নজমুল হক, স্টাফ রিপোর্টার গাজীপুর
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। পরিসংখ্যান বলছে, প্রাথমিক স্তরে ভর্তির হার ৯৬ শতাংশের বেশি হলেও শিক্ষার গুণগত মান, শিক্ষার্থীর দক্ষতা, শিক্ষক সংকট এবং শ্রেণিকক্ষের বাস্তব চিত্র উদ্বেগজনক। সংখ্যার সাফল্য গুণগত অগ্রগতির নিশ্চয়তা দেয় না—এই বাস্তবতাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রথমত, শিক্ষার্থীদের শেখার সক্ষমতা নিয়ে বড় ধরনের সংকট বিদ্যমান। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মূল্যায়নে দেখা গেছে, তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মাত্র ৫১ শতাংশ বাংলা এবং ৩৯ শতাংশ গণিতে প্রত্যাশিত দক্ষতা অর্জন করতে পারে। পঞ্চম শ্রেণিতে এই হার আরও কমে গণিতে প্রায় ৩০ শতাংশে নেমে আসে। একইভাবে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ইংরেজি ও গণিতে দুর্বল শিক্ষার্থীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। এটি প্রমাণ করে যে, শিক্ষার্থীরা শ্রেণি উত্তীর্ণ হলেও বাস্তব দক্ষতায় পিছিয়ে পড়ছে।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি বড় একটি সমস্যা। সরকারি সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রাথমিক স্তরে উপস্থিতি ৭৫–৮০ শতাংশ হলেও মাধ্যমিকে তা কমে ৬০–৬৫ শতাংশে নেমে আসে। অর্থনৈতিক চাপ, শিশুশ্রম, সামাজিক প্রতিবন্ধকতা এবং বিদ্যালয়ের দূরত্ব—এসব কারণে অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতে পারে না। এর ফলে শিক্ষার ধারাবাহিকতা ভেঙে যায় এবং ঝরে পড়ার হার বাড়ে।
তৃতীয়ত, শিক্ষক সংকট ও দক্ষতার অভাব শিক্ষার মানকে সরাসরি প্রভাবিত করছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নেই, আবার অনেক শিক্ষক পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নন। ফলে শ্রেণিকক্ষে কার্যকর পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। বাস্তবতা হলো, অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ের চেয়ে কোচিং বা গৃহশিক্ষকের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এতে শিক্ষাব্যবস্থার মূল কাঠামো দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।
চতুর্থত, শ্রেণিকক্ষের অবকাঠামোগত সংকট একটি বড় বাধা। অনেক বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ নেই, অতিরিক্ত শিক্ষার্থী নিয়ে ক্লাস পরিচালিত হচ্ছে। কোথাও বেঞ্চ-ডেস্কের অভাব, কোথাও প্রযুক্তির অনুপস্থিতি—এসব কারণে আধুনিক শিক্ষার পরিবেশ তৈরি হচ্ছে না। গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রামীণ অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী-শিক্ষক অনুপাত অত্যন্ত বেশি, যা কার্যকর শিক্ষাদানে বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।
পঞ্চমত, পাঠাভ্যাস ও ভাষাগত দক্ষতার অবনতি উদ্বেগজনক। বিশেষজ্ঞদের মতে, পাঠ্যবই, শিক্ষক এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণে শিশুদের মৌলিক পাঠ দক্ষতা গড়ে উঠছে না। এর ফলে তারা শুধু পরীক্ষাভিত্তিক শিক্ষা অর্জন করছে, কিন্তু বাস্তব জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে।এই বহুমাত্রিক সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ।
প্রথমত, শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা চালু করতে হবে। কেবল মুখস্থনির্ভর পরীক্ষা পদ্ধতি পরিবর্তন করে বিশ্লেষণধর্মী ও সৃজনশীল শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণে বিপ্লব ঘটাতে হবে। বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষক নিশ্চিত করা এবং নিয়মিত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের আধুনিক শিক্ষণ পদ্ধতিতে অভ্যস্ত করতে হবে। শিক্ষককে শুধু পাঠদাতা নয়, বরং শেখার সহায়ক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
তৃতীয়ত, শ্রেণিকক্ষের অবকাঠামো উন্নয়ন জরুরি। প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, ডিজিটাল কনটেন্ট এবং ইন্টারেক্টিভ ক্লাসরুম চালু করতে হবে। গ্রামীণ ও শহুরে শিক্ষার বৈষম্য কমাতে বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
চতুর্থত, শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি জোরদার করতে হবে। দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য উপবৃত্তি, স্কুল মিল এবং পরিবহন সুবিধা বাড়ানো যেতে পারে।
পঞ্চমত, শিক্ষা ব্যবস্থায় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক এবং প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে নিয়মিত মনিটরিং চালু করা জরুরি।
সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনের সংকট কোনো একক কারণে সৃষ্টি হয়নি; এটি একটি সমন্বিত ব্যর্থতার ফল। তাই এর সমাধানও হতে হবে সমন্বিত। শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও শ্রেণিকক্ষ—এই তিনটি স্তম্ভকে শক্তিশালী না করলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। এখনই সময় বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিয়ে শিক্ষাকে সত্যিকার অর্থে মানবসম্পদ উন্নয়নের শক্তিশালী হাতিয়ারে পরিণত করার।

Leave a Reply