নজমুল হক, স্টাফ রিপোর্টার গাজীপুর
গাজীপুরে আইন-শৃঙ্খলার চরম অবনতির চিত্র ফুটে উঠেছে এক দুর্ধর্ষ ছিনতাইয়ের ঘটনায়। পেশাগত দায়িত্ব পালন শেষে ফেরার পথে ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েছেন এস এ টেলিভিশনের চিত্র সাংবাদিক ও কোনাবাড়ী প্রেসক্লাবের কোষাধ্যক্ষ রেজাউল করিম রেজা। গত বৃহস্পতিবার (০৯ এপ্রিল) রাতে ধান গবেষণা এলাকায় এই হামলার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় কেবল মোবাইল ছিনতাই-ই নয়, বরং একজন গণমাধ্যমকর্মীকে শারীরিকভাবে জখম করার ঘটনায় স্থানীয় সাংবাদিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগী সূত্রে জানা গেছে, গতকাল বৃহস্পতিবার রাত আনুমানিক ৯টার দিকে গাজীপুর জেলা পুলিশের একটি সংবাদ সম্মেলন কভার শেষে জয়দেবপুর রেললাইন এলাকা থেকে একটি অটোরিকশাযোগে গাজীপুর চৌরাস্তার উদ্দেশ্যে রওনা হন রেজাউল করিম। তিনি যখন বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিআরআরআই) কাছাকাছি পৌঁছান, তখন আগে থেকেই ওত পেতে থাকা ছিনতাইকারী চক্রের সদস্যরা পরিকল্পিতভাবে অটোরিকশাটির গতিপথ রোধ করে।
অটোরিকশার সামনে যাত্রীবেশে বসে থাকা দুই ব্যক্তি হঠাৎ করে চালককে গাড়ি থামাতে বাধ্য করে। গাড়ি থামার সাথে সাথেই মুহূর্তের মধ্যে তারা রামদা ও দেশীয় অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে রেজাউল করিমকে জিম্মি করে ফেলে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা তার দামী স্মার্টফোন এবং সাথে থাকা ব্যক্তিগত মালামাল ছিনিয়ে নেয়।
ছিনতাইকারীদের সাথে ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে রেজাউল করিম অটোরিকশা থেকে নিচে পড়ে যান। এতে তার হাত ও পায়ে গুরুতর আঘাত লাগে। ছিনতাইকারীরা মালামাল নিয়ে দ্রুত পালিয়ে গেলে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে। পরে তাকে গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তিনি কিছুটা সুস্থ বোধ করলে আইনি পদক্ষেপের দিকে অগ্রসর হন।
ঘটনার পরপরই সাংবাদিক রেজাউল করিম গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সদর থানায় উপস্থিত হয়ে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসেন সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আমিনুল ইসলাম। তিনি ঘটনাস্থলের আশেপাশে থাকা সিসিটিভি ফুটেজ এবং তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহের চেষ্টা করেন।
তবে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো গ্রেপ্তার বা মালামাল উদ্ধারের খবর পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আমিনুল ইসলামের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, “ছিনতাইয়ের বিষয়টি আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছি। পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। যদিও দিনের বেলায় এ ধরনের অপরাধীদের তাৎক্ষণিক হদিস পাওয়া কিছুটা কঠিন, তবে আমাদের টিম কাজ করছে। আশা করছি দ্রুতই অপরাধীদের শনাক্ত করা সম্ভব হবে।”
ভুক্তভোগী সাংবাদিক রেজাউল করিম বলেন, “আমি একজন গণমাধ্যম কর্মী হিসেবে প্রতিদিন মানুষের বিপদে-আপদে সংবাদ সংগ্রহ করি। কিন্তু খোদ পুলিশের সংবাদ সম্মেলন থেকে ফেরার পথে যদি সাংবাদিকরাই নিরাপদ না থাকেন, তবে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়? আমি কেবল সাংবাদিক হিসেবে নয়, এই নগরের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবেও চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। আমি দ্রুত সময়ের মধ্যে এই ছিনতাইকারী চক্রকে গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।”
এদিকে এস এ টিভির সাংবাদিকের ওপর হামলার খবরে গাজীপুরের সাংবাদিক মহলে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এক বিবৃতিতে বলেছেন, গাজীপুর এখন ছিনতাইকারীদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে রাত বাড়ার সাথে সাথে শহরের প্রধান সড়কগুলোতেও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। তারা আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দোষীদের আইনের আওতায় আনার আল্টিমেটাম দিয়েছেন, অন্যথায় কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
গাজীপুর চৌরাস্তা এবং জয়দেবপুর সংলগ্ন এলাকাগুলোতে ইদানীং ছিনতাইয়ের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। বিশেষ করে সংবাদকর্মীদের ওপর এ ধরনের হামলা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। সাধারণ মানুষের দাবি, পুলিশি টহল আরও জোরদার করা হোক এবং চিহ্নিত ছিনতাই স্পটগুলোতে স্থায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হোক।
গাজীপুরবাসীর এখন একটাই দাবি—অপরাধী যে-ই হোক, দ্রুত গ্রেফতার করে সড়কে নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনা হোক।

Leave a Reply