কাজল মালেক
১৮শ পর্ব
১৯৫৫ সালের ১০ মে জুমন আলী প্রধান ও তহরজানের চতুর্থ পুত্র মোঃ আঃ মালেকের প্রধানের জন্ম হয়। মেয়ে হলোনা বলে ছেলের মুখ দেখতে চায়নি জুমন। মেয়ে না হওয়ায় শুধু দুঃখ পায়নি সে, আবার বিয়ে করবে বলে হুমকিও দিলো। মালেক প্রধানের জন্মরোধ কল্পে কতো চেষ্টাইনা করেছে তহরজান। জানা ছিলো, এবার মেয়ে না হলে কপালে দুর্গতি আছে। স্থির করলো পেটে আর বাচ্চাই নেবেনা সে। কিন্তু পেটে সন্তান না ধরার উপায় তো জানা নেই। ভেবে ভেবে গলদঘর্ম হচ্ছে তহরজান। উপায় নিয়ে এলো ডালেমের মা, তারই ননদ কাদিগড়ের লালজান। জানালো বাঘের চর্বি দিয়ে ওষুধ বানিয়ে খেলে চিরতরে সন্তান বন্ধ হয়ে যবে। অতপর লালজান সবরী কলার ভেতর বাঘের চর্বি ভরে ওষুধ বানিয়ে তাকে খাইয়ে দিলো। কিন্তু ঔষধে কাজ হলো উল্টো। সেই মাসেই তার পেটে আরেক সন্তানের উপস্থিতির লক্ষণ বুঝতে পারলো সে। দশমাস পর যথারীতি পৃথিবীতে এলো প্রধানবাড়ির ছেলেমেয়েদের মধ্যে সবথেকে কালো, স্থুলকায়, অসুন্দর এক মানবশিশু।
এবারও তহরজান ছেলে জন্ম দিলো বলে জুমন বিমর্ষ, মনঃক্ষুণ্ণ। ছেলের জন্মসংবাদে নিজে আযান দিলোনা। বাড়ির কামলা ( চাকর) শুক্কুরালীকে ডেকে বললো, “এই শক্কুইরা, আযান দে। বড় কামাই করছুইন, পোলা বেয়াইছুন। হুনছচনি, আবারি পোলা অইছে তার।” শুক্কুরালীর কন্ঠের “আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার” ধ্বনি আঁতুড়ঘরে গিয়ে পৌঁছে। মুসলমানদের ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী নবজাতক পুত্র সন্তান হলে আযানের মাধ্যমে আল্লাহর নাম তার কানে পৌঁছে দিতে হয়। এই আযানের শব্দ শুনে সদ্যপ্রসবিনী তহরজান দুর্বল শরীরে ছোটবোন সরজানকে ইশারায় ডাকে। জিজ্ঞেস করে,”পরধানি কইরে? হের মন বেশি খারাপ অইচেনি?”সরজান খাতুন ঘরের দরোজার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিয়ে বলে,”খাইজরগাছের গুড়িত ঠেস দিয়া চুপ কইরা বইয়া আচুইন। মনে অয়,পুরী অইলে খুশি অইতো!””পুরী কি আমি বানাইয়া আনতাম? ছেরা অইচে। ছেরি অইলোনা ক্যান? হেডা কি আমার কি দোষ, ছেরি কি বানানোর জিনিস না গাছের গোডা যে টানদা ছিড়া আনাম।” একটা দীর্ঘশ্বাস লুকাতে চায় তহরজান। সদ্যোজাত শিশুটির দিকে নির্ণিমেষ তাকিয়ে থাকে। ফর্সা না হোক,তবু চাঁদমুখ, কী অদ্ভুত মায়ালাগা চেহারা তার।
দেড়মাস পর ছেলের মুখ দেখে জুমন রাগে বলে উঠেছিলো, ” ইডা ত আমার বংশের কালিতারা। হালার হালার ভাইগনা তার মা’র গোষ্ঠীর চেহারা পাইছে।” স্ত্রীকে শুনিয়ে শুনিয়ে বললো, “এই পুড়াকাঠ কাইল্লারে কোলো লইয়া লাভ কি? বেখন্দাডারে মাুনষ কইরা কোনো লাভ অইতোনা।” ছেলের বাবার এই নির্দয় উচ্চারণ তার বুকে গিয়ে লাগে। তহরজান নীরবে চোখের জল ফেলে। ঘুমিয়ে পড়া ছেলেকে কোলে তুলে নিয়ে তার বুকে চেপে ধরে। স্বীয় পুত্রের সোনামুখের দিকে সিক্ত চোখে বারবার তাকে দেখে। অস্ফুট কন্ঠে বলে, “এই কালিতারাই আমার চানতারা। কালা অইছে, কি অইছে। এই কালাই জুড়াইবো আমার হগগল জ্বালা।” টুপ করে ছেলের কপালে চুমু খেলো তহরজান। যে বছর মালেক প্রধানের জন্ম হলো সেই বছরটা মানে ১৯৫৫ সালটা পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসে ছিলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশ টানাপোড়েনে অস্থিতিশীল একটি সময় পার করছে। ১৯৫৫-৫৬ সালে পাকিস্তান তার প্রথম সংবিধান প্রণয়ন করে এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনে। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের পর পূর্ব বাংলায় রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেয়। পশ্চিম পাকিস্তানেও নেতৃত্বের দ্বন্দ্বে এক অভাবনীয় সংকট দেখা দিলে প্রথম গণপরিষদ ভেঙ্গে দেওয়া হয়। ১৯৫৫ সালের মে মাসে গঠিত হলো দ্বিতীয় গণপরিষদ।
