মাত্র কয়েকদিন আগে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন এক সংক্ষিপ্ত ভাষণে বলেছেন, শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবনের সময় সাশ্রয় করতে ২০২৭ সালের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা এই বছরের শেষে অর্থাৎ আগামী ডিসেম্বর মাসের মধ্যে শেষ করা হবে। এই ঘোষণার পর ছাত্র-ছাত্রীরা আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। বিশেষ করে যারা ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থী তারা সবচেয়ে বেশি হতাশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। শুধু ছাত্র-ছাত্রীরাই যে, আতঙ্কের মধ্যে আছে তা নয়, তাদের অভিভাবকদের মখেও ফুটে উঠেছে আতঙ্কের ছাপ। প্রশ্ন হলো, পরীক্ষার কথা শুনে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আতঙ্কিত হওয়ার কারণ কি? এই বিষয়টিই আমার আজকের আলোচনার বিষয়বস্তু। কথাপ্রসঙ্গে বলে রাখা প্রয়োজন যে, ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষা তো আগামী ২১শে এপ্রিল থেকে শুরু হচ্ছে। আগামী ৭ই জুন থেকে এইচএসসি পরীক্ষার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। আর আগামী ডিসেম্বর মাসে যদি আরও একটা এসএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়া হয়, তাহলে ২০২৬ সাল গ্রিনেজ বুকে নাম লেখাবে সন্দেহ নাই। কারণ একই বছরে এসএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষা দুই বার অনুষ্ঠিত হবে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়টি হলো, ২০২৭ সালে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা ২০২৬ সালে অনুষ্ঠিত হবে। এটি ৫৪ বছর বয়সী বাংলাদেশের জন্য একটি অলৌকিক ঘটনা। তবে অলৌকিক ঘটনার বিষয়টি বাদ দিয়ে আসুন ছাত্র-ছাত্রীদের আতঙ্কিত হওয়ার দিকে একবার দৃষ্টিপাত করি। ২০২৭ সালে যারা এসএসসি পরীক্ষা দিবে, তারা গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিল। বছরের শুরুতে তাদের সম্পূর্ণ পাঠক্রমকে নবম এবং দশম শ্রেণির জন্য দুই ভাগে ভাগ করে তৈরি করা হয়েছিল। সাধারণভাবে, বেশিরভাগ মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে নবম শ্রেণিতে পাঠ্য বইয়ের প্রথমার্ধ এবং দশম শ্রেণিতে পাঠ্য বইয়ের শেষার্ধ পড়ানো হয়ে থাকে। তবে কোনো কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই নিয়মের ব্যতিক্রম দেখা যায়। তারা বইয়ের প্রথম এবং শেষাংশ মিলিয়ে দুই বছরের জন্য মিশ্রিত পাঠ্যসূচী তৈরি করে। কিন্তু ফলাফল একই দেখা যায়। অর্থাৎ সকল স্কুলে একই সময়ে এসএসসি পরীক্ষার সিলেবাস শেষ হয়। দেখা গেছে, ছাত্র-ছাত্রীরা যে বছর দশম শ্রেণিতে অধ্যয়ন করে, সেই বছরের জুলাই/আগস্ট মাসে এসএসসি পরীক্ষার সম্পূর্ণ সিলেবাস শেষ হয়। তবে এরই মধ্যে সকল স্কুলেই আংশিক সিলেবাসে প্রাকনির্বাচনী (প্রি-টেস্ট) পরীক্ষা শেষ হয়ে যায়। এরপর ছাত্র-ছাত্রীরা টেস্ট পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। সাধারণত অক্টোবর মাসের শেষদিকে অথবা নভেম্বর মাসের প্রথমদিকে টেস্ট পরীক্ষা শুরু হয়ে থাকে। অবশ্য স্কুল-ভেদে টেস্ট পরীক্ষার সময়সূচি হেরফের হয়ে থাকে। তবে সাধারণত নভেম্বর মাসেই টেস্ট পরীক্ষা সমাপ্ত হয়। এরপর ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে একটা অতিরিক্ত মনোযোগ দেখা যায়। কারণ তারা এই সময়েই এসএসসি পরীক্ষার যথাযথ প্রস্তুতি গ্রহণ করতে মনোনিবেশ করে। এখানে একটা কথা বলে রাখা দরকার, আমাদের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা ব্যবস্থা অনেকটা প্রাইভেট নির্ভর হয়ে গেছে। শ্রেণিকক্ষে কতটুকু লেখাপড়া হয়, তা সবাই জানে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়টি হলো, ক্লাস টিচারের কাছে প্রাইভেট পড়লে শ্রেণি-পরীক্ষার খাতায় কিছু না লিখলেও ভাল নম্বর পাওয়া যায়। আর টিচারের কাছে প্রাইভেট না পড়লে ভালো ফলাফল আশা করা যায় না। আর এই কারণে ছাত্র-ছাত্রীরা প্রথম দেড় বছর টিচারের কাছে প্রাইভেট পড়তেই সময় পার করে। লেখাপড়ায় খুব একটা সক্ষমতা অর্জন করে না। তাই টেস্ট পরীক্ষার পর থেকে এসএসসি পরীক্ষার পূর্ব পর্যন্ত যে ৩/৪ মাস সময় থাকে, সেই সময়টা তারা ভালো ফলাফল অর্জন করার জন্য কাজে লাগায়। এবার আসা যাক ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষা প্রসঙ্গে। যদি আগামী ডিসেম্বর মাসে এসএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়, তাহলে শিক্ষার্থীরা চরম বিপাকে পড়বে। কারণ তারা নবম শ্রেণি থেকে তাদের সমুদয় পাঠক্রম দুই বছরের জন্য ভাগ করে লেখাপড়া করে আসছে। হিসাব অনুযায়ী আগামী জুলাই-আগস্ট মাসে তাদের পুরো সিলেবাস শেষ হবে। তাহলে তারা ডিসেম্বর মাসে কিভাবে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় অবতীর্ণ হবে?মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী, আপনার কাছে আকুল আবেদন, বিষয়টি আরেকবার ভাবুন। শিক্ষার্থীদের এসএসসি পরীক্ষার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে প্রস্তুতি নেওয়ার সময় দিন। যেখানে শ্রেণিকক্ষে লেখাপড়া নাই বললেই চলে, নবম-দশম শ্রেণির শ্রেণিকক্ষে একটা অধ্যায়ের দুই/একটা অংক করিয়ে অধ্যায়ে সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়, সেখানে ছেলেমেয়েদের প্রস্তুতি নেওয়ার সময়ও যদি আপনি কাটছাঁট করে দেন, তাহলে তারা তো হতাশাগ্রস্ত হবেই। তাই আপনার কাছে বিনীত নিবেদন জানাচ্ছি, বরাবরের মতো ফেব্রুয়ারী মাস বা তার পরে এসএসসি পরীক্ষা গ্রহণ করুন, ছেলেমেয়েদের মেধাবী হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অনুশীলনের সুযোগ দিন।আরেকটি বিষয় আপনার সমীপে তুলে ধরতে চাই। মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর শ্রেণিকক্ষে কতটুকু লেখাপড়া হয়, সে বিষয়ে অনুসন্ধান করার ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। অবশ্য বরাবরের মতো প্রধান শিক্ষকের রিপোর্টের মাধ্যমে নয়, গোপন সংবাদের মাধ্যমে সরাসরি যাচাই করুন। তারপর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। শিক্ষা ব্যবস্থার মান উন্নয়নে এই কাজটি এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আরও একটি বিষয় আপনার নজরে আনতে চাই। আপনার আমলে অর্থাৎ ২০০৮ সালের পূর্বে এসএসসি লেবেলে যে বইগুলো চালু ছিল। সেটা ছিল সর্বকালের সেরা পাঠক্রম। তাই আমি সবিনয় অনুরোধ করতে চাই ২০০৮ সালের পূর্বের পাঠ্যসূচী আবার ফিরিয়ে আনুন। এতে শিক্ষার্থীরা উপকৃত হবে।
মনজুর রহমান শান্ত
নাট্যকার, ঔপন্যাসিক, অনুবাদক

Leave a Reply