
আমার বাবা মোঃ ইসমাইল হোসেন। তিনি শুধু আমার জন্মদাতা নন, তিনি আমার জীবনের একজন আদর্শ মানুষ, একজন নৈতিক শিক্ষক এবং আমার কাছে অনুসরণীয় এক মহান ব্যক্তিত্ব।
২০১৪ সালের ১২ আগস্ট আমার বাবা আমাদের ছেড়ে না-ফেরার দেশে চলে যান। দেখতে দেখতে তাঁর চলে যাওয়ার বারো বছর পূর্ণ হয়েছে। ১২ আগস্ট (বুধবার) ২০২৬ তাঁর ১২তম মৃত্যুবার্ষিকী। বাবাকে হারানোর শূন্যতা কখনো পূরণ হবার নয়। সময় যত গড়িয়েছে, তাঁর স্মৃতি, তাঁর আদর্শ এবং তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা তত গভীর হয়েছে।
বাবার মৃত্যুর দিনের কথা আজও আমার চোখের সামনে ভাসে। গাজীপুর জেলার শ্রীপুরে আমার দাদার নামে প্রতিষ্ঠিত কাছম আলী ন্যাশনাল আইডিয়াল স্কুল মাঠে সেদিন বিকেলে তাঁর নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজার পর টেপিরবাড়ি গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। সেদিন আকাশ থেকে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছিল। আজও মনে হয়, বাবার চলে যাওয়ার শোকে বুঝি আকাশও কেঁদেছিল। প্রকৃতিও যেন সেদিন আমাদের দুঃখের সঙ্গে একাত্ম হয়েছিল। আমার বাবার জানাজার নামাজে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গসহ প্রায় সাত হাজার ধর্মপ্রাণ মুসল্লি উপস্থিত ছিলেন। এত বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতি আমাদের পরিবারের জন্য যেমন ছিল বেদনার মুহূর্তে সান্ত্বনা, তেমনি এটি ছিল বাবার সারাজীবনের কর্ম ও মানুষের প্রতি ভালোবাসার এক নীরব স্বীকৃতি। তিনি মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন, মানুষের দুঃখে সহমর্মী হয়েছেন, অসহায় মানুষের সহযোগিতা করেছেন। তাই তাঁর শেষ বিদায়েও মানুষ ভালোবাসা নিয়ে ছুটে এসেছিল।
২০১৪ সালের ১৬ আগস্ট কাছম আলী ন্যাশনাল আইডিয়াল স্কুল মাঠে তাঁর কুলখানি অনুষ্ঠিত হয়। সেখানেও এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা আমাদের আরও উপলব্ধি করিয়েছিল, একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয় তাঁর সম্পদ বা পদমর্যাদায় নয়, মানুষের জন্য তাঁর কাজ এবং মানুষের হৃদয়ে তাঁর অবস্থানের মধ্যেই নিহিত।
একজন সন্তানের প্রথম বিদ্যালয় তার পরিবার এবং প্রথম শিক্ষক তার বাবা-মা। আমার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। ছোটবেলা থেকেই বাবার কাছ থেকে সততা, পরিশ্রম, শৃঙ্খলা, সময়ের মূল্য, দায়িত্ববোধ এবং মানবিকতার শিক্ষা পেয়েছি। বাবা কখনো শুধু উপদেশ দিয়ে আমাদের শিক্ষা দেননি। বরং নিজের জীবনাচরণের মাধ্যমে তিনি আমাদের সামনে একটি আদর্শ স্থাপন করেছেন। তাঁকে দেখেছি কঠোর পরিশ্রম করতে, পরিবারের দায়িত্ব পালন করতে এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও ধৈর্য ধরে এগিয়ে যেতে। তিনি কখনো কোনো সমস্যার কাছে সহজে মাথা নত করতেন না। জীবনে নানা সংকট এসেছে, নানা প্রতিকূলতা এসেছে, কিন্তু তাঁকে ভেঙে পড়তে দেখিনি। তিনি বিশ্বাস করতেন, ধৈর্য, পরিশ্রম ও আল্লাহর ওপর ভরসা থাকলে কঠিন পরিস্থিতিও মোকাবিলা করা সম্ভব।
আমার বাবা ছিলেন আমার আদর্শ মানুষ। আমার দৃষ্টিতে আমার বাবা ছিলেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বাবা। তিনি ছিলেন একজন ভালো অভিভাবক, একজন সৎ মানুষ এবং একজন দায়িত্বশীল সমাজকর্মী। তিনি তাঁর ভাইদের মধ্যে ছিলেন সবার বড়। ছোট ভাইয়েরা তাঁকে অত্যন্ত সম্মান করতেন। আমার চাচারা তাঁকে ‘দাদা’ বলে সম্বোধন করতেন। পরিবারের বড় হিসেবে তিনি শুধু দায়িত্ব পালন করেননি, সবাইকে ভালোবাসা ও স্নেহের বন্ধনে ধরে রেখেছিলেন।
