
তিনকাল
কাজল মালেক
১৯শ পর্ব
হাডিরা উৎসবের রাতে ছোট প্রধানবাড়িতে বসেছে হাস্তর (কিসসা-কাহিনি) বলার আসর। এই এলাকায় কিসসা-কাহিনি উপস্থাপনে সামেরবাপের তুলনা নেই। সামেরবাপের নাম সাহেবালী আহলান। তার বড় ছেলে সামসুল হক ওরফে সামে। বেতজুরির বনের পাশে গরু চরানোর সময় বাঘে থাবা দিয়ে তার গাল ও ঘাড়ের মাংস খুবলে নিয়ে গিয়েছিলো। সঙ্গে সঙ্গে তার সাথের লোকজন লাঠিসোঁটা নিয়ে সদলবলে চলে এলে জানে বাঁচে সে। কিন্তু বাঘের থাবার ভয়ানক ক্ষত আজও বয়ে বেরাতে হচ্ছে তাকে। মুরুব্বি মানুষের নাম ধরে ডাকতে নেই। এদেশের প্রাচীন রীতি সন্তানের নাম বলে তার পিতার পরিচয় দেয়া হয়।এজন্য সামের পিতাকে সামেরবাপ বলে ডাকে। সমবয়সীরা তাকে আহাইল্লা নামে সম্বোধন করেন। তেমনি নতুন বউদের কেউ নাম ধরে ডাকেনা।সন্তানের মা হওয়ার পূর্বে বরের বাড়ির মুরুব্বিরা মিষ্টি শব্দ দিয়ে বউকে তার মা এবং বরকে তার বাবা বলে সম্বোধন করতেন। যেমন চিনির মা,চিনির বাপ। এরকম নামের সাথে আরও অনেক অদ্ভুত কল্পিত নামও ব্যবহার করা হতো। নয়া বউদের জন্য প্রচলিত নামগুলোর মধ্যে লালের মা,কালার মা, ধলার মা, সন্দেশের মা, আলতার মা,মধুর মা,চান্দের মা,সুন্দরের মা,মিশ্রির মা,ফুলির মা, তারার মা,টুনীর মা,টিয়ার মা, ময়নার মা, আলুর মা,গুতার মা অন্যতম। বরকে ঠিক উল্টো এদের বাপ বলে সম্বোধন করতো। অনেকে নতুন বউকে নয়ানীও বলে।
সম্পর্কে তহরজানের চাচাতো ভাই হন গল্পকথক সাহেবালী। তিনি এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তি। তার সাথে গায়েন হিসেবে রয়েছে পলানবাড়ির হাকিম পলান ( পালোয়ান) , ছমিরালী, শুক্করালীসহ আরও কয়েকজন সাগরেদ। এদের বলে পাইলদার (পয়ালদার)। এরা কেউ স্থানীয় বাদ্যযন্ত্র বাজায়, কেউ আবার গানে আর কথকতায় কথকের সাথে সুর মিলায়। হাস্তর বলার সময় কাহিনির প্রয়োজনে গান ধরতে হয়। আসলে এটি এক ধরনের পালাগান। কাহিনি বলতে বলতে উত্তেজনায় রাজা বাদশাহর সংলাপ এলে কথক জোশের বশে হুংকার দিয়ে উঠেন। তখন উচ্চগামী শব্দে খোল করতাল, তবলার বাদ্য বেজে উঠে । সাথে পয়ালদাররাও সমধ্বনি করে তার উচ্চকিত জবাব দেন। তারপরের অংশ গান। সুরটা ধরিয়ে দেন স্বয়ং গল্পকথক।
আজ মধুমালার কাহিনি শোনানো হবে। উঠানে উন্মুক্ত আকাশের নিচে খেজুর পাতার পাটি বিছিয়ে দেয়া হয়েছে। মাঝখানে বসেছেন সাহেবালী। সঙ্গীদের সতর্ক করে বল্লেন, ” ভুল জানি না অয়। ভালা কইরা পাইল ধরিছ।” পয়ালধারগন পা মুড়িয়ে বসে আছে। তবলা,করতাল আর হারমোনিয়াম নিয়ে একপাশে বসেছে কয়েকজন। তাদেরকে ঘিরে গোল হয়ে বসেছে হাডিরার অতিথিরা- নারী শিশু, ছেলেমেয়ে, বুড়া-বুড়ি সকলে। বাড়িসুদ্ধ লোক গল্পকথকতায় বারবার শিহরিত হচ্ছে। সাহেবালীর কন্ঠে কথার যাদু, সুরের বন্যা। ক্রমশঃ তার উচ্চগামী সুর তরঙ্গিত হয়ে আরও উঁচুতে উঠে কম্পন তুলে। শ্রোতার নড়ে চড়ে বসলো। পয়ালধারগন কথকের কন্ঠ কেড়ে নেয়, মাথা দুলিয়ে আকুল করা সুরে গায় “স্বপ্ন যদি মিথ্যা হইতো- রাজন, আমার আংটি না বদল হইতো। আমি স্বপ্নেরে দেখি মধুমালার মুখ হে।” রাতভর চলে এই হাস্তরপালা।
