নজমুল হক, স্টাফ রিপোর্টার গাজীপুর
বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সত্ত্বেও একটি বড় বাধা এখনও অটল—দুর্নীতি। টেকসই উন্নয়নের পথে এটি শুধু প্রতিবন্ধকই নয়, বরং উন্নয়নের অর্জনগুলোকে ধ্বংস করার এক নীরব ঘাতক। তাই দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠন ছাড়া একটি শক্তিশালী ও স্থিতিশীল রাষ্ট্রব্যবস্থা কল্পনা করা যায় না। আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের ২০২৫ সালের দুর্নীতি ধারণা সূচক (CPI) অনুযায়ী, বাংলাদেশ ১০০ এর মধ্যে মাত্র ২৪ পয়েন্ট অর্জন করেছে, যেখানে বৈশ্বিক গড় ৪৩-এর কাছাকাছি। একই সূচকে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় ১৩তম অবস্থানে রয়েছে। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি সংখ্যা নয়; এটি আমাদের শাসনব্যবস্থা, প্রশাসনিক কাঠামো এবং জবাবদিহিতার দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি। দুর্নীতির প্রভাব বহুমাত্রিক। প্রথমত, এটি অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
উন্নয়ন প্রকল্পে অতিরিক্ত ব্যয়, নিম্নমানের কাজ এবং সম্পদের অপচয় দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করে। দ্বিতীয়ত, এটি সামাজিক বৈষম্য বাড়ায়। দুর্নীতির কারণে সুবিধা পায় ক্ষমতাসীন ও প্রভাবশালী গোষ্ঠী, আর বঞ্চিত হয় সাধারণ মানুষ। ফলে সমাজে ন্যায়বিচার ও সমতা ক্ষুণ্ন হয়। রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও দুর্নীতির প্রভাব সুদূরপ্রসারী। সাম্প্রতিক বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশের ভোটারদের অন্যতম প্রধান উদ্বেগ দুর্নীতি। এটি গণতন্ত্রের ভিত্তিকে দুর্বল করে এবং জনগণের আস্থা কমিয়ে দেয়। যখন মানুষ মনে করে যে রাষ্ট্রযন্ত্র দুর্নীতিগ্রস্ত, তখন তারা রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা হারায়—যা দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার জন্ম দেয়। দুর্নীতির আরেকটি গুরুতর দিক হলো অর্থপাচার। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশের বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে যায়, যা দেশের বিনিয়োগ সক্ষমতা ও আর্থিক স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এই অর্থ যদি দেশে বিনিয়োগ হতো, তবে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, শিল্পায়ন এবং দারিদ্র্য হ্রাসে বড় ভূমিকা রাখতে পারত।
তবে আশার কথা হলো, দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই অসম্ভব নয়। বিশ্বের অনেক দেশ সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে দুর্নীতি কমাতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। প্রথমত, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, সরকারি কার্যক্রমে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, তথ্য অধিকার আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করে জনগণের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। চতুর্থত, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে দুর্নীতিবিরোধী মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—নৈতিকতার পুনর্জাগরণ। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সমাজের প্রতিটি স্তরে সততা ও নৈতিক মূল্যবোধ চর্চা করতে হবে। কারণ দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ গড়ে ওঠে সচেতন ও মূল্যবোধসম্পন্ন নাগরিক সমাজের মাধ্যমে। অতএব, টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সর্বাত্মক সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা জরুরি। উন্নয়নের অগ্রযাত্রা তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা হবে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং ন্যায়ভিত্তিক। দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ কেবল একটি স্বপ্ন নয়—এটি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অপরিহার্য বাস্তবতা।

Leave a Reply