
মোঃ রাকিব হোসেন সৌদি আরব প্রতিনিধি
সাড়ে তিন বছর আগে ছোট ছোট সন্তানের মুখে একটুখানি হাসি ফোটানোর স্বপ্ন নিয়েই বাড়ি ছেড়েছিলেন আজগর ব্যাপারী। ধারদেনা করে, বুকভরা আশা আর চোখভরা স্বপ্ন নিয়ে পাড়ি জমিয়েছিলেন সৌদি আরবে। ভেবেছিলেন—কষ্ট করলেও একদিন সব ঠিক হবে। কিন্তু কে জানত, সেই স্বপ্নই একদিন তাঁর নিথর দেহ হয়ে ফিরে আসার অপেক্ষায় ঝুলে থাকবে!
ঢাকার দোহার উপজেলার রাধানগরের এই মানুষটি এক বছর ধরে অবৈধভাবে কাজ করছিলেন। প্রতিটি দিন ছিল অনিশ্চয়তায় ভরা, তবুও হাল ছাড়েননি-কারণ তাঁর পেছনে ছিল তিনটি নিষ্পাপ মুখ, একটি ভাঙা সংসার, আর এক বৃদ্ধ মায়ের আশ্রয়।
গত ২৪ মার্চ, রিয়াদের হারা শহরের একটি ভবনের ছাদে কাজ করার সময় হঠাৎ পা পিছলে পড়ে যান আজগর। মুহূর্তের মধ্যে সবকিছু যেন থেমে যায়। মাথায় গুরুতর আঘাত নিয়ে হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করেন তিনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হার মানতে হয়—সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় নিভে যায় একটি জীবনের প্রদীপ।
দেশে খবরটি পৌঁছানোর পর যেন ভেঙে পড়ে পুরো পরিবার। স্ত্রী শিরিনা বেগমের চোখে আর কান্নাও আসে না-শুধু শূন্য দৃষ্টি। তিন সন্তান বারবার জিজ্ঞেস করে, “আব্বু কবে আসবে?”-কিন্তু সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ভাষা তাঁর নেই।
কিন্তু নির্মম বাস্তবতা আরও কঠিন-আজগরের লাশ এখনো বিদেশের মাটিতে পড়ে আছে। চার লাখ টাকা ছাড়া সেই লাশ দেশে ফিরবে না-এমন কথাই শুনছে পরিবার। অথচ ঘরে একমুঠো খাবার জোগাড় করাই যেখানে কঠিন, সেখানে এত টাকা জোগাড় করা তাদের কাছে অসম্ভব এক স্বপ্ন।
মা মমতাজ বেগম ছেলের নাম ধরে বিলাপ করতে করতে বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন। তাঁর বুকফাটা আর্তনাদে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠছে-“আমার ছেলেটারে একবার চোখে দেখামু না?”
আজগরের বড় ভাবি রোকসানা আক্তারের কণ্ঠ কাঁপতে থাকে, “বাঁচতে গিয়ে পারেনি, মরার পরও কি ঘরে ফিরতে পারবে না? আমরা কি এতটাই অসহায়?”
এই একটি মৃত্যু শুধু একজন মানুষের না-এটি একটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ, একটি মায়ের বুক খালি হয়ে যাওয়া, তিনটি সন্তানের ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে যাওয়া।
তবে একটুখানি আশার আলো রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করলে সরকারি সহায়তায় লাশ দেশে আনার ব্যবস্থা হতে পারে।
তবুও প্রশ্ন রয়ে যায়- প্রবাসে যারা জীবন বাজি রেখে স্বপ্ন খোঁজেন, তাদের জীবনের মূল্য কি এতটাই কম? আর আজগরের মতো কত স্বপ্ন এভাবেই নীরবে ঝরে যাচ্ছে-তার হিসাব কি কেউ রাখে?

2026 © Amar Dorpon. All Rights Reserved