
কয়রা (খুলনা) প্রতিনিধিঃ
প্রবল জোয়ার আর লোনা পানির সাথে লড়াই করে বেঁচে থাকা খুলনার উপকূলীয় জনপদ কয়রার দুর্গম এলাকার মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ নৌ-বাহিনী। উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের অসহায়, দুঃস্থ ও চিকিৎসা সুবিধা বঞ্চিত মানুষের দোরগোড়ায় মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে এক বিশাল দিনব্যাপী ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প ও বিনামূল্যে ওষুধ বিতরণ কর্মসূচি সম্পন্ন হয়েছে। বাংলাদেশ নৌ-বাহিনীর এই মানবিক উদ্যোগে ওই এলাকার প্রায় ১ হাজার নারী, পুরুষ ও শিশু উন্নত চিকিৎসা সেবা লাভের সুযোগ পেয়েছেন।
বুধবার (১৫ এপ্রিল) সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নের ‘বেদকাশি কলেজিয়েট স্কুল এন্ড কলেজ’ প্রাঙ্গণে এই মেডিকেল ক্যাম্প পরিচালিত হয়। সকাল থেকেই কয়রার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষের ভিড়ে মুখরিত হয়ে ওঠে বিদ্যালয় চত্বর। মূলত উপকূলীয় ও যাতায়াত ব্যবস্থায় দুর্গম এলাকার মানুষের জন্য বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতেই নৌ-বাহিনী এই মহতী উদ্যোগ গ্রহণ করে।
এই মেডিকেল টিমের নেতৃত্ব প্রদান করেন নৌ-বাহিনীর দক্ষ চিকিৎসক সার্জন লেঃ কমান্ডার ডাঃ তিতলী আবেদীন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের এই টিমে আরও সেবা প্রদান করেন সার্জন লেঃ কমান্ডার মোঃ অয়ালিউর রহমান, সার্জন লেঃ রুবাইয়া রহমান এবং সার্জন লেঃ নাজমুল হক। তারা আগত রোগীদের অত্যন্ত ধৈর্য ও আন্তরিকতার সাথে পরীক্ষা করেন এবং রোগের ধরন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপত্র প্রদানের পাশাপাশি তাৎক্ষণিকভাবে উচ্চমানের ওষুধ বিনামূল্যে সরবরাহ করেন।
কয়রা উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশি ও সংলগ্ন এলাকাগুলো ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় এখানকার বাসিন্দাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য জেলা শহরে যাওয়া অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও কষ্টসাধ্য। নৌ-বাহিনীর এই আয়োজন তাদের জন্য আর্শীবাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চিকিৎসা নিতে আসা আশরাফ হোসেন নামের এক ব্যক্তি তার অভিজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, “আমাদের এখানে ভালো ডাক্তার দেখানো অনেক ভাগ্যের ব্যাপার। আজ এখানে নৌ-বাহিনীর চিকিৎসকদের কাছে যে সেবা পেয়েছি, তার মান অনেক উন্নত। আমাদের মতো গরিব মানুষের জন্য এটা অনেক বড় পাওনা।”
দক্ষিণ বেদকাশির বিনাপানি গ্রাম থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে আসা অনিমা মন্ডল তার অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, “দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এসেছিলাম একটু ভালো চিকিৎসার আশায়। নৌ-বাহিনীর চিকিৎসকদের ব্যবহারের মান এবং সুন্দর পরিবেশে চিকিৎসা পেয়ে আমি অত্যন্ত খুশি। তারা খুব মনোযোগ দিয়ে আমাদের কথা শুনেছেন এবং বাড়ি ফেরার জন্য পর্যাপ্ত ওষুধও দিয়েছেন।” একইভাবে সেলিনা আক্তার নামে অন্য এক সেবাগ্রহীতা জানান, চিকিৎসকদের কাছে মন খুলে নিজের শারীরিক সমস্যার কথা বলতে পেরে তিনি মানসিকভাবে অনেক আশ্বস্ত বোধ করছেন।
উপকূলীয় এই জনপদে প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন নিয়মিত ঘটনা, তেমনি স্বাস্থ্যসেবার সংকটও দীর্ঘদিনের। বাংলাদেশ নৌ-বাহিনীর মিডিয়া কর্মকর্তা ফারুক হোসেন সংবাদমাধ্যমকে জানান, বাংলাদেশ নৌ-বাহিনী কেবল দেশের সমুদ্রসীমা রক্ষায় নয়, বরং যেকোনো দুর্যোগ ও প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াতে বদ্ধপরিকর। এর আগেও দেশের বিভিন্ন দুর্গম ও দুর্যোগ কবলিত এলাকায় নৌ-বাহিনী সফলভাবে চিকিৎসা ও মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। তিনি আরও বলেন, “ভবিষ্যতেও উপকূলীয় অসহায় ও অনগ্রসর মানুষের জীবনমান উন্নয়নে এ ধরনের সেবামূলক কার্যক্রম নিয়মিতভাবে অব্যাহত রাখবে বাংলাদেশ নৌ-বাহিনী।”
উপকূলীয় অঞ্চলে যেখানে উন্নত হাসপাতাল বা পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব রয়েছে, সেখানে নৌ-বাহিনীর এই একদিনের ক্যাম্প সাধারণ মানুষের মনে ব্যাপক আশার সঞ্চার করেছে। বিশেষ করে মা ও শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে এবং সাধারণ রোগব্যাধি নিয়ন্ত্রণে এ ধরনের কর্মসূচি দীর্ঘমেয়াদী ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল। স্থানীয় বাসিন্দারা দাবি জানিয়েছেন, যেন বছরে একাধিকবার এ ধরনের বিশেষজ্ঞ মেডিকেল ক্যাম্প আয়োজন করা হয়। চিকিৎসাসেবা শেষে বাড়ি ফেরার পথে অসংখ্য মানুষের মুখে ছিল স্বস্তির হাসি এবং নৌ-বাহিনীর প্রতি অকৃত্রিম কৃতজ্ঞতা। নৌ-বাহিনীর এই কার্যক্রম দেশপ্রেম ও মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে কয়রাবাসীর হৃদয়ে অমলিন হয়ে থাকবে।
2026 © Amar Dorpon. All Rights Reserved