স্বাধীনতা প্রাপ্তির দীর্ঘ ৯ বছর পর ১৯৫৬ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের প্রথম সংবিধান পাস হয়। আর কার্যকর হয় ২৩ মার্চ ১৯৫৬। এই সংবিধানের অধীনে পাকিস্তানকে আনুষ্ঠানিকভাবে “ইসলামিক প্রজাতন্ত্র অব পাকিস্তান” হিসেবে ঘোষণা করা হলো। শুরু হলো প্রেসিডেন্ট পদ্ধতির শাসন ব্যবস্থা। পাকিস্তানের সংবিধান কার্যকর হলে গভর্নর পদ রহিত করে ইস্কান্দার মির্জা পাকিস্তানের প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনে বাঙ্গালির রক্তদানের ঘটনায় নতি স্বীকার করে সংবিধানের ২১৪ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বাংলা ও উর্দু-উভয় ভাষাকেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়া হয়। এভাবেই সংবিধানে এক কক্ষবিশিষ্ট আইনসভাসহ সংসদীয় সরকার ব্যবস্থার বিধান এবং পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে সমতার নীতি (Parity) প্রবর্তিত হলো।
মালেকের জন্মের সময় থেকেই রোগে ভূগছে তহরজান। এমনিতেই তার রক্তস্বল্পতা রয়েছে তার উপর বছর না ঘুরতেই বাচ্চার মা হচ্ছে সে। তার শরীর ভেঙ্গে পড়েছে। জুমন আলী ব্যস্ত শিকার নিয়ে। তার স্ত্রী আবার মা হবে। মালেক দুধের শিশু,কিন্তু মায়ের বুকে দুধ নেই। তহরজান ঘন ঘন বেহুঁশ হয়। কোলের শিশুকে তার সঙ্গে রাখা সঙ্গত হবেনা। হাসেম বুঝতে শিখেছে। সে স্কুলে যায়। মাকে এসে বলে,”মা! বাবুরে আমার কাছে দেইন। আমি ঘুম পারাইয়া আমার লগে রাখতে পারবো।” হাসেম নিজেই গরুর দুধ বোতলে ভরে মালেককে খাওয়ায়। সহরজান সারাদিন এ বাড়িতে কাটালেও রাতে নিজ বাড়িতে ফিরে যায়। তার কোলেও বাচ্চা, নাম ছামাদ। মালেকের চেয়ে তিনমাসের বড়। হাসেম তার বিছানায় নিয়ে যায় মালেককে। কৃষ্ণবর্ণের স্থুলকায় শিশুটি খাবার পেলেই শান্ত থাকে। কান্না করেনা। তার বাবা সন্তানের বেলায় উদাসীন। ক্ষেতেখলায় কামলাদের সঙ্গে কঠোর পরিশ্রম করে। সুযোগ পেলেই শাহন আলীকে নিয়ে উধাও হয়। তারা মাছ শিকার করতে বেরোয়। তার আরেক সাথী আলিমুদ্দীন। আশেপাশের বিলে ডোবায় কিংবা চেংটির খাল ও সালদহ নদীতে বড়শি দিয়ে মাছ ধরে। সালদহ নদীর সরপুঁটির স্বাদই আলাদা। আশ্বিন কার্তিক মাসে চর্বিতে পূর্ণ এই সরপুঁটি কড়াইতে ভাজতে গেলে গপ গপ করে তেল বেরোয়। তাছাড়া এই নদীর বোয়াল, আইড়, শোল মাছও সুস্বাদু। চেংটির খালে প্রচুর গোলশা,টেংরা,পাবদা,কই, মাগুর, শিং পাওয়া যায়। জুমন মাছের নেশায় স্ত্রীর অসুখের কথা ভুলে যায়। মনে পড়েনা তার কালো শিশুছেলেটির কথা। হাত পা নাড়িয়ে সে কথা বলতে চায়, দেখলে কোলে আসার জন্য বাবার দিকে তাকিয়ে থাকে। ছোট্ট শিশুটি
ঠোঁট ভেঙ্গে অভিমানের কথা জানায়। সেসব ভাবতে চায়না জুমন। একটা কষ্ট বুকের ভেতর পাথরের মতো চেপে বসে আাছে। একটা মেয়ে কেন এলোনা তার ঘরে।
