দেশের নজমুল হক স্টাফ রিপোর্টার গাজীপুর
অন্যতম শীর্ষস্থানীয় মেরিটাইম প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ‘ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম একাডেমি’ (IMA)-র কমান্ড্যান্ট হিসেবে নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন অভিজ্ঞ মেরিনার ক্যাপ্টেন সুব্রত কুমার সাহা। দক্ষ এই মেরিনারের নিয়োগে একাডেমির প্রশাসনিক কাঠামোতে যেমন নতুন প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে, তেমনি শিক্ষক ও ক্যাডেটদের মাঝেও বইছে আনন্দের জোয়ার। ইতিপূর্বে তিনি একই প্রতিষ্ঠানে ডেপুটি কমান্ড্যান্ট হিসেবে অত্যন্ত নিষ্ঠা ও দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।
ক্যাপ্টেন সুব্রত কুমার সাহার এই সাফল্যের পথচলা শুরু হয়েছিল তার কৃতি ছাত্রজীবন থেকে। তিনি দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজ থেকে সফলভাবে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। ক্যাডেট কলেজের সুশৃঙ্খল পরিবেশই তাকে পরবর্তী জীবনে একজন সুযোগ্য নেতৃত্ব হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে। এরপর ১৯৯০ সালে তিনি চট্টগ্রাম মেরিন একাডেমিতে ২৬তম ব্যাচের ক্যাডেট হিসেবে ভর্তি হন। সেখান থেকেই শুরু হয় তার নীল সমুদ্র জয়ের স্বপ্ন এবং পেশাদার মেরিনার হওয়ার যাত্রা।
চট্টগ্রাম মেরিন একাডেমি থেকে প্রশিক্ষণ শেষ করার পর তিনি দীর্ঘ ১৮ বছর সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের সাথে পাল্লা দিয়ে পেশাগত দায়িত্ব পালন করেছেন। কর্মজীবনে তিনি হংকং এবং সিঙ্গাপুর ভিত্তিক বিশ্বের নামকরা সব শিপিং কোম্পানিতে অত্যন্ত সুনামের সাথে কাজ করেছেন। তার এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তাকে আন্তর্জাতিক মানের শিপিং প্রোটোকল ও জাহাজ পরিচালনার খুঁটিনাটি বিষয়ে দক্ষ করে তুলেছে।
বিশেষ করে, অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও কারিগরিভাবে জটিল ‘কেমিক্যাল ট্যাঙ্কার’ এবং ‘ওয়েল ট্যাঙ্কার’ পরিচালনার ক্ষেত্রে তার রয়েছে দীর্ঘ ১৫ বছরের বিশেষায়িত অভিজ্ঞতা। আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমায় বিশালকার সব জাহাজ পরিচালনার এই অভিজ্ঞতা এখন দেশের তরুণ ক্যাডেটদের প্রশিক্ষণে এক অনন্য সম্পদ হিসেবে কাজ করবে।
২০১৫ সালে ক্যাপ্টেন সুব্রত কুমার সাহা তার দীর্ঘ সমুদ্র জীবনের অভিজ্ঞতা দেশের তরুণ প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দিতে ‘ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম একাডেমি’-তে ইন্সট্রাক্টর হিসেবে যোগ দেন। মাঠপর্যায়ের কঠোর অভিজ্ঞতার সাথে তাত্ত্বিক জ্ঞানের সমন্বয়ে তিনি অল্প সময়েই ক্যাডেটদের কাছে একজন প্রিয় শিক্ষক ও পথপ্রদর্শক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। একাডেমিক ক্ষেত্রে নবীন ক্যাডেটদের মানসিক ও কারিগরি দক্ষতা বৃদ্ধিতে তিনি শুরু থেকেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন। পরবর্তীতে তার যোগ্যতা ও পরিশ্রমের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে ডেপুটি কমান্ড্যান্টের দায়িত্ব প্রদান করা হয়, যেখানে তিনি তার প্রশাসনিক দক্ষতার স্বাক্ষর রাখেন।
কমান্ড্যান্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর এক প্রতিক্রিয়ায় ক্যাপ্টেন সুব্রত কুমার সাহা তার অনুভূতি ও পরিকল্পনার কথা ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, “ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম একাডেমির কমান্ড্যান্ট হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া আমার জন্য যেমন অত্যন্ত গর্বের, তেমনি এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জও বটে। আমাদের দেশ থেকে দক্ষ মেরিনার তৈরি করে বিশ্ববাজারে তাদের অবস্থান শক্ত করা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, আধুনিক প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে মেরিটাইম সেক্টর দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। সেই পরিবর্তনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে একাডেমির প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও বিশ্বমানের করা হবে। তার মূল লক্ষ্য হলো, এমনভাবে ক্যাডেটদের গড়ে তোলা যাতে তারা আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমায় বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজের পাশাপাশি বিশ্বের বড় বড় জাহাজে মর্যাদার সাথে কাজ করতে পারে।
ক্যাপ্টেন সুব্রত কুমার সাহার এই নিয়োগকে কেন্দ্র করে ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম একাডেমিতে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। একাডেমির বর্তমান ক্যাডেটরা মনে করেন, একজন অভিজ্ঞ এবং মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কমান্ড্যান্ট পাওয়ায় তাদের হাতে-কলমে শেখার সুযোগ আরও বাড়বে। শিক্ষকরাও তার নেতৃত্বের প্রতি পূর্ণ আস্থা প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, সুব্রত কুমার সাহার সুযোগ্য নেতৃত্বে একাডেমিটি দক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানের মেরিনার তৈরিতে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে এবং বিশ্ব মেরিটাইম মানচিত্রে বাংলাদেশের গৌরব আরও বৃদ্ধি করবে।
বর্তমান বিশ্বে ব্লু-ইকোনমি বা সমুদ্র অর্থনীতির গুরুত্ব অপরিসীম। আর এই খাতের মূল চালিকাশক্তি হলো দক্ষ জনবল। ক্যাপ্টেন সুব্রত কুমার সাহার মতো অভিজ্ঞ ও দূরদর্শী নেতার হাত ধরে ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম একাডেমি সেই লক্ষ্য অর্জনে বিশেষ ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন। তার এই নতুন পথচলা দেশের মেরিটাইম সেক্টরের জন্য এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে।

Leave a Reply