

প্রতিবেদক: মোঃ রাকিব হোসেন
৩২টি সিসিটিভি ক্যামেরা ও ১৮টি ৬৫ ইঞ্চি মনিটরে নজরদারি, স্বচ্ছতা বাড়াতে নতুন উদ্যোগ।যাত্রীদের লাগেজের নিরাপত্তা জোরদার, ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং অভিযোগের ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সরাসরি লাগেজ ব্যবস্থাপনা দেখানোর ব্যবস্থা চালু করেছে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)।
নতুন এ ব্যবস্থার আওতায় বিমানবন্দরের আটটি লাগেজ বেল্ট এলাকায় ৩২টি সিসিটিভি ক্যামেরা এবং ৬৫ ইঞ্চি আকারের ১৮টি মনিটর স্থাপন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে উড়োজাহাজ থেকে লাগেজ নামানো, নির্ধারিত স্থানে পরিবহন, বাছাই এবং যাত্রীদের লাগেজ বেল্টে পৌঁছানো পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপ সরাসরি দেখার সুযোগ পাবেন যাত্রীরা।শনিবার (১৭ অক্টোবর) বেবিচকের জনসংযোগ বিভাগের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিষয়টি নিয়ে একাধিক সংবাদমাধ্যমেও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
মন্ত্রীর নির্দেশনার পর বাস্তবায়ন
বিমানবন্দরে লাগেজ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাড়ানোর উদ্যোগটি বাস্তবায়নের পেছনে রয়েছে যাত্রীসেবার মান উন্নয়নের পরিকল্পনা। ঢাকা ট্রিবিউন-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৬ সেপ্টেম্বর বিমানবন্দর পরিদর্শনের সময় বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত লাগেজ হ্যান্ডলিংয়ের অগ্রগতি তাৎক্ষণিকভাবে দেখার জন্য লাইভ মনিটরিং স্ক্রিন স্থাপনের নির্দেশ দেন। পরবর্তী সময়ে বেবিচক ক্যামেরা ও মনিটর স্থাপনের তথ্য জানায়।
কর্তৃপক্ষের প্রত্যাশা, প্রযুক্তিনির্ভর এ ব্যবস্থার ফলে লাগেজ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, দক্ষতা ও জবাবদিহি বাড়বে। বিশেষ করে প্রবাসী বাংলাদেশিসহ দেশি-বিদেশি যাত্রীরা বিমানবন্দরে পৌঁছে নিজেদের লাগেজ সংগ্রহের প্রক্রিয়া আরও স্পষ্টভাবে দেখতে পারবেন।
আটটি লাগেজ বেল্টে ক্যামেরার নজরদারি
বেবিচকের তথ্য অনুযায়ী, আটটি লাগেজ বেল্ট এলাকায় স্থাপিত ৩২টি ক্যামেরার দৃশ্য ১৮টি বড় মনিটরে দেখানো হবে। এতে উড়োজাহাজ থেকে লাগেজ নামানোর পর সেটি কীভাবে পরিবহন করা হচ্ছে, কোথায় বাছাই করা হচ্ছে এবং কীভাবে নির্ধারিত বেল্টে পৌঁছাচ্ছে, তা পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে।
এ ব্যবস্থা যাত্রীদের লাগেজ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সরাসরি ধারণা দেবে। একই সঙ্গে লাগেজ নিয়ে কোনো অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট এলাকার ক্যামেরার ফুটেজ তদন্তে সহায়ক হতে পারে।
তবে ক্যামেরার আওতায় থাকা মানেই প্রতিটি অনিয়ম স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত, ফুটেজ পর্যালোচনা এবং প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে এ উদ্যোগের কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হবে।
লাগেজ কাটা ও চুরির অভিযোগ তদন্তে নতুন গুরুত্ব
বিমানবন্দরে লাগেজ হারানো, ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, কাটা বা লাগেজ থেকে মালামাল খোয়া যাওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে যাত্রীদের উদ্বেগের বিষয়। এ ধরনের অভিযোগের প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করতে লাগেজ ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন ধাপের তথ্য ও প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ।
ডেল্টা টাইমস-এর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লাগেজ ব্যবস্থাপনা নিয়ে গঠিত ছয় সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের স্বাধীন তদন্ত কমিটি বিভিন্ন সুপারিশ করেছিল। কমিটিতে বেবিচকের প্রশাসন ও নিরাপত্তা বিভাগের প্রতিনিধি, এয়ারলাইন অপারেটরস কমিটির প্রতিনিধি, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগের প্রতিনিধি ছিলেন।
কমিটির সুপারিশের মধ্যে ছিল লাগেজ পরিবহনের পুরো প্রক্রিয়া সরাসরি সম্প্রচার, সিসিটিভির আওতাবহির্ভূত এলাকায় ক্যামেরা স্থাপন, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের শরীরে ধারণ করা ক্যামেরা ব্যবহার, ফুটেজ সংরক্ষণ, পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ এবং নিয়মিত তদারকি।
এসব সুপারিশের লক্ষ্য হলো লাগেজ ব্যবস্থাপনার প্রতিটি পর্যায়ে দায়িত্ব নির্ধারণ করা এবং কোনো অভিযোগ উঠলে ঘটনার প্রকৃত অবস্থা যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি করা।
বডি-ওর্ন ক্যামেরা ও ফুটেজ সংরক্ষণ নিয়ে ম্যাজিস্ট্রেটের বক্তব্য
বিমানবন্দরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কে এম আবু নওশাদ তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টে লাগেজ ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন ধাপে বডি-ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহারের বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ছোট উড়োজাহাজের কার্গো হোল্ড থেকে লাগেজ নামানোর সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের শরীরে ধারণ করা ক্যামেরায় কার্যক্রম রেকর্ড করা হয় এবং রেকর্ড নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় সার্ভারে সংরক্ষণ করা হয়।
তিনি আরও জানিয়েছেন, এসব রেকর্ড ৯০ দিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করা হয় এবং বডি-ওর্ন ক্যামেরা বন্ধ থাকার মতো ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট কর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত লাগেজ পাওয়া গেলে ছবি তুলে রেজিস্টারে তথ্য রাখার ব্যবস্থার কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন।
তবে এসব নির্দিষ্ট কার্যপদ্ধতি ও ৯০ দিনের সংরক্ষণসীমা সম্পর্কে বিস্তারিত সরকারি নীতিমালা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। তাই বিষয়গুলো ম্যাজিস্ট্রেটের বক্তব্য হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত।
বিদেশ থেকে লাগেজ কাটা বা খোলা অবস্থায় আসতে পারে কেন?
