নিজস্ব প্রতিবেদক
আগামীকাল ৭ এপ্রিল,বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপিত হবে ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস ২০২৬’।ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ পৃথিবী গড়ে তোলার সুদৃঢ় অঙ্গীকারকে সামনে রেখে এ বছর দিবসটি পালিত হচ্ছে। এবারের বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসের মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারিত হয়েছে— ‘স্বাস্থ্যসেবায় বিজ্ঞান, সুরক্ষিত সকল প্রাণ’ (Together for Health, Stand with Science)।
বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত সময়োপযোগী, যা কেবল মানুষের চিকিৎসাকেই নয়, বরং সমগ্র জীবজগৎ ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বিজ্ঞানের অপরিহার্যতাকে নির্দেশ করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী পৃথক বাণী দিয়েছেন এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন সংস্থা দেশব্যাপী বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
এ বছরের দিবসটির একটি অন্যতম প্রধান দিক হলো ‘One Health’ বা ‘এক স্বাস্থ্য’ ধারণার প্রচার ও প্রসার। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত যে মানুষ, পশুপাখি এবং পরিবেশ—এই তিনটি উপাদান একে অপরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কোনো একটির ভারসাম্য বিঘ্নিত হলে তার প্রভাব অন্যগুলোর ওপর পড়তে বাধ্য।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন সংক্রামক ব্যাধির একটি বড় অংশই প্রাণীজগৎ থেকে মানুষের মধ্যে ছড়িয়েছে। তাই মানুষের সুস্থতা নিশ্চিত করতে হলে তার চারপাশের প্রাণিকূল ও পরিবেশের সুস্বাস্থ্য রক্ষা করা আজ সময়ের দাবি। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে চিকিৎসাবিজ্ঞান, কৃষিবিজ্ঞান, প্রাণিবিজ্ঞান ও পরিবেশবিজ্ঞানকে সমন্বিত করে গবেষণা ও টেকসই প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানের দ্রুত অগ্রগতি স্বাস্থ্যসেবায় অভূতপূর্ব সুযোগ ও সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে প্রান্তিক অঞ্চল ও দরিদ্র বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য মানসম্পন্ন ও বৈষম্যহীন স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছাতে প্রযুক্তির কোনো বিকল্প নেই।
২০২৬ সালের বিশেষ দিনে সরকার ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা স্বাস্থ্যখাতে আধুনিক প্রযুক্তির সংমিশ্রণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন:
দ্রুত ও নির্ভুল রোগ নির্ণয়ে এআই এখন বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। বাংলাদেশের বড় হাসপাতালগুলোতে এখন জটিল প্যাথলজিক্যাল রিপোর্ট বিশ্লেষণে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে।জটিল অস্ত্রোপচারের পরিকল্পনা এবং চিকিৎসা শিক্ষার ক্ষেত্রে ভিআর ও এআর প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রসার ঘটানো হচ্ছে, যা তরুণ চিকিৎসকদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।ডিজিটাল বাংলাদেশের ধারাবাহিকতায় এখন গ্রাম পর্যায়ে বসেও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার স্বাস্থ্যসেবাকে কেবল একটি সুযোগ হিসেবে নয়, বরং নাগরিকের মৌলিক অধিকার হিসেবে দেখে। ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ নীতির ভিত্তিতে সরকার একটি উন্নত কল্যাণকামী রাষ্ট্র গঠনের পথে কাজ করে যাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, ‘Prevention is Better than Cure’ বা ‘প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম’—এই নীতিকে কেন্দ্র করেই গড়ে তোলা হচ্ছে আগামীর স্বাস্থ্য কাঠামো।
দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে তৃণমূল পর্যায়ে শক্তিশালী করতে ধাপে ধাপে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে। নারী ক্ষমতায়নের অংশ হিসেবে এই নিয়োগের প্রায় ৮০ শতাংশই হবেন নারী।
প্রতিটি নাগরিকের স্বাস্থ্যগত তথ্য ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষণের জন্য ‘ই-হেলথ কার্ড’ প্রবর্তন করা হচ্ছে। এর ফলে একজন রোগী দেশের যেকোনো প্রান্তেই চিকিৎসা নিতে যান না কেন, চিকিৎসকরা তার পূর্ববর্তী চিকিৎসার ইতিহাস সহজেই জানতে পারবেন।
দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল রোগের চিকিৎসায় সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বয় ঘটানো হচ্ছে, যাতে সাধারণ মানুষ সুলভে উন্নত সেবা পাবে ।চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে যেন কোনো পরিবার দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে না যায়, সেজন্য সরকার ধাপে ধাপে স্বাস্থ্যবিমা চালুর পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
মানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে টেকসই অর্থায়ন প্রয়োজন। সরকার ঘোষণা করেছে যে, স্বাস্থ্য খাতের সেবার মান উন্নয়ন, চিকিৎসা শিক্ষা ও গবেষণা জোরদার করতে পর্যায়ক্রমে স্বাস্থ্য খাতে জাতীয় বাজেটে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করা হবে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হবে আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণ, নতুন জনবল সৃষ্টি এবং চিকিৎসা গবেষণায়।
এছাড়া, সেবাগ্রহীতা ও সেবাদাতা—উভয় পক্ষের সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিত করতে ন্যায়সঙ্গত আইন প্রণয়নের কাজও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এটি স্বাস্থ্য খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
শহর ও গ্রামের বৈষম্য দূর করতে সরকার মা ও শিশুর পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবাসহ রোগ প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে দিচ্ছে। কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর আধুনিকায়ন এবং সেখানে প্রয়োজনীয় ওষুধের সরবরাহ বৃদ্ধি করা হয়েছে। লক্ষ্য একটাই—কোনো মানুষ যেন বিনা চিকিৎসায় কষ্ট না পায়।
’বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস ২০২৬’ কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি আমাদের শপথ নেওয়ার দিন। চিকিৎসকদের মানবিক হওয়া, রোগীদের সচেতন হওয়া এবং সরকারের যথাযথ ব্যবস্থাপনা—এই তিনের সমন্বয়েই গড়ে উঠবে একটি সুস্থ ও সবল জাতি।
সততা, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে দায়িত্ব পালন করলে এবং বিজ্ঞানের শক্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগালে আমরা এমন একটি পৃথিবী গড়ে তুলতে পারব যেখানে মানুষ ও পরিবেশ উভয়ই সুরক্ষিত থাকবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে আয়োজিত সকল কর্মসূচির সাফল্য কামনা করে এবং দেশের প্রতিটি নাগরিককে স্বাস্থ্য সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে এক উন্নত আগামীর প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
“স্বাস্থ্যসেবা কোনো করুণা নয়, এটি অধিকার। আসুন, বিজ্ঞানের হাত ধরে আমরা সকলে মিলে একটি সুরক্ষিত পৃথিবী গড়ে তুলি।”

Leave a Reply