

নজমুল হক গাজীপুর
বাংলাদেশ নতুন এক রাজনৈতিক অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ পেরিয়ে তাঁর নেতৃত্বে নতুন সরকার যাত্রা শুরু করে। এখন সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই নেতৃত্ব কতটা মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে? প্রত্যাশা অনেক। চ্যালেঞ্জও অনেক। বাংলাদেশের মানুষ এখন শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তন চায় না। তারা জীবনে পরিবর্তন চায়। বাজারে স্বস্তি চায়। চাকরি চায়। বিনিয়োগ চায়। নিরাপত্তা চায়। সুশাসন চায়। দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন চায়। এই বাস্তবতা বুঝেই সরকারের পথ চলতে হবে। তারেক রহমানের নেতৃত্বের ইতিবাচক দিক হলো অর্থনীতি ও বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বার্তা। জুলাইয়ে এফআইসিসিআই আয়োজিত বিদেশি বিনিয়োগ সম্মেলনে তিনি দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানান। তাঁর বক্তব্যে বিনিয়োগের সঙ্গে কর্মসংস্থান, বাণিজ্য ও সমৃদ্ধির সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় প্রয়োজন এখন কর্মসংস্থান সৃষ্টি। শুধু সরকারি চাকরি দিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। শিল্প গড়তে হবে। নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করতে হবে। প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। বিদেশি বিনিয়োগ এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সম্প্রতি আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে আরও ৫ বিলিয়ন ডলার মার্কিন বিনিয়োগ আকর্ষণের সম্ভাবনার কথা বলেছে। একই সঙ্গে তারা অর্থনৈতিক সংস্কার ও নীতির পূর্বানুমেয়তা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে। এখানেই সরকারের সামনে বড় সুযোগ। বিনিয়োগের আহ্বান যথেষ্ট নয়। বিনিয়োগকারীর আস্থা অর্জন করতে হবে। নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে। দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমাতে হবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নির্ভরযোগ্য করতে হবে। বন্দর ও পরিবহনব্যবস্থা আরও দক্ষ করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আইনের শাসন। একজন বিনিয়োগকারী শুধু বাজার দেখেন না। তিনি দেশের প্রতিষ্ঠান দেখেন। বিচারব্যবস্থা দেখেন। কর ব্যবস্থা দেখেন। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দেখেন। দুর্নীতির মাত্রা দেখেন। তাই তারেক রহমানের নেতৃত্বের অন্যতম বড় পরীক্ষা হবে একটি আস্থাশীল ব্যবসায়িক পরিবেশ তৈরি করা। অর্থনীতির বর্তমান চিত্র অবশ্য সহজ নয়। বিশ্বব্যাংকের এপ্রিল ২০২৬-এর হিসাবে, ২০২৫ ও ২০২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩.৯ শতাংশে নেমে আসার আশঙ্কা করা হয়েছিল। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি ছিল প্রায় ৮.৫ শতাংশ। ২০২৫ সালে জাতীয় দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২১.৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা ২০২২ সালের ১৮.৭ শতাংশের তুলনায় বেশি। এই সংখ্যা শুধু অর্থনীতির পরিসংখ্যান নয়। এর পেছনে আছে মানুষের জীবন। বাজারে বেশি দাম মানে পরিবারের বাজেটে চাপ। কম প্রবৃদ্ধি মানে চাকরির সুযোগ কমে যাওয়ার ঝুঁকি। দারিদ্র্য বাড়া মানে অনেক পরিবারের স্বপ্ন থমকে যাওয়া। তাই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এখন সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
খাদ্য সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। বাজারে সিন্ডিকেট ও কারসাজির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। কৃষক যেন ন্যায্য দাম পান, আবার ভোক্তাও যেন অতিরিক্ত দামে পণ্য কিনতে বাধ্য না হন—এই ভারসাম্য তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাত সংস্কার জরুরি। খেলাপি ঋণ কমাতে হবে। ব্যাংকের পরিচালনায় সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। আমানতকারীর আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। ঋণ যেন যোগ্য উদ্যোক্তার কাছে যায়, রাজনৈতিক প্রভাবশালীর কাছে নয়—এটি নিশ্চিত করা দরকার।রাজস্ব ব্যবস্থাও শক্তিশালী করতে হবে। উন্নত রাষ্ট্র গড়তে অর্থ লাগে। কিন্তু সেই অর্থ আসবে কোথা থেকে? করের আওতা বাড়াতে হবে। কর প্রশাসনকে সহজ ও স্বচ্ছ করতে হবে। সৎ করদাতাকে হয়রানি করা যাবে না। আবার কর ফাঁকিও সহ্য করা যাবে না।