার জন্য ভালো লাগতো। দিনে দিনে তার বিশ্বস্তও হয়ে উঠেছিলো। অথচ তাকে ষড়যন্ত্রের জালে আটকে দিলো সে নিজে। তার কোন দোষ ছিলোনা, শাহনের মর্মপীড়া শুরু হয়। বিনা দোষে জুমন শাস্তি পাবে। কিন্তু যা হবার তা হয়ে গেছে। শাহনের জবানবন্দী, সাক্ষ্যগ্রহন শেষ। তার কথা কেউ শুনবেনা আর। কোন কথা বলার সুযোগও নেই। দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে শাহন। মনে মনে বলে এখন এসব ভেবে আর লাভ কি?
আজ গ্যাং কেইসের রায় হবে।
অনেকের মতো শাহনও বিশ্বাস কর তারব মিথ্যা বয়ানে জুমনের ফাঁসি হবে। কিন্তু শাহন কি জেল থেকে ছাড়া পাবে? নিজেকে বারবার প্রশ্নটা করে সে। ডাকাতদের কৌশল, গোপন সত্য তার কাছে জমা সেটি যাতে কোনদিন প্রকাশ না পায় তার জন্য হয়তো তাকে চরম মূল্য দিতে হবে। জেল থেকে ছাড়াও যদি পায় মৃত্যু ঘুরবে তার পিছু পিছু। একদিন লোকে শুনবে পাক্কিরচালার জঙ্গলের পাশে খালের মধ্যে শাহন ডাকুর লাশ পড়ে আছে। তার হাতপা বাঁধা, দেহে অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন।
এটাই হয়তো তার নিয়তি, কপালের লিখন। এমনি করেই সকল পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে তাকে।
উকিল ব্যারিস্টারে জনাকীর্ণ আদালত। কাঁধে ক্যামেরা ঝুলানো সাংবাদিকগন উৎসুক। মাথা নিচু করে বসে আছেন মিয়া মোহাম্মদ, আসামী পক্ষের উকিল। তিনি নিজেও জানেন মামলায় হেরে গেছেন। প্রতিপক্ষের অকাট্য যুক্তি, প্রমানিত ডকুমেন্ট, পরিস্থিতি পরিবেশ কোনটাই আসামীর অনুকূলে যায়নি। কতো কঠিন রায় হবে সেটাই ভাববার বিষয়। মৃত্যুদন্ড হয়ে যেতে পারে, কারণ ইতোমধ্যে সংঘটিত কয়েকটা ডাকাতিতে খুনখারাপির মতো ঘটনা ঘটছিলো। সেখানে কথিত বন্দুক ব্যবহৃত হয়েছে বলে ধারণা করা যয়। শুধু তাই যারা করেছে তারাই অকপটে স্বীকার করছে।
প্রাজ্ঞ জজ সাহেব এজলাসে উঠলেন। আজ তেমন কোন শুনানি হবেনা। আসামীকে শেষবারের মতো তার স্বীকার করতে বলা হবে। স্বীকার না করলে বিচারক তার কথা শুনতেও পারেন,আবার নাও শুনতে পারেন। স্পন্দনহীন নিস্তব্ধতার মাঝে বিচারক চারদিকে তাকালেন। একপাশে রাজস্বাক্ষী শাহন। বিমর্ষ, মলিন,অবনত তার দৃষ্টি। তারপাশে রাষ্ট্রপক্ষের উৎফুল্ল উকিল আহম্মদ আলীন ও তার সহকারীগন। আরেক পাশে আসামী জুমন আলী প্রধান। সকলের দৃষ্টি তার দিকে। জজের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে। গুরুগম্ভীর কন্ঠে বিচারক তার কাছে জানে চাইলেন, বললেন, "চূড়ান্ত পর্যায়ে সকল দিক বিবেচনা করে আদালত আপনাকে দোষী সাব্যস্ত করেছে। এই বিষয়ে আপনার কি কিছু বলার আছে?"
জুমন হাত তুলে কি বলতে চাইলো। তার উকিল মিয়া মোহাম্মদ বললেন, "ইয়োর অনার স্যার,আপনার অনুমতি হলে আসামী কিছু বলতে চায়।"
অর্ডার অর্ডার বলে তিনি হাতের হাতুড়ি দিয়ে টেবিলে আঘাত করলেন। অনুমতি দেয়া হলো। জুমন বললো, "হুজুর আমি আদালতের নিয়ম জানিনা। আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ সব সত্য পাইছেন। তার জইন্য আমার কোন দুঃখু নাই। আইজ আমার পক্ষে কেউ নাই। কিন্তুক আমার আল্লাহ আমার সাতে আছেন। আমার নালিশ তার কাছে। আমি রাজসাক্ষী শাহনকে কয়টা কতা জিগাইবার চাই। তারপর আপনে আমারে যে শাস্তি দিবাইন আমি মাইন্না নিবাম।"
2026 © Amar Dorpon. All Rights Reserved