
নজমুল হক গাজীপুর
বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার বিস্তার ঘটেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে। শিক্ষার সুযোগও বেড়েছে। এটি অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার মান কি একই হারে বাড়ছে? বাংলাদেশে সরকারি, বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় মিলিয়ে ১৭৭টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে—এমন হিসাব বর্তমানে বহুল ব্যবহৃত হচ্ছে। এর মধ্যে সরকারি ৫৮টি, বেসরকারি ১১৭টি এবং আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় ২টি। সংখ্যার বিচারে এটি নিঃসন্দেহে বড় অগ্রগতি। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা কোনো দেশের উচ্চশিক্ষার মানের সরাসরি মাপকাঠি নয়। একটি বিশ্ববিদ্যালয় মানসম্পন্ন হওয়ার জন্য শুধু ভবন দরকার হয় না। দরকার যোগ্য শিক্ষক। দরকার আধুনিক ল্যাবরেটরি। দরকার সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার। দরকার গবেষণার পরিবেশ। দরকার পর্যাপ্ত অর্থায়ন। দরকার শিল্প ও কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে সংযোগ। সবচেয়ে বেশি দরকার একাডেমিক স্বাধীনতা ও জবাবদিহি। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখানেই। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা তুলনামূলক সহজ। কিন্তু একটি মানসম্মত বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা কঠিন। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামের সঙ্গে ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ শব্দটি যুক্ত হলেই সেটি বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান হয়ে যায় না।
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার পরিধি বাড়ার পেছনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ভূমিকা রয়েছে। ১৯৯২ সালে দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়। এরপর কয়েক দশকে এই খাত দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে। ফলে উচ্চশিক্ষায় আসন বেড়েছে। রাজধানীর বাইরে শিক্ষার সুযোগও কিছুটা বিস্তৃত হয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন নতুন বিষয় পড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু দ্রুত সম্প্রসারণের সঙ্গে মান নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নও জোরালো হয়েছে। ইউজিসির বিভিন্ন উদ্যোগ থেকেই বোঝা যায়, মান নিশ্চিতকরণ এখন উচ্চশিক্ষা নীতির কেন্দ্রীয় বিষয়। হায়ার এডুকেশন এক্সিলারেশন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন বা HEAT প্রকল্পের আওতায় দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে Institutional Quality Assurance Cell বা IQAC শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর লক্ষ্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একটি স্থায়ী মান-সংস্কৃতি গড়ে তোলা। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। কারণ মান নিশ্চিত করা শুধু পরীক্ষার ফল দিয়ে সম্ভব নয়। শিক্ষার্থীরা কী শিখছে, কীভাবে শিখছে এবং সেই শিক্ষা কর্মক্ষেত্রে কতটা কাজে লাগছে—এসবই বিবেচনায় নিতে হবে।আমাদের উচ্চশিক্ষার আরেকটি বড় দুর্বলতা গবেষণা। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান পরিচয় গবেষণা ও জ্ঞান সৃষ্টি। কিন্তু অনেক প্রতিষ্ঠানে গবেষণা এখনো পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায় না। গবেষণার জন্য অর্থ বরাদ্দ কম। আধুনিক গবেষণাগার সীমিত। আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশনার সুযোগও অনেক ক্ষেত্রে সীমিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি গবেষণার মান না বাড়ালে আমরা মূলত সনদ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়াব। জ্ঞান উৎপাদনের সক্ষমতা নয়। এখানে শিক্ষক নিয়োগের প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ শিক্ষক। যোগ্য শিক্ষক ছাড়া কোনো বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘমেয়াদে ভালো করতে পারে না। কিন্তু শিক্ষক নিয়োগে যদি মেধার বদলে অন্য কোনো বিবেচনা প্রাধান্য পায়, তাহলে প্রতিষ্ঠানের ভিত দুর্বল হয়।
শিক্ষকদের শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করলেই হবে না। তাঁদের গবেষণা করতে হবে। আন্তর্জাতিক গবেষণার সঙ্গে যুক্ত হতে হবে। নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করতে হবে। শিক্ষার্থীদের সমালোচনামূলক চিন্তা করতে শেখাতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নির্ধারণে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাতও গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত শিক্ষার্থী এবং অপর্যাপ্ত শিক্ষক মানসম্মত পাঠদানকে কঠিন করে তোলে। একইভাবে পর্যাপ্ত ল্যাব, লাইব্রেরি, আবাসন, প্রযুক্তি ও শিক্ষার্থী সহায়তা না থাকলে শুধু নতুন ক্যাম্পাস তৈরি করে মান নিশ্চিত করা যায় না।আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পাঠ্যক্রম। আজকের পৃথিবী বদলে গেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস, ডেটা সায়েন্স, সাইবার নিরাপত্তা, সবুজ প্রযুক্তি এবং জৈবপ্রযুক্তি দ্রুত বদলে দিচ্ছে কর্মক্ষেত্র। অথচ অনেক ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম এখনো বাস্তব কর্মবাজারের চাহিদার সঙ্গে পুরোপুরি তাল মেলাতে পারেনি। ফলে একটি বড় বৈপরীত্য তৈরি হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছে। কিন্তু তাঁদের একটি অংশ কাঙ্ক্ষিত চাকরি পাচ্ছে না। অন্যদিকে শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দক্ষ কর্মী খুঁজে পাচ্ছে না। এটি শুধু বেকারত্বের সমস্যা নয়। এটি শিক্ষার মানেরও প্রশ্ন। একজন শিক্ষার্থী চার বছর বা তার বেশি সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লেন। কিন্তু যদি তিনি যোগাযোগ করতে না পারেন, সমস্যা সমাধান করতে না পারেন, প্রযুক্তি ব্যবহার করতে না পারেন, দলগতভাবে কাজ করতে না পারেন এবং বাস্তব সমস্যার সমাধান দিতে না পারেন, তাহলে তাঁর ডিগ্রির মূল্য নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। তাই এখন সময় এসেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দিয়ে সাফল্য মাপার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার। আমাদের জানতে হবে—কত বিশ্ববিদ্যালয় আছে, সেটি নয়। বরং কত বিশ্ববিদ্যালয় ভালো করছে, সেটি। কতজন শিক্ষার্থী ভর্তি হচ্ছে, সেটি নয়। কতজন শিক্ষার্থী মানসম্মত শিক্ষা পাচ্ছে, সেটি। কতজন শিক্ষক আছেন, সেটি নয়। কতজন শিক্ষক গবেষণা করছেন, সেটি। কতটি বিভাগ আছে, সেটি নয়। কতটি বিভাগ আন্তর্জাতিক ও জাতীয় কর্মবাজারের উপযোগী দক্ষতা তৈরি করছে, সেটি। কতটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছে, সেটি নয়। কতটি বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান ও উদ্ভাবনের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে, সেটি। এই জায়গায় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও অ্যাক্রেডিটেশনও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার মান উন্নয়নে বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল এবং বিভিন্ন মান নিশ্চিতকরণ কাঠামো নিয়ে কাজ চলছে। HEAT প্রকল্পেও বিশ্ববিদ্যালয় ও একাডেমিক প্রোগ্রামের self-assessment, external peer review এবং accreditation-এর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এখন প্রয়োজন এই ব্যবস্থাকে কাগজে সীমাবদ্ধ না রাখা।
প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত মান মূল্যায়ন হওয়া দরকার। ফলাফল প্রকাশ করা দরকার। কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত কত, গবেষণা কত, গবেষণা ব্যয় কত, আন্তর্জাতিক প্রকাশনা কত, ল্যাব সুবিধা কেমন, স্নাতকদের কর্মসংস্থান কত—এসব তথ্য জনগণের সামনে থাকা উচিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাংকিংও শুধু নামের প্রতিযোগিতা হওয়া উচিত নয়। গবেষণা, শিক্ষার মান, উদ্ভাবন, কর্মসংস্থান, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং সামাজিক অবদানের ভিত্তিতে মূল্যায়ন হওয়া উচিত। একই সঙ্গে দুর্বল বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য উন্নয়ন পরিকল্পনা থাকতে হবে। প্রয়োজন হলে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের আগে বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মানোন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় শুধু চাকরির সনদ দেওয়ার প্রতিষ্ঠান নয়। এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরি করে। এটি বিজ্ঞানী তৈরি করে। শিক্ষক তৈরি করে। উদ্যোক্তা তৈরি করে। প্রশাসক তৈরি করে। গবেষক তৈরি করে। চিন্তাবিদ তৈরি করে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা যত বাড়বে, দায়িত্বও তত বাড়বে। বাংলাদেশ এখন জনসংখ্যাগত ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তরুণ জনগোষ্ঠী আমাদের বড় সম্পদ। কিন্তু তরুণদের দক্ষ করে তুলতে না পারলে এই জনসংখ্যা সম্পদ না হয়ে বোঝায় পরিণত হতে পারে। উচ্চশিক্ষার মূল লক্ষ্য তাই শুধু বেশি মানুষকে বিশ্ববিদ্যালয়ে নেওয়া নয়। তাঁদের যোগ্য মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা।
১৭৭টি বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের জন্য একটি সম্ভাবনার সংখ্যা। এটি গর্বের বিষয় হতে পারে। কিন্তু এটি আত্মতুষ্টির কারণ হতে পারে না। আমাদের এখন প্রশ্ন বদলাতে হবে। ‘কতটি বিশ্ববিদ্যালয়?’—এই প্রশ্নের পাশাপাশি বলতে হবে, ‘কতটি মানসম্মত বিশ্ববিদ্যালয়?’ ‘কতজন গ্র্যাজুয়েট?’—এর পাশাপাশি প্রশ্ন করতে হবে, ‘কতজন দক্ষ গ্র্যাজুয়েট?’ ‘কতটি বিভাগ?’—এর পাশাপাশি জানতে হবে, ‘কতটি বিভাগ নতুন জ্ঞান তৈরি করছে?’ বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ সংখ্যার ওপর নয়। মানের ওপর নির্ভর করবে। বিশ্ববিদ্যালয় বাড়ুক। কিন্তু মানের বিনিময়ে নয়। নতুন প্রতিষ্ঠান হোক। কিন্তু সনদ কারখানা নয়। শিক্ষার্থী বাড়ুক। কিন্তু শুধু ডিগ্রিধারী নয়, দক্ষ নাগরিক তৈরি হোক। শেষ পর্যন্ত একটি দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শক্তি তার সংখ্যায় নয়। তার জ্ঞান, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং মানবসম্পদ তৈরির সক্ষমতায়। বাংলাদেশের সামনে এখন তাই একটাই বড় লক্ষ্য হওয়া উচিত—বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা নয়, বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ানো।

Leave a Reply