দূরে মাছ শিকারে গেলে সারাদিন কেটে যায়। আলীমুদ্দীন বাড়ি থেকে সঙ্গে করে চিড়ামুড়ি, পেঁয়াজ কাঁচামরিচ নিয়ে যায়। নদীতীরে অটবীর পাশে বৃক্ষ ছায়ায় বসে ঘামভেজা শরীরে ওগুলো গোগ্রাসে গলাধঃকরণ করে তারা। আলীম কোন কোনদিন ফরমায়েশ দিয়ে মেরা পিঠা (এদিকে বলে গোডা পিডা), পোয়া পিঠা ও গুলগুলি বানিয়ে নিয়ে যায়। বলে,” আমহের বাড়িত আবার রোগী, কেডা রানবো। কেডা পিডা বানাইবো। ময়নার মারে কইলাম, “পরধানীর লাইগ্গা কয়ডা পিডা বানায়া দে। ময়নার মা হাইসা কয়, কইনবুলে নিজের খাইতে মন চায়,পরধানীর নাম করুইন কেলেইগ্গা।” আসলে ত আমরা দুইজনই খাইবাম” শাহনের দিকে তাকিয়ে আলীমুদ্দী আবার বলে, “তরেও দিবামনে। ভাবিছনা।” হো হো করে হাসে ময়নার বাপ। তার আকর্ণ বিস্ফোরিত হাসির শব্দে গাছের আগায় বসা পাখি সশব্দে উড়ে যায়।
শিশু মালেক এমনি তো যেমন শান্ত, খায় আর ঘুমায় তেমনি ঘন ঘন প্রাকৃতিক ক্রিয়াকর্মে সময় অসময়ের ধার ধারেনা। হাসেমের কোল, কাঁথা বালিশ, বিছানা ভিজিয়ে দেয়। সকালে নাকি সুরে কাঁদতে কাঁদতে অসুস্থ মায়ের কাছে যায় হাসেম, বলে, ” অরে আর আমার কাছে রাখবোনা মা। আইগ্গা মুইত্তা আমার বিছানাডারে কি করছে, দেহেন গা। খাতু খালা কই? যাইন, গিয়া পরিস্কার করেন। আমি গোসল কইরা ইস্কুলে যাব।” তহরজান উঠে বসতে গিয়ে পড়ে যায়। বলে, “বাজানরে তর কত গু মুত পরিষ্কার করছি। ছোডো ভাইডারে তুই না রাখলে কেডা রাখবো, খাতুর কোলেও ছোডো ছেরা।” খুক খুক কাশে হাসেমের মা। সহরজান তাকে আবার ভালো করে শুইয়ে দেয়। হাসেম ভয় পেয়ে আর কিছু বলেনা। মায়ের জন্য তার কান্না পায়। অন্যদের চেয়ে শুদ্ধ করে কথা বলার চেষ্টা করে সে। স্কুলের শিক্ষকরা তাকে সুন্দর করে কথা বলতে শেখান।
এদিকে পাকিস্তানের সংবিধান পাস হলেও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কোন্দল এবং প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের কারণে দেশে অস্থিতিশীলতার আশংকা কমেনি বরং মতদ্বিত্বতা আরও প্রবল হতে হচ্ছিলো। যদিও এই সময়েই পাকিস্তান একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে তার প্রথম সাংবিধানিক রূপ পায়। তবু পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বৈষম্য ও রাজনৈতিক দূরত্বের ভিত আরও শক্ত হয়।
পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৫৭-৫৮ সাল ছিলো অত্যন্ত ঘটনাবহুল। এসব ঘটনায় রাজনীতির দাবার ছক পাল্টাতে থাকে। এই সময়েই দেশটি চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা, ঘনঘন সরকার পরিবর্তন এবং অবশেষে প্রথম সামরিক শাসনের কবলে পড়ে।
