হুজ হু বাংলাদেশ-২০২৬’ সম্মাননায় ভূষিত গাজীপুর‌ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ড. মোস্তাফিজুর রহমান

হুজ হু বাংলাদেশ-২০২৬’ সম্মাননায় ভূষিত গাজীপুর‌ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ড. মোস্তাফিজুর রহমান

নজমুল হক, স্টাফ রিপোর্টার গাজীপুর:

​বাংলাদেশের কৃষি শিক্ষা ও মৃত্তিকা বিজ্ঞানের জগতে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (গাকৃবি)-এর ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. জিকেএম মোস্তাফিজুর রহমান আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মর্যাদাপূর্ণ ‘হুজ হু বাংলাদেশ-২০২৬’ সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। কৃষি ও মৃত্তিকা বিজ্ঞানে তাঁর দীর্ঘ তিন দশকের নিরলস গবেষণা, উদ্ভাবন এবং অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে এই বিশেষ পদকে ভূষিত করা হয়। এই অর্জন কেবল তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং বাংলাদেশের কৃষি গবেষণা ও টেকসই উন্নয়নের বৈশ্বিক স্বীকৃতির এক অনন্য দলিল।

​গত ১৮ এপ্রিল (শনিবার) রাজধানীর বনানীর অভিজাত হোটেল শেরাটনের বলরুমে এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী প্রফেসর ড. মোস্তাফিজুর রহমানের হাতে এই সম্মাননা স্মারক ও প্রশংসাপত্র তুলে দেন।

​অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ও গুণীজনদের উপস্থিতিতে এক আনন্দঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। কৃষি, শিক্ষা, শিল্প, সাংবাদিকতা ও সাহিত্যসহ মোট ১২টি ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখা দেশের ১২ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে এ বছর ‘হুজ হু বাংলাদেশ’ সম্মাননা প্রদান করা হয়। পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে ‘হুজ হু বাংলাদেশ’-এর প্রধান নির্বাহী নাজিনুর রহিম এবং সম্পাদক লুৎফুন নাহার তাপসীসহ দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের নীতিনির্ধারক ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।

​প্রফেসর ড. জিকেএম মোস্তাফিজুর রহমানের সাফল্যের পথ মোটেও সহজ ছিল না। তিনি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮৮ সালে কৃষিতে স্নাতক এবং ১৯৯৩ সালে মৃত্তিকা বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। তাঁর মেধা ও গবেষণার প্রতি আগ্রহ তাঁকে নিয়ে যায় বিদেশের মাটিতে। জাপানের বিখ্যাত চিবা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০০০ সালে তিনি পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।

​২০০৪ সালে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন এবং মাত্র চার বছরের মাথায় ২০০৮ সালে অধ্যাপক পদে উন্নীত হন। তাঁর কর্মজীবনের সিংহভাগ সময় ব্যয় হয়েছে মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের গবেষণায়।

​ড. মোস্তাফিজুর রহমানের গবেষণা কেবল দেশের সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA) এবং বিভিন্ন বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের আমন্ত্রণে তিনি একাধিকবার বিদেশে উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। তাঁর গবেষণার মান ও গভীরতা বিবেচনা করে ‘চায়নিজ একাডেমি অব সায়েন্সেস’ এবং ‘কিং আবদুল আজিজ সিটি ফর সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি’ তাঁকে সম্মানজনক ফেলোশিপ প্রদান করে।

​বর্তমানে তিনি ইউএসডিএ (USDA), ড্যানিডা (DANIDA), ইউএসএইড (USAID) এবং বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তাঁর গবেষণার মূল বিষয়বস্তু হলো জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা এবং পরিবেশ দূষণ রোধ করে টেকসই কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা। বিশ্ব র‍্যাঙ্কিংয়ে তিনি একজন শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞানী হিসেবে স্বীকৃত। বিশেষ করে ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত টানা ছয় বছর তিনি গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও দেশের সেরা পাঁচজন কৃষি ও পরিবেশ বিজ্ঞানীদের তালিকায় নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন।

​এই গৌরবময় অর্জনের পর এক প্রতিক্রিয়ায় ভাইস-চ্যান্সেলর ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন:

​”এই সম্মাননা শুধু আমার ব্যক্তিগত প্রাপ্তি নয়, এটি বাংলাদেশের লড়াকু কৃষক, নিবেদিতপ্রাণ গবেষক এবং সামগ্রিক জ্ঞানচর্চার প্রতি একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। আমি ‘হুজ হু বাংলাদেশ’ কর্তৃপক্ষের প্রতি কৃতজ্ঞ। এই পদক আমার দায়িত্ববোধকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আমি বিশ্বাস করি, জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গবেষণাভিত্তিক টেকসই কৃষি উন্নয়নই আমাদের ভবিষ্যৎ রক্ষাকবচ। আমরা একটি সবুজ, নিরাপদ ও টেকসই বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে যাব।”

​উল্লেখ্য, ‘হুজ হু’ (Who’s Who) একটি দীর্ঘ ইতিহাস সমৃদ্ধ প্রতিষ্ঠান। ১৮৪৯ সাল থেকে যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গুণীজনদের জীবনগাঁথা সংরক্ষণ ও তাঁদের অবদানকে মর্যাদার সঙ্গে স্বীকৃতি দেওয়ার এই ঐতিহ্য চলে আসছে। বাংলাদেশে ২০১৬ সাল থেকে প্রতি দুই বছর অন্তর এই সম্মাননা প্রদান করা হচ্ছে।

​এই আয়োজনের মূল লক্ষ্য হলো—যাঁরা নীরবে সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছেন, তাঁদের স্বীকৃতি দিয়ে নতুন প্রজন্মের সামনে রোল মডেল হিসেবে তুলে ধরা। এর মাধ্যমে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের ধারা জাগ্রত করা এবং তরুণদের মধ্যে মূল্যবোধ, সৃজনশীলতা ও মানবিকতার বীজ বপন করা সম্ভব হয়। ড. মোস্তাফিজুর রহমানের এই স্বীকৃতি দেশের তরুণ কৃষি বিজ্ঞানীদের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞগণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.