এসিসিএ-এর সাথে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত

এসিসিএ-এর সাথে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত

নজমুল হক, স্টাফ রিপোর্টার গাজীপুর

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার মানউন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের উপযোগী করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় (এনইউ)।

দেশের বৃহত্তম এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের পেশাদার অ্যাকাউন্টিং ও ফিন্যান্স শিক্ষায় দক্ষ করে তুলতে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাসোসিয়েশন অব সার্টিফাইড চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস’(এসিসিএ)-এর সাথে একটি সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরিত হয়েছে।

​গতকাল ০৭ এপ্রিল ২০২৬, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজধানীতে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনারের সরকারি বাসভবনে জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই চুক্তির আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। এই উদ্যোগের মাধ্যমে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের লাখ লাখ শিক্ষার্থীর সামনে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্যারিয়ার গড়ার এক নতুন দুয়ার উন্মোচিত হলো।


বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাজ্যের ট্রেড এনভয় এবং হাউস অব লর্ডসের প্রভাবশালী সদস্য ব্যারোনেস রোজি উইন্টারটন এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক-এর বিশেষ উপস্থিতিতে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. এ এস এম আমানুল্লাহ। অন্যদিকে এসিসিএ-এর পক্ষে স্বাক্ষর করেন এসিসিএ বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার প্রমা তাপসী খান এফসিসিএ এবং সিনিয়র বিজনেস ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজার শাহ ওয়ালিউল মানজুর।

​অনুষ্ঠানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি প্রফেসর মো. লুৎফর রহমান, ইন্টারন্যাশনাল ডেস্কের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক রাজ বিন কাশেমসহ ব্রিটিশ হাইকমিশনের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ দলের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমানে এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যেখান থেকে প্রতি বছর প্রায় ১০ লক্ষ শিক্ষার্থী স্নাতক শেষ করে বের হয়। তবে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের চাহিদা অনুযায়ী কারিগরি ও পেশাদার দক্ষতা না থাকায় এই বিশাল জনশক্তির একটি বড় অংশ বেকারত্বের অভিশাপ নিয়ে ঘুরছে। অন্যদিকে, দেশের অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান দক্ষ কর্মী না পেয়ে তাদের স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনায় হিমশিম খাচ্ছে। এই ‘স্কিল গ্যাপ’ বা দক্ষতার ঘাটতি দূর করতেই এসিসিএ-এর সাথে এই কৌশলগত অংশীদারিত্ব।

​এই সমঝোতা স্মারকের মূল লক্ষ্য হলো শিক্ষার্থীদের শুধু একটি একাডেমিক ডিগ্রি প্রদান নয়, বরং তাদের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নিয়োগদাতাদের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ করে তোলা। বিশেষ করে কর্পোরেট সেক্টর, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ (এসএমই), অডিট ও অ্যাকাউন্টিং ফার্ম এবং বর্তমানে ক্রমবর্ধমান বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং (বিপিও) খাতে ক্যারিয়ার গঠনের জন্য শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করা হবে।

চুক্তির আওতায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা এসিসিএ’র আন্তর্জাতিক যোগ্যতার পথে সরাসরি প্রবেশাধিকার পাবে। এর প্রাথমিক ধাপ হিসেবে শিক্ষার্থীরা ‘সার্টিফাইড অ্যাকাউন্টিং টেকনিশিয়ান’ (CAT) প্রোগ্রামে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবে। এটি সম্পন্ন করার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বিশ্বমানের পেশাদার অ্যাকাউন্টিং শিক্ষার ভিত তৈরি করতে পারবে, যা পরবর্তীতে তাদের পূর্ণাঙ্গ এসিসিএ সদস্য হতে সহায়তা করবে।

উল্লেখ্য যে, এসিসিএ ডিগ্রিটি বিশ্বের ১৭০টিরও বেশি দেশে স্বীকৃত, ফলে এই শিক্ষার্থীরা শুধু দেশে নয়, বিদেশের মাটিতেও সম্মানজনক কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. এ এস এম আমানুল্লাহ তার বক্তব্যে বলেন, “আজকের এই দিনটি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে একটি মাইলফলক। এই সহযোগিতার ফলে বাংলাদেশের হিসাববিজ্ঞান ও ফিন্যান্স শিক্ষার একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি হবে। এটি কেবল একটি চুক্তি নয়, বরং জ্ঞান বিনিময় এবং বৈশ্বিক মানদণ্ডকে আমাদের দেশীয় শিক্ষাব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করার একটি প্রয়াস।”
​যুক্তরাজ্যের ট্রেড এনভয় ব্যারোনেস রোজি উইন্টারটন এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেন, “জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ২৫,০০০ শিক্ষার্থীর জন্য প্রাথমিক পর্যায়ে আন্তর্জাতিক এই সুযোগ উন্মুক্ত হওয়া অত্যন্ত আনন্দের। এটি যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।”

​এসিসিএ বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার প্রমা তাপসী খান বলেন, “আমাদের লক্ষ্য হলো শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থান যোগ্য করে তোলা। এই অংশীদারিত্বের মাধ্যমে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা স্নাতক চলাকালীনই পেশাদার দক্ষতা অর্জন করতে পারবে, যা তাদের অন্যদের চেয়ে কয়েক ধাপ এগিয়ে রাখবে।”
বাংলাদেশে দক্ষ জনবল তৈরির ক্ষেত্রে অ্যাকাউন্টিং এবং ফিন্যান্স একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খাত। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বিশাল একটি প্রতিষ্ঠানের সাথে এসিসিএ-এর এই সমঝোতা কেবল উচ্চশিক্ষার মানই বাড়াবে না, বরং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে দক্ষ প্রফেশনাল তৈরির কারখানা হিসেবে কাজ করবে। এর ফলে শিক্ষিত বেকারত্বের হার হ্রাস পাবে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে এক নতুন গতির সঞ্চার হবে বলে আশা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published.