স্টাফ রিপোর্টার
প্রকৃতিগত সৌন্দর্যের আধার সুন্দরবনের গহীন অরণ্যে আবারও দস্যুবাহিনীর অশুভ ছায়া দীর্ঘতর হচ্ছে। দীর্ঘ কয়েক বছরের স্থিতিশীলতা ভেঙে নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে একাধিক বনদস্যু বাহিনী। দস্যুবাহিনীর এই আকস্মিক সক্রিয়তায় উপকূলীয় অঞ্চলের বনজীবী ও শ্রমজীবী মানুষের মাঝে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে বর্তমান মধুর মৌসুমকে কেন্দ্র করে দস্যুদের বেপরোয়া চাঁদাবাজি ও নির্যাতনে বিপন্ন হয়ে পড়েছে হাজারো মানুষের জীবিকা।
প্রতি বছর মার্চ-এপ্রিল মাসে সুন্দরবনে মধুর মৌসুম শুরু হয়। কিন্তু এবারের চিত্র ভিন্ন। বনের গহীন থেকে মধু আহরণকারী মৌয়ালরা এবার প্রাণের ভয়ে বনে প্রবেশ করতে সাহস পাচ্ছেন না। মৌয়ালদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বনদস্যুরা একেকটি নৌকায় এক থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত চাঁদা দাবি করছে। যা সাধারণ মৌয়ালদের পক্ষে পরিশোধ করা অসম্ভব। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাতক্ষীরা রেঞ্জের এক মৌয়াল জানান, “বাপ-দাদার আমল থেকে বনে যাই, কিন্তু এবারের মতো অনিশ্চয়তা আগে দেখিনি। দস্যুদের টাকা না দিলে জীবন নিয়ে ফেরার নিশ্চয়তা নেই।” শুধু মৌয়াল নয়, সুন্দরবনের নদ-নদীতে মাছ ও কাঁকড়া আহরণকারী জেলে এবং বাওয়ালীরাও চরম উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন।
গত কয়েক বছরে প্রশাসনের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ও দস্যু দমনে সাফল্যের ফলে সুন্দরবনে যে শান্তি ফিরে এসেছিল, বিগত এক বছরে তা ম্লান হতে শুরু করেছে। জেলেরা অভিযোগ করেছেন, বর্তমানে দস্যুরা কেবল অর্থ আদায় করেই ক্ষান্ত হচ্ছে না, বরং অবর্ণনীয় শারীরিক নির্যাতনও চালাচ্ছে।
তদন্তে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। গত ৭ এপ্রিল সুন্দরবন সাতক্ষীরা রেঞ্জ এলাকার কলাগাছিয়ায় আতিয়ার রহমান নামে এক কাঁকড়া জেলে গুলিবিদ্ধ হন। স্থানীয় সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, ‘মজনু-আলিফ বাহিনী’ এই তাণ্ডব চালায়। তবে নিজেদের অপরাধ আড়াল করতে তারা পরিকল্পিতভাবে ‘ছোট জাহাঙ্গীর বাহিনী’র নাম ছড়িয়ে দিচ্ছে। এই ধরনের ‘আইডেন্টিটি ক্রাইসিস’ বা পরিচয় বিভ্রাট তৈরি করে দস্যুরা প্রশাসনকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, মজনু বাহিনী ওই নির্দিষ্ট এলাকাটি নিয়ন্ত্রণ করে এবং তাদের অত্যাচার থেকে বাঁচতে অনেক জেলে বাধ্য হয়ে এলাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন।
সাধারণ জেলেদের বর্ণনায় ছোট জাহাঙ্গীর বাহিনীর আচরণ তুলনামূলক নমনীয় হলেও মজনু বাহিনীর অত্যাচার চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। অনেক জেলে জানান, ছোট জাহাঙ্গীর বাহিনী টাকা পেলে সাধারণত নির্যাতন চালায় না, কিন্তু মজনু বা আলিফ বাহিনীর মতো গ্রুপগুলো টাকা নিয়েও জেলেদের ওপর পাশবিক নির্যাতন চালায়। দস্যু আতঙ্কের কারণে গত বছরের তুলনায় এ বছর সুন্দরবনে মধু আহরণকারীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। জেলেরা বলছেন, বনদস্যুদের সাথে অর্থের বিনিময়ে সমঝোতা করতে পারলে তবেই গহীন বনে যাওয়ার সুযোগ মিলবে, অন্যথায় মৃত্যু অবধারিত।
দস্যুতার এই বিস্তারে কেবল বনজীবীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না, সংকটে পড়ছে জাতীয় অর্থনীতিও। সুন্দরবন থেকে আহরিত মধু, মোম, মাছ ও কাঁকড়া সরকারের জন্য বড় একটি রাজস্ব আয়ের উৎস। বনজীবীরা বনে যেতে না পারলে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাবে। অন্যদিকে, দস্যুদের দাপটে বনের প্রাকৃতিক ভারসাম্যও নষ্ট হচ্ছে, কারণ তারা অবৈধভাবে গহীন বনের ভেতর আস্তানা গেঁড়ে বন্যপ্রাণী শিকার ও বনজ সম্পদ পাচারে জড়িয়ে পড়ছে।
বন বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে, সুন্দরবনের নিরাপত্তা নিশ্চিতে তারা সর্বোচ্চ সজাগ রয়েছে। দস্যু দমনে বন রক্ষীদের পাশাপাশি কোস্ট গার্ড ও নৌ-পুলিশের টহল জোরদার করা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বনজীবীদের অভয় দিয়ে বলা হচ্ছে যে, জানমালের নিরাপত্তা দিতে সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তবে সাধারণ বনজীবীদের দাবি কেবল টহল দিলেই হবে না। তাদের মতে, লোকদেখানো টহলের ফাঁক গলে দস্যুরা গহীন বনে পালিয়ে থাকে। তাই দস্যুদের স্থায়ী আস্তানাগুলো চিহ্নিত করে সেখানে ‘বিশেষ কমান্ডো অভিযান’ পরিচালনা করা জরুরি। অন্যথায় বনের ওপর নির্ভরশীল হাজার হাজার পরিবার অনাহারে দিন কাটাবে এবং উপকূলীয় অর্থনীতিতে ধস নামবে।
সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত রেখে সাধারণ মেহনতি মানুষের কাজের পরিবেশ ফিরিয়ে আনাই এখন এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

Leave a Reply