১৯৫৭ সালের অক্টোবরে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পদত্যাগ করলে ইব্রাহিম ইসমাইল চুন্দ্রিগর পাকিস্তানেরপ্রধানমন্ত্রী হন। এর কিছুদিন পর, ১৬ ডিসেম্বর ১৯৫৭-এ মালিক ফিরোজ খান নুন পাকিস্তানের সপ্তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। দ্রুত ঘটনা ঘটছিলো। পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব তীব্র আকার ধারণ করলো। কারণ রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতার লোভ ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল দেশের পরিস্থিতি নাজুক করে তুলেছিল।
পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিতেও চরম অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৫৮ সালে প্রাদেশিক পরিষদে এক কলঙ্কজনক ঘটনা ঘটে। অধিবেশন চলাকালে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলী সাংসদগনের হামলায় নিহত হন। ক্রমাগত রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা, ক্ষমতার লড়াই এবং দেশে সামগ্রিক উন্নয়নের অভাবের কারণ দেখিয়ে১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর ইস্কান্দার মির্জা সংবিধান বাতিল করেন এবং সামরিক আইন (Martial Law) জারি করেন। এরপর গনতান্ত্রিক কার্যক্রম রহিত করে রাজনৈতিক দলগুলো নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলো। সামরিক আইন জারির ২০ দিন পর, ২৭ অক্টোবর ১৯৫৮-এ সেনাবাহিনীর তৎকালীন প্রধান জেনারেল আইয়ুব খান রাষ্ট্রপতি ইস্কান্দার মির্জাকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। এবং নিজে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা গ্রহণ করেন। এর সূত্র ধরেই পাকিস্তানে প্রথম সামরিক শাসনের সূচনা হয়।
বস্তুত ১৯৫৭-৫৮ সালের পাকিস্তানে ছিলো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ব্যর্থতা এবং বন্দুকের জোরে ক্ষমতা দখলের এক সন্ধিক্ষণ। যার ফলে পশ্চিম পাকিস্তানকেন্দ্রিক ক্ষমতার দাপট আরও পাকাপোক্ত হয়ে উঠে। যে সময়ে পাকিস্তান চরম রাজনৈতিক কলহের মুখে ভ্রাতৃঘাতী কর্মকান্ডে লিপ্ত সে সময়ে পৃথিবীতে মহাকাশ বিজ্ঞানের অবিস্মরণীয় সাফল্যের আনন্দে ভাসছে সোভিয়েত রাশিয়া।
১৯৫৭ সালের ৪ অক্টোবর সোভিয়েত ইউনিয়ন বিশ্বের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ স্পুটনিক-১ (Sputnik 1) উৎক্ষেপণ করে। এই ঘটনায় বিশ্বজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করে। বিশ্ববাসীর ধারণা জন্মে সোভিয়েতরা ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে অনেকটাই এগিয়ে। এই ঘটনা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে আতঙ্কিত করে তুলে। তারাও মহাকাশ যাত্রায় নিয়োজিত হয়। অতপর শুরু হয় মহাকাশ দৌড় প্রতিযোগিতা।
এদিকে জুমন আলী প্রধান ও তার ছোটভাই নিয়ামত সরকার বন্দুক কেনার জন্য মরিয়া হয়ে উঠলো।
