আশিকুর রহমান সবুজ, শ্রীপুর (গাজীপুর):
গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বরমী ইউনিয়নের সাতখামাইর গ্রামে জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে এক বিধবা নারী ও তার ছেলেকে দেশীয় অস্ত্র দিয়ে পিটিয়ে গুরুতর জখম করার অভিযোগ উঠেছে। প্রতিপক্ষের হামলায় আহত মা ও ছেলেকে স্থানীয়রা উদ্ধার করে, শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দিয়েছেন। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবারটি এখন চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে জানা গেছে।
৯ এপ্রিল (বৃহস্পতিবার) দুপুরে উপজেলার সাতখামাইর গ্রামে এ হামলার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী মো. সোলাইমান আকন্দ বাদী হয়ে ১৭ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও ৫-৬ জনকে বিবাদী করে শ্রীপুর মডেল থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, সাতখামাইর গ্রামের মৃত নজরুল ইসলাম আকন্দের ছেলে সোলাইমান আকন্দের সঙ্গে একই এলাকার জামাল উদ্দিন (৫৫), মো. বারেক (৩৫), আনোয়ার (৪০) ও আরিফসহ (২৮) বিবাদীদের দীর্ঘদিন ধরে পৈত্রিক ও ক্রয়কৃত জমি জমা নিয়ে বিরোধ। সোলাইমান আকন্দের দাবি, বিবাদীরা দীর্ঘদিন ধরে তাদের বৈধ মালিকানাধীন জমি দখলের চেষ্টা চালিয়ে আসছে এবং বিভিন্ন সময়ে ভয়ভীতি দেখায়।
দুপুর আনুমানিক ১টা ৩০ মিনিটের দিকে বিবাদীরা দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে হঠাৎ সোলাইমানের মালিকানাধীন জমিতে অনধিকার প্রবেশ করে। তারা কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই জমিতে রোপিত বিভিন্ন প্রজাতির মূল্যবান গাছপালা কাটতে শুরু করে। সংবাদ পেয়ে সোলাইমান ও তার বৃদ্ধা মা মোসা. সাবেরা বেগম (৭০) ঘটনাস্থলে গিয়ে গাছ কাটতে বাধা প্রদান করেন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, গাছ কাটতে বাধা দেওয়ায় বিবাদীরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মা ও ছেলের ওপর চড়াও হয়। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, বিবাদীরা বৃদ্ধা সাবেরা বেগম ও তার ছেলে সোলাইমানকে এলোপাথাড়ি কিল-ঘুষি ও লাঠি দিয়ে পিটিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে মারাত্মক জখম করে।
হামলার এক পর্যায়ে ২নং বিবাদী সোলাইমানকে মাটিতে ফেলে শ্বাসরোধ করে হত্যার চেষ্টা চালায় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এসময় বৃদ্ধা মা তার ছেলেকে বাঁচাতে এগিয়ে এলে ৫নং বিবাদী তার শ্লীলতাহানি করে এবং শাড়ির আঁচল টেনে ছিঁড়ে ফেলে। ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে বিবাদীরা বৃদ্ধার গলায় থাকা প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা মূল্যের একটি স্বর্ণের চেইন ছিনিয়ে নেয়। তাদের ডাক চিৎকারে প্রতিবেশীরা এগিয়ে এলে বিবাদীরা প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।
আহতদের উদ্ধার করে দ্রুত শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করেন। তবে শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাত থাকায় বৃদ্ধা সাবেরা বেগম এখনো অসুস্থ বোধ করছেন বলে স্বজনরা জানিয়েছেন।
ভুক্তভোগী সোলাইমান আকন্দ বলেন, আমাদের বৈধ জমিতে গাছ লাগিয়েছি। বিবাদীরা জোরপূর্বক সেই গাছ কেটে নিয়ে নিচ্ছিল। বাধা দিতে গেলে তারা আমার বৃদ্ধা মাকে মারধর করে। তারা প্রভাবশালী হওয়ায় এখন আমাদের জমি থেকে উচ্ছেদ করার এবং মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দিচ্ছে। আমরা এখন নিজ বাড়িতেই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।”
এদিকে গ্রামের সাধারণ মানুষের মধ্যেও এ ঘটনা নিয়ে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক প্রতিবেশী জানান, প্রকাশ্য দিবালোকে একজন বৃদ্ধা নারীর ওপর এমন হামলা ও শ্লীলতাহানির ঘটনা অত্যন্ত নিন্দনীয়। তারা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
ভুক্তভোগী পরিবারটি ন্যায়বিচারের আশায় শ্রীপুর মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন। পুলিশ বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখছে বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।
এ বিষয়ে শ্রীপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাছির আহমদ বলেন, “সাতখামাইর গ্রামের জমি সংক্রান্ত বিরোধের একটি লিখিত অভিযোগ আমরা পেয়েছি। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করার জন্য একজন কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে হামলার সত্যতা পাওয়া গেলে এবং অভিযোগের অন্যান্য বিষয়গুলো প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশ তৎপর রয়েছে।”
বরমী ইউনিয়নের এই অঞ্চলে জমি জমা নিয়ে বিরোধের ঘটনা ইদানীং বৃদ্ধি পেয়েছে। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, তুচ্ছ ঘটনা থেকে শুরু করে বড় ধরণের সংঘর্ষ দমনে স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন। বিশেষ করে বিধবা ও অসহায় পরিবারগুলোর অধিকার রক্ষায় কঠোর আইন প্রয়োগ না হলে এ ধরণের অপরাধপ্রবণতা আরও বাড়তে পারে।
বর্তমানে ভুক্তভোগী পরিবারটি থানা পুলিশের তদন্তের দিকে তাকিয়ে আছেন। তাদের দাবি, পুলিশ যেন নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দ্রুত আসামিদের আইনের আওতায় আনে, যাতে তারা নিজেদের জমিতে শান্তিতে বসবাস করতে পারেন।

Leave a Reply