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্যেও সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রী জুলাইয়ে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয় ধীরে ধীরে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনার কথা জানান। এটি বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘমেয়াদে মানবসম্পদ উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে শুধু অর্থ বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না। অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। বিদ্যালয়ে শিক্ষক থাকতে হবে। হাসপাতালে চিকিৎসক থাকতে হবে। ওষুধ থাকতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার সুযোগ বাড়াতে হবে। শিক্ষা ও কর্মবাজারের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। বিশেষ করে তরুণদের দিকে নজর দিতে হবে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ তরুণদের হাতে। তাঁদের দক্ষতা বাড়ানো না গেলে জনসংখ্যার সুবিধা বোঝায় পরিণত হতে পারে। কারিগরি শিক্ষা বাড়াতে হবে। ডিজিটাল দক্ষতা বাড়াতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে শিক্ষাকে যুক্ত করতে হবে। উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ তৈরি করতে হবে। রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও নতুন নেতৃত্বের সামনে বড় দায়িত্ব রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি বলেছেন, টেকসই উন্নয়ন অর্জনে সম্মিলিত জাতীয় প্রচেষ্টা দরকার। একই সঙ্গে তিনি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, অবাধ নির্বাচন, আইনের শাসন এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।এগুলো শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য হয়ে থাকলে চলবে না। বাস্তবে রূপ দিতে হবে। গণতন্ত্রের শক্তি প্রতিষ্ঠান থেকে আসে। সংসদকে কার্যকর করতে হবে। বিরোধী মতকে সম্মান করতে হবে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবের বাইরে পেশাদারভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। আইনের চোখে সবাইকে সমান হতে হবে। এটাই হবে নতুন নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় অর্জন।
পররাষ্ট্রনীতিতেও ভারসাম্য জরুরি। বাংলাদেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে বন্ধুত্বপূর্ণ। কিন্তু জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে থাকবে দৃঢ়তা। আগস্টে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরির ওপর প্রধানমন্ত্রী গুরুত্ব দিয়েছেন। এ ধরনের বাস্তববাদী কূটনীতি বাংলাদেশের জন্য উপকারী হতে পারে। কারণ অর্থনীতি এখন বিশ্বব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, শ্রমবাজার ও প্রযুক্তি—সবকিছুতেই আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। তারেক রহমানের নেতৃত্বের সামনে তাই একটি বড় সুযোগ রয়েছে। রাজনীতিকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ। রাষ্ট্রকে আরও কার্যকর করার সুযোগ। প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার সুযোগ। তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান তৈরির সুযোগ। তবে প্রত্যাশা পূরণের জন্য সময় নষ্ট করার সুযোগ নেই।অর্থনীতিতে দ্রুত সংস্কার দরকার। ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা দরকার। বিনিয়োগে গতি দরকার। মূল্যস্ফীতি কমানো দরকার। কর্মসংস্থান বাড়ানো দরকার। বিশ্বব্যাংকও বলেছে, রাজস্ব, আর্থিক খাত ও ব্যবসায়িক পরিবেশে কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা কঠিন। এই সতর্কবার্তাকে গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ সরকারের সাফল্য শুধু প্রবৃদ্ধির শতাংশে মাপা হবে না। সাফল্য মাপা হবে মানুষের ক্রয়ক্ষমতায়।সাফল্য মাপা হবে নতুন চাকরিতে। সাফল্য মাপা হবে বিনিয়োগের পরিমাণে। সাফল্য মাপা হবে দুর্নীতি কমেছে কি না, সেই প্রশ্নে। সাফল্য মাপা হবে নাগরিক কত দ্রুত সরকারি সেবা পাচ্ছেন, তাতে। সাফল্য মাপা হবে তরুণরা ভবিষ্যৎ নিয়ে কতটা আশাবাদী, তাতে। তারেক রহমানের সামনে তাই ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে জনকল্যাণের কর্মসূচিতে রূপ দেওয়া। প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব ফলাফলে পরিণত করা। নেতৃত্বকে প্রতিষ্ঠাননির্ভর করা। রাষ্ট্রকে দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে নিয়ে যাওয়া। বাংলাদেশের মানুষ বড় কোনো অলৌকিক পরিবর্তন চায় না। তারা চায় স্বাভাবিক জীবন। ন্যায্য দাম। যোগ্যতার মূল্য। নিরাপদ কর্মসংস্থান। সুশাসন। ন্যায়বিচার। সম্মানজনক ভবিষ্যৎ। এই প্রত্যাশাগুলো পূরণ করতে পারলে তারেক রহমানের নেতৃত্ব শুধু একটি সরকারের সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হবে না। তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠতে পারে।
শেষ পর্যন্ত জনগণ কথায় নয়, কাজে বিচার করবে। সেই বিচারের সময় শুরু হয়ে গেছে। তারেকের নেতৃত্বের সামনে এখন একটাই পথ—জনগণের আস্থা ধরে রেখে সংস্কার, সুশাসন ও উন্নয়নের বাস্তব ফল দেখানো। বাংলাদেশের প্রত্যাশা বড়। সেই প্রত্যাশার চেয়েও বড় হওয়া উচিত নেতৃত্বের দায়িত্ব।
2026 © Amar Dorpon. All Rights Reserved