তাদের ভগ্নিপতি মাগন আলী সরকার পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগের দক্ষিণ ময়মনসিংহের ভালুকা অঞ্চলের নেতা। জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার ভালো বোঝাপড়া। উচ্চ পর্যায়ের নেতাদের হাত করে তিনি ঠিকাদারি কাজ বাগিয়ে নেয়ার জন্য ময়মনসিংহ ও ঢাকার ডিসি অফিসে ঘুর ঘুর করেন। এই মাগন আলী সরকার তাদের দু’জনকে ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য দুটি বন্দূক ক্রয়ের অনুমতির ব্যবস্থা করে দিলেন। সেইসাথে বন্দুক চালানোর লাইসেন্সও পাইয়ে দিলেন। নতুন বন্দুক পেয়ে দুইভাই কখনো ভালুকার কাদিগড় ও মল্লিকবাড়ির বনেজঙ্গলে কোন কোনদিন আবার শ্রীপুরের সিমলাপাড়া, হাসিখালী, সালদহ নদীর পাড়ের গভীর অরণ্যে শিকারে বের হয়ে পড়ে। শিকার করা জুমনের এক নেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে এখন। প্রধানবাড়ির পাশেই ছোট বড় গহন,ঝোপঝাড়ে আকীর্ণ। শ্রীপুরসহ পুরো ভাওয়ালই বিপিন-বাদাড়ের স্বর্গরাজ্য।
জুমনের দূর সম্পর্কের চাচাতো শ্যালক শাহন আলী (আকন্দ শেখের ওরফে আক্কু ডাকাতের অনুজ) তহরজানের ভক্ত। বুবুজান বলতে অজ্ঞান। আপাত দৃষ্টিতে এই অসচ্ছল কোমল স্বভাবের কর্মপটু ছেলেটা দিনে দিনে জুমনের মনও জয় করে নিয়েছে। সারাদিন তার সঙ্গে কাজ করে, শিকারে গেলে বন্দুকটা কাঁধে নিয়ে তার পেছনে পেছনে ঘুরে। প্রায়শঃই রাতেও নিজের বাড়ি ফেরেনা শাহন। তহরজান তাকে স্নেহ করে, একটা ভালো কিছু রান্না হলে তারজন্য আলাদা করে রেখে দেয়। হাসেমকে কাঁধে চড়িয়ে সে স্কুলে নিয়ে যায় সে। কাসেম আর খালেককে নসু শেখের পুকুরে নিয়ে গোসল করিয়ে আনে। পূর্ব গাজীপুরে মাত্র দুটো পুকুর, একটা তহরজানের বাবার বাড়ির (মাদবর বাড়ি) আর একটা এই নসু শেখের পুকুর। মাদবর বাড়ির ইঁদারা থেকে এই এলাকার মানুষ খাবার পানি সংগ্রহ করে। শাহন আলীও এখান থেকে ছোট প্রধানবাড়ির জন্য কলস ভরে খাবার পানি এনে দেয়। নসু শেখের পুকুরের পানিও পান করার উপযোগী। অপেক্ষাকৃত নিকটে বলে জরুরি প্রয়োজনে নসুর পুকুর থেকে খাওয়ার পানি আনার কাজে শাহনের ডাক পড়ে।
শিকারের সময় শাহন আলী জুমনের বন্দুক নিয়ে গুলি ছোঁড়ার পদ্ধতি শিখে নিয়েছে। মাঝেমধ্যে সে ও গুলি করে হরিয়াল,বনমোরগ আর সহজলভ্য ঘুঘু শিকার করে। জুমন বাহবা দিয়ে বলে, “তর আত ত সই আছেরে, গুলি মিস অয়না।”
সেদিন আশেপাশে শিকার মেলেনি। ক্ষিপ্ত মেজাজে হাসিখালির জঙ্গলের গভীরে যেতে থাকে জুমন। শাওন পেছন থেকে সাবধান করে তাকে। ডাকে, ভাইছাব, “আর আগ্গাইয়া যাওন ঠিক অইবোনা। এই জাগাডা ভালানা। লইন বাইত যাইগা। নুরারবাপের জঙ্গলে ডুহি আর অইরাল আছে। লইন আউজকা ওগুলাই শিহার করি।” জুমন উত্তর দেয়, “সামনে একটা নিচা জাগা আছে, আশিখালির বাইদ। অইহানো পাখি পড়ে, বনমোরগ নামে। ল অইহানটা ঘুইরা আহি।”
