জুলাইয়ের স্বপ্ন বাস্তবায়নের দায়িত্ব সরকারের: প্রফেসর ড. মোঃ আবু তালেব

জুলাইয়ের স্বপ্ন বাস্তবায়নের দায়িত্ব সরকারের: প্রফেসর ড. মোঃ আবু তালেব

নজমুল হক গাজীপুর


বাংলাদেশের ইতিহাসে নানা সংকট ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র ও সমাজ এগিয়ে এসেছে। সেই ধারাবাহিকতায় “জুলাই” এক প্রতীক—প্রতিরোধ, ত্যাগ এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারের প্রতীক। যে স্বপ্ন ও প্রত্যাশা নিয়ে সাহসী মানুষ ফ্যাসিবাদী প্রবণতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল, তা শুধু একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্য নয়; বরং একটি সুশাসিত, বৈষম্যহীন ও গণমুখী রাষ্ট্র গঠনের জন্য। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা আজ সরকারের পবিত্র দায়িত্ব। বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের অনেক সূচকে অগ্রগতি অর্জন করেছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে গড় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬–৭ শতাংশের মধ্যে অবস্থান করেছে। দারিদ্র্যের হার ২০০০ সালে প্রায় ৪৮ শতাংশ থেকে কমে বর্তমানে প্রায় ১৮–২০ শতাংশে নেমে এসেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৫ হাজার মেগাওয়াট থেকে বেড়ে ২৫ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হয়েছে। এসব অর্জন নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে প্রশ্ন হলো—এই উন্নয়নের সুফল কি সমাজের সকল স্তরে সমভাবে পৌঁছেছে?


বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, আয় বৈষম্য ক্রমশ বাড়ছে। গিনি সহগ ০.৩৬ থেকে বেড়ে ০.৪০-এর কাছাকাছি পৌঁছেছে, যা সামাজিক বৈষম্যের গভীরতাকে নির্দেশ করে। একই সঙ্গে শিক্ষিত বেকারত্ব একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, প্রতি বছর প্রায় ৭–৮ লাখ শিক্ষিত তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও তাদের একটি বড় অংশ কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছে না। বর্তমানে দেশে সরকারি, বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১৭৮ হলেও গুণগত শিক্ষার অভাব এবং দক্ষতার ঘাটতি এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে। এখানেই জুলাইয়ের স্বপ্নের সঙ্গে বাস্তবতার সংঘাত স্পষ্ট হয়। যে লড়াইটি ছিল বৈষম্যহীন সমাজ, আইনের শাসন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য—সেই লক্ষ্য অর্জনে এখনও অনেক পথ বাকি। দুর্নীতি, রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক জটিলতা এবং জবাবদিহিতার অভাব—এই চারটি বড় বাধা আজও উন্নয়নের গতিকে বাধাগ্রস্ত করছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান এখনও সন্তোষজনক নয়, যা রাষ্ট্রের কাঠামোগত দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়।


সরকারের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—উন্নয়নকে শুধু অবকাঠামোগত অগ্রগতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রূপ দেওয়া। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক নিরাপত্তা—এই চারটি খাতেই কার্যকর সংস্কার জরুরি। বিশেষ করে বৃত্তিমূলক ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার প্রসার ছাড়া বেকারত্ব সমস্যার টেকসই সমাধান সম্ভব নয়। বর্তমানে দেশে কারিগরি শিক্ষায় অংশগ্রহণের হার মোট শিক্ষার্থীর মাত্র ১৪–১৫ শতাংশ, যেখানে উন্নত দেশগুলোতে এটি ৫০ শতাংশের বেশি।একইভাবে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্তিশালীকরণও অপরিহার্য। জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে হলে প্রশাসনে স্বচ্ছতা, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করতে হবে। কারণ, যে চেতনা থেকে জুলাইয়ের প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল, তার মূল ভিত্তিই ছিল স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের দাবি।


অতএব, জুলাইয়ের স্বপ্ন কেবল একটি স্মৃতি বা রাজনৈতিক স্লোগান নয়; এটি একটি জাতীয় অঙ্গীকার। সেই অঙ্গীকার পূরণে সরকারকে দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কার্যকর নীতি এবং জবাবদিহিতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। উন্নয়নের পরিসংখ্যান তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনবে—যখন একজন তরুণ তার যোগ্যতার ভিত্তিতে কাজ পাবে, একজন কৃষক তার উৎপাদনের ন্যায্য মূল্য পাবে, এবং একজন সাধারণ নাগরিক আইনের সমান সুরক্ষা পাবে। জুলাইয়ের লড়াই দেশকে রক্ষা করেছে; এখন সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করাই সরকারের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা শুধু একটি সরকারের ব্যর্থতা নয়, বরং একটি জাতির আকাঙ্ক্ষার অপূর্ণতায় পরিণত হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.