নজমুল হক, গাজীপুর
বাংলাদেশের কৃষি খাত দীর্ঘদিন ধরেই অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু বাস্তবতা হলো—যারা খাদ্য নিরাপত্তার প্রধান কারিগর, সেই কৃষকরাই নানা কাঠামোগত বঞ্চনার শিকার। এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে ফার্মার্স কার্ড বা কৃষক কার্ড চালু একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে, যা শুধু একটি প্রশাসনিক প্রকল্প নয়—বরং কৃষকের অধিকার, মর্যাদা ও প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার একটি নীতিগত ঘোষণা। সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী চার বছরে প্রায় ১ কোটি ৬৫ লাখ কৃষকের হাতে এই কার্ড পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই বিপুল পরিসরের উদ্যোগই প্রমাণ করে যে, কৃষিকে কেন্দ্র করেই নতুন অর্থনৈতিক রূপান্তরের ভিত্তি গড়ার চেষ্টা চলছে। শুধু তাই নয়, কৃষকদের জন্য ভর্তুকি, সহজ শর্তে ঋণ, সেচ সুবিধা, কৃষি প্রশিক্ষণ, বাজার তথ্যসহ অন্তত ১০ ধরনের সুবিধা এই কার্ডের মাধ্যমে নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।বাংলাদেশের শ্রমশক্তির প্রায় ৪৫ শতাংশ এখনো কৃষির ওপর নির্ভরশীল। অথচ দীর্ঘদিন ধরে কৃষি ভর্তুকি ও সহায়তা বণ্টনে মধ্যস্বত্বভোগী, দুর্নীতি এবং তথ্যের অভাব বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফার্মার্স কার্ড এই জায়গাটিতেই একটি কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। প্রতিটি কৃষকের জন্য আলাদা ডাটাবেজ তৈরি, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সংযুক্তিকরণ এবং সরাসরি অর্থ সহায়তা প্রদান—এসব উদ্যোগ কৃষি খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়াবে বলে প্রত্যাশা করা যায়।প্রাথমিক পর্যায়ে ২১,৮০০ কৃষককে নিয়ে পাইলট প্রকল্প চালুর মাধ্যমে এর বাস্তবায়ন শুরু হচ্ছে, যা পরবর্তীতে সারাদেশে বিস্তৃত হবে। এই ধাপে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশের অধিকাংশ কৃষকই ক্ষুদ্র জমির মালিক বা ভূমিহীন। এদের অর্থনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা ছাড়া টেকসই কৃষি উন্নয়ন সম্ভব নয়। এই উদ্যোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—ডিজিটাল কৃষি ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হওয়া। কৃষকদের তথ্যভিত্তিক সনাক্তকরণ, উৎপাদন, জমির ধরন ও ফসলের ডাটাবেজ তৈরি—এসবের মাধ্যমে কৃষি খাতকে আধুনিক ও পরিকল্পিতভাবে পরিচালনার সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে ভর্তুকি অপচয় কমবে এবং প্রকৃত কৃষকই উপকৃত হবে। ইতিমধ্যে সরকার ঘোষণা দিয়েছে যে, এই কার্ড বিতরণে রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তে যোগ্যতাকেই প্রাধান্য দেওয়া হবে, যা একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও এই ধরনের উদ্যোগের কার্যকারিতা প্রমাণ করে। ভারতের কিষান ক্রেডিট কার্ড বা ইউরোপের কৃষক নিবন্ধন ব্যবস্থার মাধ্যমে কৃষকদের সহজ ঋণ, ভর্তুকি ও বীমা সুবিধা প্রদান করে উৎপাদন বৃদ্ধি ও দারিদ্র্য হ্রাসে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে।বাংলাদেশেও পূর্বে চালু হওয়া ইনপুট সহায়তা কার্ড কর্মসূচির গবেষণায় দেখা গেছে, এ ধরনের কার্ড কৃষি উৎপাদন ও কৃষকের আয় বৃদ্ধিতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। তবে এই উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের দক্ষতার ওপর। অতীতে অনেক ভালো উদ্যোগই বাস্তবায়নের দুর্বলতায় প্রত্যাশিত ফল দিতে পারেনি। তাই প্রয়োজন স্বচ্ছতা, নির্ভুল তথ্য সংগ্রহ, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং মাঠপর্যায়ে কার্যকর মনিটরিং। একই সঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বৃদ্ধিও অপরিহার্য, যাতে তারা এই কার্ডের সুবিধা যথাযথভাবে ব্যবহার করতে পারেন। সবশেষে বলা যায়, ফার্মার্স কার্ড কেবল একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়—এটি কৃষকদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও মর্যাদা দেওয়ার একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতি। যদি এই উদ্যোগ সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা বাংলাদেশের কৃষি খাতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে টেকসই প্রবৃদ্ধির ভিত্তি স্থাপন করবে। কৃষকের হাতে শক্তি তুলে দেওয়ার এই অঙ্গীকারই হতে পারে ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধ বাংলাদেশের মূল চালিকাশক্তি।

Leave a Reply