পশ্চিম পাকিস্তানের চারটি প্রদেশ- পাঞ্জাব, সিন্ধু, সীমান্ত প্রদেশ ও বেলুচিস্তানকে একিভূত করে ‘ওয়ান ইউনিট’ বা পশ্চিম পাকিস্তান প্রদেশ গঠন করা হলো। এর মূল লক্ষ্য ছিল পূর্ব পাকিস্তানের বাঙ্গালি জনসংখ্যার আধিক্যের সঙ্গে যতোটা সম্ভব সমতা আনা। অবশ্য তখনও পশ্চিম পাকিস্তানের উক্ত চারটি প্রদেশের মোট জনসংখ্যা ছিলো পূর্ববঙ্গের জনসংখ্যার চেয়ে কম। দুই প্রদেশের মধ্যে ভারসাম্য নিয়ে আসতে পশ্চিম পাকিস্তানকে একক ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে দাঁড় করনো হলো। আর পূর্ব বাংলার নাম পরিবর্তন করে রাখা হলো ‘পূর্ব পাকিস্তান’। এইসময় দেশের রাজনৈতিক অংগনে আরেকটি ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটে। দেশে হিন্দু মুসলমানকে ঐক্যবদ্ধ করতে এবং সকল ধর্মের লোকদের দলে নিয়ে সমন্বয় ঘটাতে ১৯৫৫ সালের ২১শে অক্টোবর আওয়ামী মুসলিম লীগ তাদের নামের ‘মুসলিম’ শব্দটি রহিত করে। অতপর দলটির নতুন নামকরণ করা হয় শুধু ‘আওয়ামী লীগ’ ।এই সময় ইস্কান্দার মির্জা পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করেন। পাকিস্তানে দ্রুত ঘটতে থাকে অভাবনীয় ঘটনা।
মসজিদের ইমাম সুবেদালী মুন্সি তহরজানের দূরসম্পর্কের ভাই। ছোট প্রধানবাড়ির বাংলাঘরে (বৈঠকখানা) তিনি জুমনকে নিয়ে বসে আছেন। খেজুরের গুড় দিয়ে হাতেকাটা সেমাই পাক করেছিলো সরজান। তাতে বেশি করে দুধ আর নারকেল কুরিয়ে দিয়েছিলো। এই বাড়ির সকলের পছন্দের সুস্বাদু খাবার এই সেমাই, স্থানীয় ভাসায় বলে শেওয়াই। তাদের দু’জনকে জাম বাটিতে করে সেই সেমাই পরিবেশন করে সরজান।
কোন কথা না বলে মুন্সির সাথে খাচ্ছে জুমন। সুবেদালী জানেন জুমন ছেলে হওয়াতে খুশি হয়নি। তার একটা হাত টেনে নিয়ে বললেন,”পরধানি। পোলা-পুরি হওয়াটা আল্লাহর ইচ্ছা, মানুষের কোনো আত নাই। আর আল্লাহ যা দ্যান তাই লইয়া খুশি থাকতে অয়। নাইলে আল্লাহ নারাজ হন। পরধানি, পোলার নাম কি রাখচুইন?” জুমন মাথা নিচু করে জবাব দেয়,”এহনো রাহিনি। আমনেহ আলেম মানুষ, ভালা দেইহা একটা নাম রাইহা দেইন।” সুবেদালী খুশি হয়ে বলেন,”আলহামদুলিল্লাহ। আউজকা লইয়া সাতদিন অইলোনা? আইজ তো হাডিরা অইবো,খাতুন কইলো।”( জন্মের সাতদিন পর আত্মীয় স্বজন বিশেষ করে প্রসূতির বাপের বাড়ির মেয়েরা নবজাতককে দেখতে আসে এবং তার নামকরণ করে। এইদিনের অনুষ্ঠানকে স্থানীয়রা হাডিরা বলে)।
জনাবালী মন্ডল বেঁচে নেই। তার ছয় মেয়ে। তহরজান তৃতীয়। তার বোনেরা আর ভাইবউয়েরা বিভিন্ন উপহার এবং হাতে তৈরি মোয়ামুড়কি ও মিষ্টান্ন নিয়ে এসেছে। আনুষ্ঠানিকভাবে নবাগত সন্তানের নাম করণ করা হবে আজ। সুবেদালী মুন্সী জুমনকে উদ্দেশ্য করে বল্লেন, ” আইজ বৈহালে একটা মিলাদ দেইন,আমি লাল্লা মুন্সি আর আলীমুদ্দীরে লইয়া আই। আমহের সমুন্দী রুছু আর জবানরে দাওয়াত দেইন। মিলাদমাহফিলে দূ আ দরুদ পইড়া,ছেলের নাম রাহা অইবো।”
জুমন আলী প্রধানের রাগ কমেছে। তিনি বিকেলে বড়ো করে মিলাদের আয়োজন করলেন। নবজাতকের নাম রাখা হলো মোহাম্মদ আবদুল মালেক প্রধান।

Leave a Reply