
মোঃ কামাল হোসেন, বিশেষ প্রতিনিধি
যশোর, অভয়নগর: যশোরের অভয়নগর উপজেলা, যা ৮টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত। শিল্প ও বাণিজ্য সমৃদ্ধ এই জনপদে কয়েক লাখ মানুষের বসবাস। কিন্তু এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হওয়া তো দূরের কথা, উল্টো স্বাস্থ্যসেবার নামে এখানে গড়ে উঠেছে এক ভয়ংকর প্রতারণার সাম্রাজ্য। চিকিৎসার নামে সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে নির্মম ছিনিমিনি খেলছে একদল ভুয়া নামধারী ডাক্তার। প্রশাসনের নজরদারির অভাব, আইনের ফাঁকফোকর এবং স্থানীয় কিছু অসাধু প্রভাবশালী চক্রের ছত্রছায়ায় এই অনিয়ম এখন মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। অভয়নগরের বিভিন্ন এলাকায় এমন অনেক ব্যক্তি রয়েছেন যারা নিজেদের নামের আগে ‘ডাক্তার’ পদবী ব্যবহার করছেন কোনো স্বীকৃত ডিগ্রি ছাড়াই। তাদের অনেকেরই যোগ্যতা বলতে শুধু এটুকুই যে—তাদের পিতা বা পরিবারের অন্য কোনো সদস্য কোনোকালে গ্রাম্য চিকিৎসক ছিলেন। সেই পরিচয়কে পুঁজি করেই তারা চেম্বার খুলে বসেছেন। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) এর কোনো রেজিস্ট্রেশন তো নেই-ই, এমনকি অনেকের ন্যূনতম একাডেমিক শিক্ষাও প্রশ্নবিদ্ধ। তবুও তারা দাপটের সঙ্গে ব্যবস্থাপত্র দিচ্ছেন, এমনকি জটিল রোগের চিকিৎসাও করছেন। চিকিৎসাকে তারা সেবার বদলে স্রেফ একটি উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত ব্যবসায়িক পন্যে পরিণত করেছেন।
অভয়নগরের প্রাণকেন্দ্র নওয়াপাড়া। এখানকার ক্লিনিকপাড়া এলাকায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যাঙের ছাতার মতো অসংখ্য বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার গড়ে উঠেছে। বাহ্যিক চাকচিক্য আর আধুনিক যন্ত্রপাতির বিজ্ঞাপন দিয়ে এসব প্রতিষ্ঠান রোগীদের আকৃষ্ট করে। কিন্তু ভেতরের চিত্র অত্যন্ত ভয়াবহ। এসব ক্লিনিকে তথাকথিত ‘শিশু বিশেষজ্ঞ’ পরিচয়ে একাধিক ভুয়া চিকিৎসক নিয়মিত রোগী দেখছেন। অনুসন্ধানে দেখা যায়, এদের অধিকাংশেরই পেডিয়াট্রিকস (শিশু চিকিৎসা) সংক্রান্ত কোনো স্বীকৃত ডিপ্লোমা বা উচ্চতর প্রশিক্ষণ নেই।
সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয় হলো সিজারিয়ান অপারেশন। অদক্ষ ও ভুয়া চিকিৎসকদের মাধ্যমে এসব অপারেশন করানোর ফলে প্রায়ই নবজাতকের মৃত্যু কিংবা প্রসূতি মায়ের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরির অভিযোগ পাওয়া যায়। নওয়াপাড়ার অনেক ক্লিনিকেই অপারেশন থিয়েটারের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম বা মানসম্মত পরিবেশ নেই। ভুল চিকিৎসার কারণে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে প্রভাবশালী চক্রের হস্তক্ষেপে তা দ্রুত ধামাচাপা দেওয়া হয়। ভুক্তভোগী পরিবারগুলো দরিদ্র ও অসহায় হওয়ায় ন্যায়বিচারের আশা ছেড়ে দিয়ে মুখ বুজে সব সহ্য করতে বাধ্য হয়।