কোনো যাত্রী লাগেজ কাটা বা খোলা অবস্থায় পেলে সেটি বাংলাদেশের বিমানবন্দরেই ঘটেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে পুরো যাত্রাপথের বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন।
নিরাপত্তা পরীক্ষার সময় নিষিদ্ধ বা ঝুঁকিপূর্ণ কোনো বস্তু থাকার সন্দেহ হলে সংশ্লিষ্ট দেশের বিমানবন্দরে লাগেজ পরীক্ষা করা হতে পারে। ট্রানজিট বিমানবন্দরেও লাগেজের সঙ্গে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটতে পারে। তবে নির্দিষ্ট লাগেজ কেন কাটা বা খোলা হয়েছে, তা সংশ্লিষ্ট প্রমাণ ও কর্তৃপক্ষের তথ্যের ভিত্তিতে যাচাই করতে হবে।
এ কারণে যাত্রীরা লাগেজ সংগ্রহের সময় সেটি ভালোভাবে পরীক্ষা করবেন। কাটা, খোলা বা ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় পেলে বিমানবন্দর ত্যাগের আগেই সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন অথবা লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড কাউন্টারে অভিযোগ জানানো উচিত। সম্ভব হলে ছবি, ব্যাগেজ ট্যাগ, বোর্ডিং পাস এবং অভিযোগের রেফারেন্স নম্বর সংরক্ষণ করতে হবে।
অভিযোগ ও যাত্রী অধিকার রক্ষায় যোগাযোগ
বিমানবন্দরে যথাযথ সেবা না পাওয়া, লাগেজ-সংক্রান্ত সমস্যা কিংবা অন্য কোনো অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে যোগাযোগ করার সুযোগ রয়েছে।বিমানবন্দর হটলাইন: ১৩৬০০,বিকল্প হটলাইন: ০৯৬১৪-০১৩৬০০,বিমানবন্দরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের হোয়াটসঅ্যাপ: ০১৩০৪০৫০৬০৩, ০১৩০৪০৫০৬০৩ নম্বরটি হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগের জন্য ব্যবহার করা যায় বলে যাচাই করা হয়েছে। অভিযোগ জানানোর সময় ঘটনার তারিখ, ফ্লাইট নম্বর, ব্যাগেজ ট্যাগ এবং প্রাসঙ্গিক প্রমাণ দিলে বিষয়টি বুঝতে ও যাচাই করতে সুবিধা হবে।
যাত্রীসেবায় ইতিবাচক উদ্যোগ, প্রয়োজন কার্যকর বাস্তবায়ন
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাগেজ ব্যবস্থাপনা সরাসরি দেখানোর ব্যবস্থা যাত্রীসেবায় স্বচ্ছতা বাড়ানোর একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে এ উদ্যোগের প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে নিয়মিত নজরদারি, অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি, প্রয়োজনীয় ফুটেজ সংরক্ষণ এবং দায়িত্বে অবহেলা বা অনিয়ম প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর।
যাত্রীদের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা এবং অভিযোগের ফলাফল সম্পর্কে তাঁদের যথাযথ তথ্য দেওয়া গেলে বিমানবন্দরের সেবার মান ও জনআস্থা আরও বাড়তে পারে।
প্রযুক্তির ব্যবহার, দায়িত্বশীল তদারকি এবং জবাবদিহির সমন্বয়ে দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাগেজ ব্যবস্থাপনা আরও নিরাপদ ও স্বচ্ছ হবে—এমন প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট সবার।
ভালো থাকুক বাংলাদেশের বিমানবন্দর। নিরাপদ থাকুক যাত্রীদের লাগেজ। নিশ্চিত হোক স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও মানসম্মত যাত্রীসেবা।
2026 © Amar Dorpon. All Rights Reserved