মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে আপনার বেশ কয়েকটি ভাষণ জনসাধারণের মনে আশার সঞ্চার করলেও সেগুলোর বাস্তবায়ন আদৌ হবে কিনা তা নিয়ে জনসাধারণের মনে যথেষ্ট সন্দেহ দানা বেধেছে। আপনি এসএসসি পরীক্ষা নিয়ে কঠোরতার কথা বলেছেন। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে যা হয়েছে সে সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করতে চাই না। শুধু পাশের হার নিয়ে কিছু কথা বলতে চাই। সাবেক শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি এবং তার উত্তরসূরী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এসএসসি পরীক্ষায় পাশের হার ১০০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নেমেছিলেন। সেই লক্ষ্য অনুযায়ী দীপু মনি পাশের হার ৯৩.৫৮ শতাংশে উন্নীত করেছিলেন। যদিও মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের আমলে এসএসসি পরীক্ষায় পাশের কিছুটা কমে ৮৩.০৪ শতাংশে নেমে এসেছিল। আমার মনে আছে এসএসসি পরীক্ষা শুরুর আগে দীপু একবার শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, ছাত্র-ছাত্রীরা আপনাদের সন্তান। তাদের প্রতি রুঢ় আচরণ করবেন না। তাদের প্রতি সদয় হোন, তাদেরকে নির্বিঘ্নে পরীক্ষা দিতে সহযোগিতা করুন। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, এই ভাষণের পর থেকেই পরীক্ষা কেন্দ্রে শিক্ষকদের দায়িত্ব অবহেলার সূচনা হয়েছিল। অনেক কেন্দ্রে শিক্ষকরা নকল প্রতিরোধ করার পরিবর্তে নকলে সাহায্য করেছিলেন।
আর এই অপকর্মের ফলস্বরূপ পাশের হার আকাশ ছোঁয়ার অবস্থা হয়েছিল। আর দিপু মনি সেটাকে শিক্ষাক্ষেত্রের উন্নতি হিসেবে প্রচার করেছিলেন। আমার পার্শ্ববর্তী একটা স্কুল এই প্রচেষ্টায় শতভাগ সাফল্য অর্জন করেছে। সম্ভবতঃ ২০১৬ সালে স্কুলটি পরীক্ষা কেন্দ্র মনোনিত হয়। কেন্দ্র মনোনীত হওয়ার আগে ঐ স্কুল থেকে প্রতি বছর সর্বোচ্চ দশ থেকে বারো জন ছাত্র জিপিএ-৫ পেত। কিন্তু কেন্দ্র মনোনীত হওয়ার পরে স্কুলটি সম্ভবত আলাদিনের চেরাগ হাতে পেয়েছিল। ঐ স্কুল থেকে ২০২৫ পর্যন্ত প্রতি বছর শতকরা ৯৫ জনেরও বেশী ছাত্র-ছাত্রী জিপিএ-৫ অর্জন করেছে। তবে এবছর অর্থাৎ ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় ঐ স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের অন্য একটা কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এতোদিন তারা নিজেদের কেন্দ্রে পরীক্ষা দিয়ে গাজীপুরে জিপিএ-৫ প্রাপ্তির রেকর্ড অর্জন করেছে। এবার তারা অন্য কেন্দ্রে পরীক্ষা দিচ্ছে। সবাই অপেক্ষা করছে ঐ স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের এবারের রেজাল্ট দেখার জন্য।
আরেকটা বিষয় এখানে উল্লেখ করতে চাই, ২০২৬ সালের জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষায় ঐ স্কুল থেকে ৩৯ জন ছাত্র-ছাত্রী স্কলারশিপ অর্জন করেছে, যা অন্য সকল সময়ের চেয়ে আকাশচুম্বী সাফল্য। উল্লেখ্য যে ঐ স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা নিজেদের স্কুলেই বৃত্তি পরীক্ষা দিয়েছে। আর অতীতের সকল সময়ে ঐ স্কুলের বৃত্তি প্রাপ্ত ছাত্র-ছাত্রীদের রেকর্ড দেখলে এবং আগামী বৃত্তি পরীক্ষায় ঐ স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের আসন অন্য স্কুলে নিয়ে গেলেই বোঝা যাবে, এবারের পরীক্ষায় তাদের আকাশচুম্বী সাফল্যের ভিত্তি কোথায়।
এই কর্মকাণ্ড শুধু যে একটা স্কুুলে হচ্ছে, তা নয়, দেশের অনেক স্কুলেই এই ধরনের ঘটনা ঘটে চলেছে। তাই পরীক্ষায় দূর্নীতি রোধ করতে হলে আসন ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। কোন ছাত্র-ছাত্রী যেন নিজেদের কেন্দ্রে পরীক্ষা দিতে না পারে সেই ব্যবস্থা করতে হবে। এতে অযোগ্য কারও পক্ষে জিপিএ-৫ অর্জনের পথ চিরতরে বন্ধ হবে।
২০২৪ সাল পর্যন্ত এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় পাশের হার ছিল অস্বাভাবিক রকমের বেশি। তবে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় পাশের হার বেশি থাকলেও এই বছরগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার হারও অসম্ভব রকমের বেশি। সর্বশেষ, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় বিজ্ঞান ইউনিটে পাশের হার ৫.৯৩%, যা অতীতের সকল সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ইউনিটে ভর্তি পরীক্ষায় ফেল করেছে ৯৪.০৭% ছাত্র-ছাত্রী।
মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী, আপনার কাছে আমার সবিনয় নিবেদন, উপরোক্ত বিষয়গুলো একটু খতিয়ে দেখুন। যেখানে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় পাশের হার আকাশ ছোঁয়ার অবস্থা হয়েছে, সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ফেলের হারও আকাশ ছুঁতে শুরু করেছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসএসসি ও এইচএসসি উভয় পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জনকারী অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় পাশ নম্বরও তুলতে সক্ষম হয় নাই। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, যারা ভর্তি পরীক্ষায় পাশ নম্বরও তুলতে পারে না, তারা এসএসসি ও এইচএসসি উভয় পরীক্ষায় কিভাবে জিপিএ-৫ অর্জন করলো।
মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী, উপরোক্ত বিষয়গুলো খতিয়ে দেখতে সর্বাগ্রে স্কুলগুলোর উপর নজর দিতে হবে। শ্রেণিকক্ষে কতটুকু লেখাপড়া হচ্ছে, সেটা পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। শুধু এসএসসি পরীক্ষায় কঠোরতা অবলম্বন করে শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতি সাধন করা করা সম্ভব নয়। শ্রেণিকক্ষে কি হচ্ছে, তার উপর নজর দিন। কারণ বর্তমানে লেখাপড়া শ্রেণিকক্ষে হয় না। ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়তে হয়। প্রাইভেট পড়লেই ভালো রেজাল্ট করা যায়। তাই আপনাকে অনুরোধ করছি, আসল জায়গায় হাত দিন, থলের বিড়াল বেড়িয়ে আসবে। আগামী সংখ্যায় বিস্তারিত লিখব ইনশাআল্লাহ।
মনজুর রহমান শান্ত
নাট্যকার, ঔপন্যাসিক, অনুবাদক

Leave a Reply