

লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল
বাংলাদেশ উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় এগিয়ে চলছে। অর্থনীতি, যোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি, শিক্ষা ও অবকাঠামো উন্নয়নে দেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু এই অগ্রযাত্রার পাশাপাশি সমাজে নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, পারিবারিক বন্ধনের শিথিলতা, মাদকাসক্তি, কিশোর অপরাধ, সহিংসতা, অসহিষ্ণুতা, সাইবার অপরাধ, অশ্লীলতা, আত্মকেন্দ্রিকতা এবং সামাজিক দায়িত্ববোধের সংকট উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে যদি সাংস্কৃতিক ও নৈতিক উন্নয়ন সমান গুরুত্ব না পায়, তবে সেই উন্নয়নের ভিত দুর্বল হয়ে পড়বে। এ বাস্তবতায় সামাজিক অবক্ষয়রোধে নান্দনিক দেশীয় সংস্কৃতির বিকাশ শুধু একটি সাংস্কৃতিক কর্মসূচি নয়, এটি একটি জাতীয় প্রয়োজন।
সংস্কৃতি একটি জাতির আত্মপরিচয়। ভাষা, সাহিত্য, সংগীত, নাটক, লোকসংস্কৃতি, চারুকলা, উৎসব, ইতিহাস, ঐতিহ্য, আচার-অনুষ্ঠান এবং জীবনদর্শনের সম্মিলিত প্রকাশই সংস্কৃতি। একটি জাতির সংস্কৃতি যত সমৃদ্ধ হয়, সেই জাতির আত্মপরিচয়ও তত সুদৃঢ় হয়। সংস্কৃতি মানুষকে কেবল বিনোদন দেয় না, এটি তাকে নৈতিকতা, মানবিকতা, সহনশীলতা, সৌন্দর্যবোধ এবং সামাজিক দায়িত্ববোধের শিক্ষা দেয়। তাই সংস্কৃতিকে দুর্বল করে কোনো জাতি দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে না।
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হাজার বছরের। বাউল, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, জারি-সারি, কবিগান, পালাগান, পহেলা বৈশাখ, নবান্ন, লোকজ মেলা, নকশিকাঁথা, মৃৎশিল্প, জামদানি, গ্রামীণ ঐতিহ্য, বাংলা সাহিত্য এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আমাদের জাতীয় সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। এই সংস্কৃতির মূল দর্শন হলো মানবতা, সম্প্রীতি, সহাবস্থান, উদারতা এবং সৌন্দর্যচেতনা। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বিশ্বায়নের প্রভাবে এবং অন্ধ অনুকরণের প্রবণতায় সমাজের একটি অংশ নিজস্ব সংস্কৃতির পরিবর্তে ভোগবাদী ও কৃত্রিম জীবনধারার প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। এতে আত্মপরিচয়ের সংকট তৈরি হচ্ছে, যা সামাজিক অবক্ষয়ের অন্যতম কারণ।
বর্তমান ডিজিটাল যুগে প্রযুক্তি যেমন জ্ঞান অর্জনের সুযোগ বাড়িয়েছে, তেমনি অপসংস্কৃতি বিস্তারের পথও সহজ করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অশালীনতা, সহিংসতা, অসত্য তথ্য, গুজব, কৃত্রিম জনপ্রিয়তার প্রতিযোগিতা এবং অস্বাস্থ্যকর বিনোদনের বিস্তার তরুণ সমাজের মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অনেক ক্ষেত্রে বাস্তব জীবন, পারিবারিক সম্পর্ক এবং সামাজিক মূল্যবোধের পরিবর্তে ভার্চুয়াল পরিচিতিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ফলে সহমর্মিতা, ধৈর্য, শিষ্টাচার ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। তাই প্রযুক্তিকে প্রতিপক্ষ হিসেবে নয়, বরং দেশীয় সংস্কৃতি, সাহিত্য, ইতিহাস ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ড প্রচারের কার্যকর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।
সামাজিক অবক্ষয় প্রতিরোধের প্রথম ভিত্তি পরিবার। একটি শিশুর চরিত্র, নৈতিকতা, ভাষা ও সংস্কৃতিবোধের সূচনা পরিবার থেকেই হয়। কিন্তু আজ ব্যস্ত জীবন, যৌথ পরিবারের বিলুপ্তি এবং প্রযুক্তিনির্ভর যোগাযোগের কারণে পারিবারিক বন্ধন আগের তুলনায় দুর্বল হয়েছে। শিশুদের সঙ্গে গল্প করা, বই পড়া, দেশীয় গান শোনানো, জাতীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে আলোচনা করার পরিবেশ কমে যাচ্ছে। অভিভাবকদের মনে রাখতে হবে, সন্তানের কাছে সবচেয়ে বড় শিক্ষা আসে পরিবারের আচরণ থেকে। তাই পরিবারেই দেশীয় সংস্কৃতির চর্চা, শিষ্টাচার, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের ভিত্তি শক্তিশালী করতে হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও কেবল পরীক্ষার ফল অর্জনের স্থান নয়, এটি আদর্শ নাগরিক তৈরির প্রতিষ্ঠান। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় সৃজনশীল ও সাংস্কৃতিক চর্চার পরিসর আরও বাড়ানো জরুরি। নিয়মিত সাহিত্যচর্চা, বিতর্ক, আবৃত্তি, নাটক, সংগীত, চিত্রাঙ্কন, বিজ্ঞানচর্চা এবং লোকসংস্কৃতিভিত্তিক কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিত্ব বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একজন শিক্ষার্থী যখন শিল্প ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন তার মধ্যে নেতৃত্ব, সহমর্মিতা, আত্মবিশ্বাস এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ তৈরি হয়। গবেষণায়ও দেখা গেছে, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত তরুণরা অপরাধ, মাদকাসক্তি ও সহিংসতা থেকে তুলনামূলকভাবে দূরে থাকে।
গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আজ জনমত গঠনের শক্তিশালী মাধ্যম। তাই সংবাদমাধ্যম, টেলিভিশন, চলচ্চিত্র, বেতার এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মের দায়িত্ব শুধু বিনোদন দেওয়া নয়, সমাজকে ইতিবাচক পথে পরিচালিত করাও। দেশীয় ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, সাহিত্য, লোকসংগীত, নাটক, বিজ্ঞানমনস্কতা এবং মানবিক মূল্যবোধভিত্তিক অনুষ্ঠান সম্প্রচারের পরিমাণ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে নিম্নমানের, অশালীন ও সহিংস বিষয়বস্তুর বিরুদ্ধে কার্যকর নীতিমালা প্রয়োগ জরুরি।
রাষ্ট্রেরও সুদূরপ্রসারী সাংস্কৃতিক নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় সাংস্কৃতিক কেন্দ্র সক্রিয় করা, গ্রামীণ শিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের পৃষ্ঠপোষকতা, লোকসংস্কৃতি সংরক্ষণ, গ্রন্থাগার আধুনিকায়ন, বইপাঠ আন্দোলন এবং তরুণদের জন্য সাংস্কৃতিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে উন্নয়ন পরিকল্পনার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। কারণ সংস্কৃতিতে বিনিয়োগ মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চরিত্র ও মূল্যবোধে বিনিয়োগ।
সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকেও আরও সক্রিয় হতে হবে। মাদকবিরোধী আন্দোলন, সড়ক নিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ, বইপাঠ আন্দোলন, সাংস্কৃতিক উৎসব, লোকজ ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার বিভিন্ন উদ্যোগ সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। স্থানীয় পর্যায়ে সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, নাট্যোৎসব, লোকসংগীত উৎসব এবং শিশু-কিশোরদের জন্য সৃজনশীল কার্যক্রমের বিস্তার সামাজিক অবক্ষয় প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
দেশীয় সংস্কৃতির বিকাশের সঙ্গে অর্থনৈতিক উন্নয়নেরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। জামদানি, নকশিকাঁথা, মৃৎশিল্প, বাঁশ-বেতের কারুশিল্প, লোকবাদ্য, চলচ্চিত্র, প্রকাশনা শিল্প এবং সাংস্কৃতিক পর্যটন দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। সৃজনশীল অর্থনীতি বিশ্বব্যাপী দ্রুত বিকাশমান একটি খাত। বাংলাদেশও তার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তর করার সুযোগ কাজে লাগাতে পারে। এতে যেমন কর্মসংস্থান বাড়বে, তেমনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তিও শক্তিশালী হবে।
আমাদের ব্যক্তিগত দায়িত্বও কম নয়। বাংলা ভাষার শুদ্ধ ব্যবহার, নিয়মিত বই পড়া, দেশীয় সাহিত্য ও সংগীতকে ভালোবাসা, সন্তানদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা, জাতীয় দিবস ও ঐতিহ্যবাহী উৎসবে অংশগ্রহণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইতিবাচক বিষয়বস্তু প্রচার এবং অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা প্রত্যেক সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব। ছোট ছোট ব্যক্তিগত উদ্যোগই বৃহত্তর সামাজিক পরিবর্তনের ভিত্তি রচনা করতে পারে।
বাংলাদেশের উন্নয়নকে যদি সত্যিকার অর্থে টেকসই, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে হয়, তবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি সাংস্কৃতিক জাগরণকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ উন্নত সড়ক, সেতু, ভবন কিংবা প্রযুক্তি একটি দেশের বাহ্যিক উন্নয়নের প্রতীক হতে পারে, কিন্তু একটি জাতির প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে তার নৈতিকতা, মানবিকতা, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধে। সামাজিক অবক্ষয় কোনো একদিনে সৃষ্টি হয়নি, তাই এর সমাধানও রাতারাতি সম্ভব নয়। তবে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্র, গণমাধ্যম, সামাজিক সংগঠন এবং নাগরিক সমাজ যদি সমন্বিতভাবে নান্দনিক দেশীয় সংস্কৃতির বিকাশে এগিয়ে আসে, তবে একটি মানবিক, সৃজনশীল, নৈতিক ও সম্প্রীতিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ে তোলা অবশ্যই সম্ভব। সময়ের দাবি, উন্নয়নের প্রতিটি ধাপে সংস্কৃতিকে অগ্রাধিকার দিয়ে এমন একটি সমাজ নির্মাণ করা, যেখানে মানুষ শুধু অর্থনৈতিকভাবে নয়, নৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবেও সমৃদ্ধ হবে।
অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি একটি জাতির নৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তি শক্তিশালী না হলে সেই উন্নয়ন টেকসই হয় না। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্র, গণমাধ্যম, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং নাগরিক সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগেই মানবিক মূল্যবোধ, সৌন্দর্যবোধ ও সামাজিক দায়িত্বসম্পন্ন নতুন প্রজন্ম গড়ে তোলা সম্ভব। দেশীয় ঐতিহ্য, ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ধারাকে শক্তিশালী করেই একটি নৈতিক, সহিষ্ণু, সম্প্রীতিপূর্ণ মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। তাই সামাজিক অবক্ষয়রোধে নান্দনিক দেশীয় সংস্কৃতির বিকাশে প্রয়োজন সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা ।
লেখক পরিচিতি:
লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল
(শিক্ষক, কবি, কলাম লেখক, সমাজসেবক ও সংগঠক)
2026 © Amar Dorpon. All Rights Reserved