
জেদ্দা, সৌদি আরব: সূর্যোদয়ের আগে মরুদেশের স্নিগ্ধ হাওয়ায় ভেসে পবিত্র নগরী জেদ্দার কিং আবদুল আজিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করল বাংলাদেশ থেকে আসা ২০২৬ সালের প্রথম হজ ফ্লাইট। ৪১৯ জন আরোহী নিয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিশেষ ফ্লাইট BG-3001 যখন সৌদি আরবের মাটি স্পর্শ করে, তখন স্থানীয় সময় ভোর ৪টা ২০ মিনিট। আর এর মাধ্যমেই আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো এ বছরের পবিত্র হজ যাত্রার এক নতুন অধ্যায়।
এর আগে গত শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টা ২০ মিনিটে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে হজযাত্রীদের নিয়ে বিমানটি সৌদি আরবের উদ্দেশ্যে ডানা মেলে। ফ্লাইটে ৪১৫ জন সম্মানিত হজযাত্রীর পাশাপাশি ছিলেন ৪ জন সাধারণ যাত্রী। দীর্ঘ বিমানযাত্রা শেষে ক্লান্তি থাকলেও আল্লাহর মেহমানদের চোখেমুখে ছিল এক অপার্থিব প্রশান্তি ও ইবাদতের আবেগ।
বিমানটি অবতরণের পর থেকেই শুরু হয় এক অন্যরকম উৎসবমুখর পরিবেশ। হজযাত্রীদের বরণ করে নিতে বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন সৌদি আরবে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ড. মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন, জেদ্দার কনসাল জেনারেল, কাউন্সিলর (হজ) মো. কামরুল ইসলাম, মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারীসহ বাংলাদেশ ও সৌদি সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ।
জেদ্দা বিমানবন্দরে অবতরণের পর বাংলাদেশি হজযাত্রীদের রাজকীয় ও আবেগঘন পরিবেশে বরণ করে নেওয়া হয়। সৌদি কর্তৃপক্ষের আতিথেয়তা ও আন্তরিকতা উপস্থিত সকল যাত্রীকে মুগ্ধ করেছে। অভিবাদন জানিয়ে প্রত্যেক হাজীর হাতে তুলে দেওয়া হয় সুগন্ধি ফুল, ঐতিহ্যবাহী সৌদি খেজুর এবং রিফ্রেশমেন্ট কিট সম্বলিত বিশেষ উপহার সামগ্রী।
বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতাগুলোতেও ছিল বিশেষ গতির ছাপ। হজযাত্রীদের পাসপোর্ট ইমিগ্রেশন ও অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়া দ্রুততম সময়ে সম্পন্ন করার জন্য কাজ করেছে বিশেষায়িত ডেস্ক। কর্মকর্তারা নিজ হাতে হাজীদের মালপত্র সংগ্রহে সহায়তা করেন এবং সুশৃঙ্খলভাবে তাদের বিমানবন্দরের বাইরে নিয়ে আসেন। এরপর আরামদায়ক ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন বিশেষ বাসযোগে হাজীদের মক্কার নির্ধারিত হোটেলগুলোতে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়
চলতি বছর বাংলাদেশ থেকে সরকারি ও বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় মোট ৭৮,৫০০ জন ধর্মপ্রাণ মুসলমান হজ পালনের সৌভাগ্য পাচ্ছেন। ধর্ম মন্ত্রণালয় এবং হজ মিশন সূত্রে জানা গেছে, এবার হাজীদের নিরাপত্তা ও আরাম নিশ্চিত করতে ডিজিটাল প্রযুক্তির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সৌদি আরবের উদ্দেশে যাত্রার প্রথম দিনেই বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, সৌদিয়া এবং ফ্লাইনাস মিলিয়ে মোট ১৪টি ফ্লাইট পরিচালনার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি ফ্লাইটের শিডিউল বজায় রাখতে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বসানো হয়েছে কঠোর মনিটরিং সেল।
সেবার মান আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে এবার প্রথমবারের মতো পূর্ণাঙ্গভাবে 'স্মার্ট হজ কার্ড' এবং বিশেষ মোবাইল অ্যাপ চালু করা হয়েছে। এই কার্ডের মাধ্যমে হজযাত্রীরা তাদের আবাসন, ট্রান্সপোর্ট এবং জরুরি চিকিৎসা সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য নিমেষেই পাবেন। এছাড়া মক্কা ও মদিনার অলিগলিতে পথ হারিয়ে ফেললে স্মার্ট কার্ডের জিপিএস ট্র্যাকারের মাধ্যমে সহজেই তাদের অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
পবিত্র মক্কা ও মদিনায় হজযাত্রীদের সেবায় বাংলাদেশ হজ মিশনের অধীনে একটি শক্তিশালী মেডিকেল এবং আইটি টিম ইতিমধ্যেই তাদের কার্যক্রম শুরু করেছে। অসুস্থ হজযাত্রীদের জন্য ভ্রাম্যমাণ ক্লিনিক ও সার্বক্ষণিক অ্যাম্বুলেন্স সেবা নিশ্চিত করা হয়েছে। এছাড়াও স্বেচ্ছাসেবীরা বাংলা ভাষায় হাজীদের পথনির্দেশনা ও অন্যান্য প্রয়োজনে সহায়তা করছেন।
চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আগামী ২৬ মে ২০২৬ পবিত্র হজ অনুষ্ঠিত হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। হজযাত্রীরা মক্কা ও মদিনায় অবস্থান করে তাদের নির্ধারিত ইবাদত ও আরকান সম্পন্ন করবেন। সফলভাবে হজ পালন শেষে আগামী ৩০ মে থেকে শুরু হবে ফিরতি ফ্লাইট। হাজীদের বহনকারী এই ফিরতি কার্যক্রম পর্যায়ক্রমে ১ জুলাই পর্যন্ত চলবে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং জেদ্দায় অবস্থানরত বাংলাদেশ হজ মিশন নিশ্চিত করেছে যে, প্রথম ফ্লাইটে আসা সকল যাত্রী বর্তমানে সুস্থ ও নিরাপদ রয়েছেন। তাদের থাকার জায়গা বা হোটেলগুলো পবিত্র হারাম শরীফের কাছাকাছি হওয়ার কারণে যাতায়াতে কোনো ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে না।
প্রথম ফ্লাইটের এই সফল অবতরণ এবং উষ্ণ আতিথেয়তা পরবর্তী ফ্লাইটগুলোর যাত্রীদের মাঝেও আত্মবিশ্বাস ও উৎসাহ জুগিয়েছে। বাংলাদেশ সরকার ও সৌদি কর্তৃপক্ষের এই সমন্বিত উদ্যোগ ২০২৬ সালের হজকে স্মরণীয় ও কষ্টমুক্ত করবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট সকলে।
শান্তি ও শৃঙ্খলার সাথে ইবাদত সম্পন্ন করে সকল হজযাত্রী যেন সুস্থভাবে দেশে ফিরে আসতে পারেন, এটাই এখন সবার প্রার্থনা।
2026 © Amar Dorpon. All Rights Reserved