গাজীপুরে জমির ‘ওয়ারিশ’ দাবির আড়ালে চাঁদাবাজির অভিযোগ: দখলচেষ্টায় আতঙ্কে ভুক্তভোগী পরিবার

গাজীপুরে জমির ‘ওয়ারিশ’ দাবির আড়ালে চাঁদাবাজির অভিযোগ: দখলচেষ্টায় আতঙ্কে ভুক্তভোগী পরিবার

মোঃ নাসির উদ্দিন, গাজীপুর জেলা প্রতিনিধি

গাজীপুর: গাজীপুর মহানগরীর বাসন থানাধীন এলাকায় পৈত্রিক সূত্রের ‘ওয়ারিশ’ দাবিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ভয়ভীতি প্রদর্শন, জমি জবরদখল এবং মোটা অংকের চাঁদাবাজির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে একটি চক্রের বিরুদ্ধে। এই ঘটনায় ভুক্তভোগী মোঃ হারুন বাসন মেট্রো থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। ঘটনার পর থেকে এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গাজীপুর মহানগরের ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের ইটাহাটা মৌজায় অবস্থিত একটি পৈত্রিক ও ক্রয়কৃত জমি দীর্ঘকাল ধরে বৈধভাবে ভোগদখল করে আসছেন স্থানীয় বাসিন্দা মোঃ হারুন। জমির নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, উক্ত জমিটি তার নামে যথাযথভাবে নামজারি (মিউটেশন) করা রয়েছে এবং তিনি নিয়মিতভাবে সরকারি ভূমি উন্নয়ন কর বা খাজনা পরিশোধ করে আসছেন। অর্থাৎ, আইনগতভাবে জমির মালিকানা ও দখল নিয়ে কোনো অস্পষ্টতা নেই।

তবে সম্প্রতি একটি স্বার্থান্বেষী মহল কোনো বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই হঠাৎ করে নিজেদের ওই জমির ‘ওয়ারিশ’ দাবি করে সেখানে অনধিকার প্রবেশ করে। অভিযোগ উঠেছে, তারা কোনো ধরনের সালিশ-বৈঠক বা আইনি প্রক্রিয়ার তোয়াক্কা না করে সরাসরি পেশ পেশীবল ব্যবহার করে জমিটি দখলের পাঁয়তারা করছে।

ভুক্তভোগী হারুন জানান, তিনি যখন তার জমিতে সীমানা প্রাচীর বা উন্নয়নমূলক কাজ শুরু করেন, তখন অভিযুক্তরা দলবল নিয়ে এসে কাজে বাধা প্রদান করে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, অভিযুক্তরা দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে সেখানে উপস্থিত হয় এবং নির্মাণ শ্রমিকদের কাজ বন্ধ করতে বাধ্য করে। একপর্যায়ে তারা হারুন ও তার পরিবারের সদস্যদের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে এবং প্রাণে মারার হুমকি দেয়।

অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, চক্রটি উক্ত জমিতে কাজ চালিয়ে যেতে হলে মোটা অংকের চাঁদা দাবি করে। চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় তারা জোরপূর্বক টিনের বেড়া দিয়ে জমিটি ঘিরে ফেলার চেষ্টা চালায় এবং সেখানে থাকা মূল্যবান নির্মাণ সামগ্রী সরিয়ে নিতে চরম চাপ প্রয়োগ করে।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে ভুক্তভোগী মোঃ হারুন বলেন:

“আমি আইন মেনে জমি ক্রয় করে এবং পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া অংশে শান্তিতে বসবাস ও ভোগদখল করছি। আমার কাছে জমির সব বৈধ দলিল ও খাজনা রসিদ আছে। কিন্তু হঠাৎ করে কিছু ভূমিদস্যু প্রকৃতির লোক নিজেদের ওয়ারিশ দাবি করে আমার দীর্ঘদিনের বসতভিটা ও জমি দখলের চেষ্টা করছে। তারা শুধু জমি দখলই নয়, আমাকে ও আমার পরিবারকে এলাকা ছাড়া করার হুমকি দিচ্ছে। বর্তমানে আমি চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি এবং প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।”

এ বিষয়ে বাসন মেট্রো থানা পুলিশের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, মোঃ হারুনের পক্ষ থেকে একটি লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। পুলিশ প্রাথমিক তদন্ত শুরু করেছে। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, “আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কারো নেই। যদি কেউ নিজেদের ওয়ারিশ দাবি করে, তবে তার জন্য আইনি পথ খোলা আছে। জোরপূর্বক দখল বা চাঁদাবাজির অভিযোগ প্রমাণিত হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

ইটাহাটা এলাকার স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এই ধরনের ‘ওয়ারিশ’ নাটকের আড়ালে জমি দখল ও চাঁদাবাজি গাজীপুরের কিছু এলাকায় নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। একটি সংঘবদ্ধ চক্র সাধারণ মানুষের সরলতার সুযোগ নিয়ে বা জাল কাগজপত্র তৈরি করে জমি বিবাদে জড়িয়ে পড়ে এবং পরবর্তীতে মোটা অংকের টাকা দাবি করে। স্থানীয় সচেতন মহল দ্রুত তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন যাতে ভবিষ্যতে কেউ অন্যের বৈধ জমি দখলের সাহস না পায়।

জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ থাকতেই পারে, তবে তা নিষ্পত্তির জন্য দেশের প্রচলিত আইন ও আদালত রয়েছে। কিন্তু যেভাবে ‘ওয়ারিশ’ দাবি করে জবরদখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে, তা উদ্বেগজনক। ভুক্তভোগী মোঃ হারুন এখন সুবিচারের আশায় প্রশাসনের দিকে তাকিয়ে আছেন। এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এই ভূমিদস্যু চক্রকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published.