
আগামীকাল মঙ্গলবার থেকেই শুরু হচ্ছে বাংলা নতুন বছর। নতুন বছরের প্রথম দিন বাঙালি জাতির জন্য এক উৎসবমুখর দিন। এই দিন স্বভাবতই বাঙালি জাতি মেতে ওঠে নতুন আনন্দ-উৎসবের আমেজে। সারা দেশের মানুষ যেন সারা বছরের কর্মের ক্লান্তি ভুলে প্রশান্তির আবেগে ছুটে বেড়ায় এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায়। মুখে রঙ লাগায়, নতুন বছরের সূচনায় নতুন পোশাক পরে, নতুন আবেগে একে অপরের সাথে কুশল বিনিময় করে। এ যেন সর্বকালের এক চিরচেনা উৎসব।
কিন্তু পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান বাঙালির চিরন্তন আবেগের বহিঃপ্রকাশ হলেও এর ইতিহাস খুব বেশি প্রাচীন নয়। ১৯৬৭ সালে সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট ঢাকার রমনা বটমূলে এই অনুষ্ঠানের সূচনা করেছিল। বর্তমানে এটি ঢাকার রমনা উদ্যানের অশ্বত্থ গাছের নিচে বাংলা নতুন বছরকে বরণ করার একটি ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। একজন অকুতোভয় নির্ভিক সাংবাদিক বোরহানউদ্দিন আহমেদ সর্বপ্রথম রমনা বটমূলে এই অনুষ্ঠান উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। পরবর্তীতে নব্বইয়ের দশক থেকে এটি একটি জনপ্রিয় ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে এবং শহরের নিম্নবিত্ত থেকে শুরু করে, মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত সহ সকলে শ্রেণি-পেশার মানুষ বর্তমানে রমনার বটমূলে ছুটে যায় নতুন বর্ষবরণ অনুষ্ঠান উপভোগ করার জন্য। সেখানে তারা সারাদিন ধরে নাচ-গান সহ বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠান উপভোগ করে।
বর্তমানে শুধু শহর অঞ্চলেই নয়, বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও নতুন বছরকে বরণ করার রীতি চালু হয়েছে। তবে শহর অঞ্চলে বর্ষ বরণের প্রচলন সবচেয়ে বেশি। আর ঢাকা শহরের কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। বর্তমানে ঢাকা শহরের প্রতিটি ঘরে ঘরে বর্ষ বরণের প্রচলন শুরু হয়েছে। নতুন বছরের সূচনায় তাদের নতুন প্রফুল্লতার আমেজ স্পষ্টভাবে লক্ষনীয়।

প্রতি বছর পহেলা বৈশাখের ভোরে (ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে, সাধারণত ৬:১৫ মিনিটে) রমনার বটমূল এলাকা লোকে লোকারন্য হয়ে ওঠে। সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটের অনুষ্ঠান দেখার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ভোর হওয়ার আগেই রমনার বটমূলে জড় হয়। নাচে গানে উন্মাতাল হয়ে ওঠে রমনার বটমূল এলাকা। নাচ-গানের পাশাপাশি চলে খাওয়া দাওয়ার পর্ব।
বর্ষবরণ অনুষ্ঠানমালার খাওয়া দাওয়া পর্বের প্রধান আকর্ষণ হলো পান্তা-ইলিশ। এই অনুষ্ঠানে পান্তা-ইলিশের প্রচলন শুরু হয়েছিল ১৯৮০-৮১ সালে। নির্ভিক সাংবাদিক বোরহান উদ্দিন আহমেদ সর্বপ্রথম পান্তা-ইলিশের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। প্রস্তাবটি সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়েছিল এবং বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে পান্তা-ইলিশের আয়োজন করার প্রচেষ্টা শুরু হয়েছিল। বোরহান উদ্দিনের সহকর্মীরা চাঁদা তুলে অর্থের যোগান দিয়েছিলেন। তখন থেকেই পান্তা-ইলিশের প্রচলন শুরু হয়েছিল। প্রথম বছরে মাত্র গুটিকয়েক মানুষ নববর্ষের প্রথম প্রহরে পান্তা-ইলিশের প্রচলন করলেও সাংবাদিক বোরহান উদ্দিনের প্রচেষ্টায় পরের বছর থেকে জনসাধারণের মধ্যে পান্তা-ইলিশ খাওয়ার ধুম লেগে যায়। এটি আস্তে আস্তে শহরাঞ্চল ছাড়িয়ে গ্রামাঞ্চলের এলাকাগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে নববর্ষের প্রথম প্রহরে সারা দেশের ঘরে ঘরে পান্তা-ইলিশের আয়োজন করা হয়।
তবে সারাদেশে পান্তা-ইলিশের আয়োজন করার এই উৎসবের পেছনে আরেকজন মহান ব্যক্তির অবদান রয়েছে। তিনি হলেন শিল্প উদ্যোক্তা শহিদুল হক খান। তার আর্থিক অবদানে এবং তার হাত ধরে সারা দেশে পান্তা-ইলিশ খাওয়ার প্রচলন জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। ১৯৮৩ সালে শিল্প উদ্যোক্তা শহিদুল হক খান আর্থিক অনুদান দিয়ে রমনার বিশাল ময়দান জুড়ে কয়েক হাজার মানুষকে পান্তা-ইলিশ খাওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। সেই অনুষ্ঠানটি পত্র-পত্রিকায় ব্যাপকভাবে প্রচারিত ও প্রশংসিত হয়েছিল। আর সেই অনুষ্ঠান জনসাধারণের মধ্যে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছিল। যার ফলশ্রুতিতে সারা দেশের মানুষের মধ্যে পান্তা-ইলিশ খাওয়ার প্রচলন শুরু হয়েছিল।
মূলত কৃষিজীবী বাঙালির সাধারণ খাবারের সাথে ইলিশের অভিজাত্যের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে এই আধুনিক উৎসবের সূচনা করা হয়েছিল, যা এখন সারা দেশের মানুষের জন্য বৈশাখের মূল আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। সাংস্কৃতিক সংগঠন ছয়ানটের আয়োজনে ১৯৬৭ সালে (১৩৭৪ বঙ্গাব্দে) রমনা বটমূলে পহেলা বৈশাখের যে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়েছিল, তা এখন বাঙালি জাতির একটি প্রধান চেতনার উৎসবে পরিণত হয়েছে। শুরু থেকেই ছায়ানট বরীন্দ্রনাথ ঠাকুরের "এসো হে বৈশাখ" গান দিয়ে এই অনুষ্ঠান শুরু করে, যা বর্তমানে একটি জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। ঢাকার রমনা উদ্যানের অশ্বত্থ গাছের নিচে বাংলা নতুন বছরকে বরণের একটি ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান থেকেই মূলত আজকের চেতনার সূচনা হয়েছিল।
এবারও নববর্ষ এসেছে। মানুষের মধ্যে নতুন উদ্যমের জোয়ার দেখা যাচ্ছে। গাজীপুরে অবস্থিত কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের টিন শেড কোয়ার্টার অঞ্চলের একটি সামাজিক সংগঠন জনসাধারণের জন্য বিনামূল্যে পান্তা-ইলিশ খাওয়ার ব্যবস্থা করেছে। আমি তাদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই এবং আমি আশা করব তাদের প্রচেষ্টা অত্র এলাকার হতদরিদ্র মানুষদের জন্য সারা বছর অব্যাহত থাকুক।
মনজুর রহমান শান্ত
নাট্যকার, ঔপন্যাসিক, অনুবাদক
2026 © Amar Dorpon. All Rights Reserved