
মো: জনি হাসান, গাজীপুর
গাজীপুর শিল্পাঞ্চল ও জনবহুল জেলা হওয়ায় এখানে সংক্রামক ব্যাধির ঝুঁকি সব সময়ই বেশি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে জেলায় হামের (Measles) সংক্রমণ ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। প্রতিদিন শত শত শিশু জ্বর, কাশি এবং শরীরে লালচে ফুসকুড়ি নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। পরিস্থিতির ভয়াবহতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তিল ধারণের ঠাঁই নেই হাসপাতালগুলোতে। বিশেষ করে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা আইসিইউ (ICU) সংকটের কারণে গুরুতর অসুস্থ শিশুদের জীবন এখন সংকটাপন্ন, যা অভিভাবকদের মধ্যে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগে সরজমিনে গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। হাসপাতালের বারান্দা থেকে শুরু করে সিঁড়ির কোণ—সবখানেই অসুস্থ শিশুদের নিয়ে অপেক্ষমাণ মা-বাবার ভিড়। ওয়ার্ডের ভেতরে প্রতিটি বেডে ৩/৪ করে শিশুকে রাখা হয়েছে।
অভিভাবকদের চোখেমুখে ক্লান্তি আর উদ্বেগের ছাপ। শ্রীপুর থেকে আসা এক মা জানান, তার চার বছরের সন্তানের তীব্র জ্বর আর শ্বাসকষ্ট। তিন দিন ধরে হাসপাতালে থাকলেও একটি বেড পাননি তিনি। মেঝেতে শুয়েই চলছে স্যালাইন আর চিকিৎসা। তার ওপর আইসোলেশন ব্যবস্থা পর্যাপ্ত না হওয়ায় সুস্থ শিশুরাও নতুন করে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
হামের সংক্রমণ যখন ফুসফুস বা মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়ে, তখন শিশুর জন্য আইসিইউ বা ভেন্টিলেশন অপরিহার্য হয়ে পড়ে। কিন্তু শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিশুদের জন্য ডেডিকেটেড আইসিইউ সুবিধার অপ্রতুলতা এখন সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন অনেক শিশুকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানোর পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা। কিন্তু যানজট আর ব্যয়বহুল বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সের খরচ জোগাতে না পেরে অনেক অভিভাবক ভাগ্যর ওপর ভরসা করে গাজীপুরেই পড়ে আছেন।
হাসপাতালের পরিচালক ডা. আমিনুল ইসলাম বর্তমান পরিস্থিতির কথা বলেন, “আমাদের এখানে রোগীর চাপ ধারণক্ষমতার কয়েক গুণ বেশি। আইসিইউ সংকট একটি বড় সমস্যা। তবে আমরা হাত গুটিয়ে বসে নেই। আইসিডিডিআরবি (icddr,b) উদ্ভাবিত বিশেষ কিছু চিকিৎসাপদ্ধতি ও যন্ত্র ব্যবহার করে আমরা গুরুতর অসুস্থ শিশুদের প্রাণ বাঁচানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। বিকল্প উপায়ে অক্সিজেন সাপোর্ট ও জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
হাম অত্যন্ত সংক্রামক হওয়ায় আক্রান্ত শিশুকে আলাদা বা আইসোলেশনে রাখা জরুরি। হাসপাতালে বর্তমানে তিনটি কক্ষকে আইসোলেশন হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু রোগীর সংখ্যা এতই বেশি যে, এই তিনটি কক্ষে গাদাগাদি করে শিশুদের রাখতে হচ্ছে। একই বিছানায় একাধিক ভিন্ন ভিন্ন মাত্রার আক্রান্ত শিশু থাকায় সংক্রমণ পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে। চিকিৎসকরা বলছেন, একটি শিশু সুস্থ হওয়ার পথে থাকলেও পাশে থাকা নতুন আক্রান্ত শিশুর সংস্পর্শে তার জটিলতা আবার বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম একটি ভাইরাসজনিত রোগ যা মূলত বায়ুর মাধ্যমে ছড়ায়। গাজীপুরের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা এবং বস্তি অঞ্চলগুলোতে টিকাদান কর্মসূচির আওতা বাড়ালেও অনেক শিশু নিয়মিত ডোজ থেকে বাদ পড়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে ভাসমান শ্রমিক পরিবারের শিশুদের মধ্যে টিকার অভাব বেশি দেখা যায়। এছাড়া ঋতু পরিবর্তনের এই সময়ে ভাইরাসের সক্রিয়তা বেড়ে যাওয়াও একটি বড় কারণ।
জেলা সিভিল সার্জন ডা. মামুনুর রশীদ বলেন, “হাম প্রতিরোধে সরকার টিকাদান কার্যক্রমকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। গাজীপুরে আমাদের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি (EPI) অব্যাহত রয়েছে। তবে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, অভিভাবকরা অসচেতনতার কারণে দ্বিতীয় ডোজ বা বুস্টার ডোজ দিতে দেরি করেন। ফলে শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয় না। আমরা মাঠ পর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের নির্দেশ দিয়েছি যাতে প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় টিকাদান নিশ্চিত করা হয়।”
চিকিৎসকরা বলছেন, হামের লক্ষণ দেখা দিলে আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। সাধারণত জ্বর আসার ৩-৪ দিন পর শরীরে লালচে দানা দেখা দেয়। এর সঙ্গে সর্দি, কাশি ও চোখ লাল হওয়া লক্ষণ হিসেবে দেখা দিতে পারে।
শিশুকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম দিতে হবে এবং প্রচুর পরিমাণে তরল খাবার ও পানি খাওয়াতে হবে। ভিটামিন-এ ক্যাপসুল হামের জটিলতা কমাতে অত্যন্ত কার্যকর। আক্রান্ত শিশুকে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শে এই ক্যাপসুল খাওয়াতে হবে। যদি শিশুর শ্বাসকষ্ট হয়, নেতিয়ে পড়ে বা খিঁচুনি দেখা দেয়, তবে এক মুহূর্ত দেরি না করে হাসপাতালে নিতে হবে।আক্রান্ত শিশুকে অন্তত ৭-১০ দিন অন্য শিশুদের থেকে আলাদা রাখতে হবে।
গাজীপুরের এই স্বাস্থ্য সংকট নিরসনে কেবল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয়। জরুরি ভিত্তিতে শিশুদের জন্য আইসিইউ বেড সংখ্যা বাড়ানো এবং বিশেষায়িত সংক্রামক ব্যাধি ইউনিট চালু করা এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনকে সচেতনতা বৃদ্ধিতে এগিয়ে আসতে হবে। হাম একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ; সঠিক সময়ে টিকা এবং পর্যাপ্ত চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে একটি শিশুর প্রাণও অকালে ঝরে পড়বে না। অভিভাবকদের আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
2026 © Amar Dorpon. All Rights Reserved