আমার বাবা ম্যাট্রিক পাস করার পর কিছুদিন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। শিক্ষকতার মাধ্যমে তিনি মানুষের জীবন গঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তীতে ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়ে সফলতা ও প্রশংসা অর্জন করেন।
বাবার জীবনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি ছিল সমাজের প্রতি তাঁর দায়িত্ববোধ। আমাদের গ্রামে সমাজব্যবস্থা বিদ্যমান ছিল। সেই সমাজের প্রধান হিসেবেও তিনি মৃত্যুর পূর্বক্ষণ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছেন। মানুষ তাঁর কাছে বিচার-বিবেচনা, পরামর্শ ও সহযোগিতার জন্য আসত। তিনি ধৈর্য ধরে সবার কথা শুনতেন এবং ন্যায়সংগত সমাধানের চেষ্টা করতেন। আমাদের বাড়ির সামনে জামে মসজিদ, ফোরকানিয়া মাদরাসা ও স্কুল প্রতিষ্ঠায় তাঁর বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। মসজিদ, মাদরাসা ও কবরস্থানের জন্য তিনি জমি দান করে গেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি সমাজকে এগিয়ে নিতে হলে শিক্ষা, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং মানবিকতার বিকাশ ঘটাতে হবে। তাঁর সামাজিক কর্মকাণ্ডের মধ্যেও এই বিশ্বাসের প্রতিফলন ছিল।
১২ আগস্ট (বুধবার) তাঁর ১২তম মৃত্যুবার্ষিকীর প্রাক্কালে বাবার জীবনের দিকে ফিরে তাকালে উপলব্ধি করি, তিনি আসলে নিজের জন্য খুব বেশি কিছু চাননি। তিনি চেয়েছিলেন পরিবার ভালো থাকুক, সমাজ ভালো থাকুক, মানুষ ভালো থাকুক। আর আমাদের কাছে তাঁর সবচেয়ে বড় চাওয়া ছিল একটাই, আমরা যেন ভালো মানুষ হই। সেই চাওয়াটিই আজ আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
আমার বাবা মোঃ ইসমাইল হোসেনের জীবনকে শুধু একজন পরিবারের কর্তার জীবন হিসেবে দেখলে তাঁর প্রতি অবিচার করা হবে। তিনি ছিলেন একজন সমাজসচেতন মানুষ। নিজের পরিবারকে ভালো রাখার পাশাপাশি তিনি আশপাশের মানুষের জীবনমান উন্নয়নের কথাও ভাবতেন। এলাকার মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি ও কর্মসংস্থানের কথা চিন্তা করে বাবা টেপিরবাড়ি কৃষক সমবায় সমিতি গড়ে তুলেছিলেন। তিনি এই সমিতির প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি ছিলেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল এলাকার কৃষকদের সংগঠিত করা এবং তাঁদের প্রয়োজনের সময় সহজ শর্তে আর্থিক ও কৃষি সহায়তা নিশ্চিত করা। এই উদ্যোগের মাধ্যমে এলাকার অনেক দরিদ্র কৃষক উপকৃত হয়েছেন। অনেক পরিবার নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ পেয়েছে।
এলাকার কৃষকদের সেচ সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য ১৯৮০ সালে আমার বাবা নিজস্ব জমিতে একটি গভীর নলকূপ স্থাপন করেন। সেই সময়ে গভীর নলকূপ স্থাপনে প্রায় এক লাখ টাকা ব্যয় হয়েছিল। এই ব্যয়ের সিংহভাগ তিনি নিজেই বহন করেন। তাঁর নিজের জমির পাশাপাশি এলাকার মানুষের জমিতেও এই সেচ সুবিধা কাজে লাগত। একজন ব্যক্তির নিজের অর্থ ব্যয় করে এলাকার কৃষকদের জন্য এমন ব্যবস্থা করা খুবই প্রশংসনীয়।
আমার বাবা স্বাস্থ্য সচেতন মানুষ হিসেবে বাবা বিশুদ্ধ খাবার পানির গুরুত্বও উপলব্ধি করতেন। ১৯৭৮ সালে তিনি আমাদের বাড়িতে একটি টিউবওয়েল স্থাপন করেন।

Leave a Reply