তদন্তে আরও একটি আশঙ্কাজনক দিক উন্মোচিত হয়েছে। কিছু অসাধু ব্যক্তি নিজেদের অপকর্ম ও ভুয়া চিকিৎসা কর্মকাণ্ড আড়াল করতে ‘সাংবাদিক’ পরিচয় ব্যবহার করছেন। তারা মোটরসাইকেলে বা চেম্বারে প্রেস স্টিকার লাগিয়ে রাখেন, যাতে প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চাপ এড়ানো যায়। এই ভুয়া পরিচয়ের আড়ালে তারা কেবল নিজেদের অনিয়মকেই বৈধতা দিচ্ছেন না, বরং প্রকৃত ও সৎ সাংবাদিকতাকেও জনসাধারণের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ করছেন। স্থানীয় প্রশাসনও অনেক সময় এই ভুয়া পরিচয়ধারী চক্রের কারণে ব্যবস্থা নিতে দ্বিধাবোধ করে।
প্রতারণার এই জাল কেবল নওয়াপাড়া পৌরসভাতেই সীমাবদ্ধ নয়। উপজেলার শুভরাড়া, সিদ্ধিপাশা, নাওলি, হিদিয়া, চাপাতলা, প্রেমবাগ, মাগুরা এবং সুন্দলীসহ প্রতিটি ইউনিয়নে এই ভুয়া ডাক্তারদের দৌরাত্ম্য সমানভাবে বিস্তৃত। প্রত্যন্ত অঞ্চলের দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষ, যারা যাতায়াত সুবিধার অভাবে শহরে আসতে পারেন না, তারাই এই চক্রের প্রধান শিকার। এসব ইউনিয়নে হাতুড়ে ডাক্তাররা সামান্য সর্দি-জ্বরেও উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক এবং স্টেরয়েড প্রয়োগ করছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে রোগীর কিডনি ও লিভারের মারাত্মক ক্ষতি করছে। এছাড়া অপ্রয়োজনীয় প্যাথলজিক্যাল টেস্টের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের পকেট কাটা হচ্ছে প্রতিদিন।
এ বিষয়ে সচেতন মহলের দাবি, অভয়নগরের প্রতিটি ক্লিনিকে ডাক্তারদের ডিগ্রির সনদ যাচাই করা এখন সময়ের দাবি। শুধু নামমাত্র জরিমানা নয়, বরং লাইসেন্সবিহীন ক্লিনিক সিলগালা এবং ভুয়া ডাক্তারদের কারাদণ্ড নিশ্চিত করতে হবে।
অভয়নগর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আলিমুর রাজিব এই পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্বীকার করে বলেন, “চিকিৎসা পেশা একটি পবিত্র পেশা, এখানে প্রতারণার কোনো স্থান নেই। আমরা ইতিপূর্বেও কিছু তথ্য পেয়েছি। আমি পরিষ্কারভাবে বলতে চাই, জনস্বাস্থ্য নিয়ে যারা ছিনিমিনি খেলবে তাদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। আমরা উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নের সন্দেহভাজন চিকিৎসকদের তালিকা ও তথ্য সংগ্রহ করছি। দ্রুতই জেলা প্রশাসন ও পুলিশের সহায়তায় বড় ধরনের অভিযান পরিচালনা করা হবে। কোনো ভুয়া ডাক্তার বা অবৈধ ক্লিনিক এই জনপদে চলতে দেওয়া হবে না।”
অভয়নগরের এই ‘মরণব্যবসা’ বন্ধ করতে হলে প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপের পাশাপাশি ব্যাপক জনসচেতনতা প্রয়োজন। স্বাস্থ্যসেবা মানুষের মৌলিক অধিকার, আর সেই অধিকার রক্ষায় এখনই সময় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার।
2026 © Amar Dorpon. All Rights Reserved