গজারীর নতুন চারায় আচ্ছন্ন এই বিস্তৃত বনভূমি। সামনে একটা বাঁকের পাশে নিচু জায়গা, অনেকটা ছোট্ট উপত্যকার(Valley) মতো। উর্বর ধানী জমি। বর্ষাকালে বিপিনের পানি এসে পুরো জমিটা ডুবিয়ে দেয়। স্রোতের টানে এই পানি সরু পথ ধরে বনশেষের নদীতে গিয়ে নামে। কয়েক একর জলমগ্ন জায়গায় প্রচুর ছোট মাছেরা এসে ভীড় জমায়। কই, মাগুর, শিং, টাকি,টেংরা, পুঁটি মাছ নিরাপদে সাময়িক আটকা পানিতে ডিম পারে। তারপর স্বল্পপানির এটুকু জায়গা অসংখ্য মাছশিশুতে ভরে যায়। বর্ষাশেষে দু-তিন মাস পর পানি কমতে থাকে। তখন প্রচুর মাছ ধরা পড়ে। তিনদিকে বন নিয়ে এই হাসিখালীর বাইদ শীতকালে পুরোটা শুকিয়ে যায়। তখন অরণ্যের গভীর থেকে নেমে আসে বনপাখি শামুকভাঙা, বনমোরগ। ঘুঘু হরিয়াল, বক আসে আশেপাশের জলাজমি আর অটবী থেকে। তাদের অবাধ বিচরণ ও অনায়াস খাদ্যান্বেষণের ব্যস্ত সময়ে শিকারীরা খুব সহজে ছড়রা গুলিতে জোলা ভরে শিকার করে। জুমনের আজ সেই নেশায় পেয়ে বসেছে। শাহনকে ডেকে বলে, “আয় আমার লগে। রাও করিছনা। শব্দ হুনলে পাহি উইড়া যাইবো।” ওরা দুজন যথাসম্ভব শব্দহীন পা টিপে টিপে জায়গাটার কাছে চলে এসেছে। বন থেকে অপেক্ষাকৃত নিচু জমিতে ধান চাষের সুবিধার্থে পানি আটকানোর জন্য মাঝে মাঝে উঁচু আইল তৈরি করা হয়েছে। একে বলে বান ( বাধ)। জুমন লক্ষ্য করে অরণ্যের প্রান্তে একরকম একটা আইলের নিচের দিকে ময়ূরের পেখমের মতো কিছু একটা চিকচিক করছে। সন্তর্পণে এগিয়ে যায় সে। যাই হোক, আজ শিকার মেলেনি, সামনে যেটা পেয়েছে তাকেই গুলি করবে। অতি সন্তর্পণে হামাগুড়ি দিয়ে আরও কাছে এগিয়ে যায় জুমন। আইলের নিচে বনের ঢালুতে ছায়া পড়েছে। ওখানে একটা জন্তুর খাড়া দুটো কানের মতো,বড় ময়ূরের পাখনা মনে হলো। ওখানে রোদের আলো পড়ায় বস্তুটা তার দৃষ্টির গোচরে এলো। হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে সে। তার অবস্থান অপেক্ষাকৃত উঁচুতে। সামনের দিকে প্রায় দুইহাত নিচে অস্পষ্ট, সম্ভবত বড়ো একটা পাখি। মাত্র দশহাত দূরে থেকে সেদিকে বন্দুক তাক করলো জুমন। অপরাহ্নের রোদের আলোয় জায়গাটা স্পষ্ট হয়ে উঠবার আগেই ট্রিগারে আঙ্গুল নেয় সে। একটু দূরে দাঁড়িয়ে সব প্রত্যক্ষ করছিলো শাহন। দেখে এক বন থেকে আরেক বনে গমনেচ্ছু একটা বড়ো নেকড়ে এই ঢালু জায়গাটাটুকু পার হচ্ছে। হঠাৎ চাপাস্বরে চিৎকার করে উঠে শাহনালী, “ভাইছাব। গুলি কইরুননা যেন। পিছাইয়া আইয়া পড়ুইন।” ততক্ষণে জুমনের চোখ ও আটকে যায় ওখানে। স্পষ্ট দেখতে পায় ওটা বাঘ। তার সতর্ক খাড়া দুটো কান একটু নাড়িয়ে হেলেদুলে এগিয়ে যাচ্ছে বাইদের ওপারের ঘনপাতার নিবিড় গহীনে। বিশ-পঁচিশ হাতের ব্যবধান মাঝখানে রেখে পাশাপাশি দুটি বিশাল বনভূমি। হিংস্র পশুটা উঁচু আইলের পাশ ঘেঁষে এটুকু জায়গা পার হওয়ার সময়টুকুতে দুচোখ বন্ধ করে রাখে জুমন।
জোরে নিশ্বাস ছাড়ে সে। প্রাণপণে দেহটাকে মাটির সঙ্গে যথাসম্ভব মিশিয়ে চেপে ধরে রাখে। এই শার্দূলের নজরে পড়লে আর রক্ষা নাই। ভাগ্য ভালো, গুলি ছোঁড়েনি সে। পাখি মারার ছড়রা গুলি। এটা বাঘের গায়ে লাগলে তাকে ঘায়েল করা তো দূরের কথা, উপরন্তু চামড়ায় আঘাত পেয়ে উল্টো জুমনের উপর ঝাপিয়ে পড়তো ক্রুদ্ধ এই নরখাদক। ঘেমে গেছে সে। তবে কোন বিপদ হলোনা। বনরাজ কিছু বুঝতে না পেরে নীরবে আয়েশি ভঙ্গিতে পাশের জঙ্গলে অন্তর্হিত হলো।

Leave a Reply