কন্যাশিশুর ভবিষ্যৎ হোক সুরক্ষিত: প্রফেসর ড. মোঃ আবু তালেব

কন্যাশিশুর ভবিষ্যৎ হোক সুরক্ষিত: প্রফেসর ড. মোঃ আবু তালেব

নজমুল হক গাজীপুর


একটি কন্যাশিশুর চোখে থাকে হাজারো স্বপ্ন। কেউ চিকিৎসক হতে চায়। কেউ শিক্ষক, প্রকৌশলী কিংবা উদ্যোক্তা। কেউ দেশের নেতৃত্ব দিতে চায়। কিন্তু দারিদ্র্য, বাল্যবিবাহ, বৈষম্য ও নিরাপত্তাহীনতা অনেক মেয়ের স্বপ্নকে অঙ্কুরেই নষ্ট করে দেয়। যে বয়সে তার বই হাতে থাকার কথা, সে বয়সে অনেককে সংসারের বোঝা বহন করতে হয়। যে সময়ে তার নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার কথা, সে সময়ে অনেকের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেয় অন্যরা। এই বাস্তবতা কোনো সভ্য সমাজের কাম্য হতে পারে না। একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শিশুরা কীভাবে বেড়ে উঠছে তার ওপর। কন্যাশিশুরা নিরাপদে বেড়ে উঠলে, শিক্ষার সুযোগ পেলে এবং নিজেদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা অর্জন করলে দেশও এগিয়ে যায়। তাই কন্যাশিশুর অধিকার রক্ষা শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়। এটি জাতীয় উন্নয়নেরও গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য, ‘End child marriage and invest in girls’ rights’—অর্থাৎ বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে হবে এবং কন্যাশিশুর অধিকারে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। জাতিসংঘের এই আহ্বান আমাদের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশে মেয়েদের শিক্ষায় অগ্রগতি হলেও বাল্যবিবাহ এখনো বড় সামাজিক সমস্যা।


বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের MICS 2025 জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের ৪৭.২ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে। ১৩.৪ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই। অর্থাৎ প্রায় প্রতি দুই নারীর একজনের বিয়ে হয়েছে অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায়। ২০১৯ সালে ১৮ বছরের আগে বিয়ের হার ছিল ৫১.৪ শতাংশ। পাঁচ বছরে কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু এই অগ্রগতি যথেষ্ট নয়।বাল্যবিবাহ একটি মেয়ের জীবনকে বহু দিক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। অল্প বয়সে গর্ভধারণের ঝুঁকি বাড়ে। শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। নিজের আয় ও পেশা গড়ার সুযোগ কমে যায়। অনেক ক্ষেত্রে তাকে নির্যাতন ও নির্ভরশীলতার মধ্যেও জীবন কাটাতে হয়। প্রশ্ন হলো, এত ক্ষতিকর একটি প্রথা এখনো টিকে আছে কেন? এর পেছনে রয়েছে দারিদ্র্য, সামাজিক কুসংস্কার, নিরাপত্তাহীনতা এবং মেয়েদের সম্পর্কে পুরোনো দৃষ্টিভঙ্গি। অনেক পরিবার মনে করে, মেয়েকে দ্রুত বিয়ে দিলে দায়িত্ব কমবে। কোথাও সামাজিক চাপ কাজ করে। কোথাও মেয়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থেকে পরিবার এমন সিদ্ধান্ত নেয়। আবার দুর্যোগ, নদীভাঙন ও বাস্তুচ্যুতির মতো সংকটও ঝুঁকি বাড়ায়। কিন্তু মেয়ের বিয়ে দিয়ে পরিবারের দায়িত্ব শেষ হয় না। বরং তার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা সংকুচিত হয়। তাই বাল্যবিবাহ বন্ধে শুধু আইন প্রয়োগ করলেই চলবে না। পরিবারকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তাও দিতে হবে।


বাংলাদেশে মেয়েদের শিক্ষার প্রসারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। উপবৃত্তি ও অন্যান্য সহায়তা দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের বিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ বাড়িয়েছে। কিন্তু ভর্তি হওয়া আর শিক্ষা সম্পন্ন করা এক বিষয় নয়। এখনো অনেক মেয়ে মাধ্যমিক পর্যায়ে এসে পড়াশোনা ছেড়ে দেয়। কেউ পরিবারের আর্থিক সংকটে পড়ে। কাউকে ঘরের কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়। কেউ নিরাপদ যাতায়াতের অভাবে বিদ্যালয়ে যেতে পারে না। আবার কারও পড়াশোনা বন্ধ হয় বাল্যবিবাহের কারণে। এই পরিস্থিতি বদলাতে হবে। দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের জন্য উপবৃত্তি আরও কার্যকর করতে হবে। বিদ্যালয়ে নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার নিশ্চিত করতে হবে। মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা সহজ করতে হবে। যাতায়াত নিরাপদ করতে হবে। বিদ্যালয়ে যৌন হয়রানি ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। শিক্ষার্থীরা ঝরে পড়লে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয় ও স্থানীয় প্রশাসনকে কারণ অনুসন্ধান করতে হবে। ঝরে পড়া মেয়েদের আবার শিক্ষায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চল, চরাঞ্চল, উপকূলীয় এলাকা ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মেয়েদের প্রতি বাড়তি নজর দিতে হবে। শিক্ষা শুধু সনদ অর্জনের বিষয় নয়। শিক্ষা মানুষকে নিজের অধিকার বুঝতে শেখায়। আত্মবিশ্বাস তৈরি করে। যুক্তি দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। একটি শিক্ষিত মেয়ে নিজের জীবন বদলানোর পাশাপাশি পরিবার ও সমাজের উন্নয়নেও অবদান রাখতে পারে।
বাল্যবিবাহের সঙ্গে অর্থনৈতিক বৈষম্যের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ইউনিসেফের MICS 2025 তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারের নারীদের মধ্যে ১৮ বছরের আগে বিয়ের হার ৬৫ শতাংশ। সবচেয়ে ধনী পরিবারের ক্ষেত্রে তা ৪১ শতাংশ। উচ্চশিক্ষিত নারীদের ক্ষেত্রে হার অনেক কম। এই ব্যবধান দেখায়, বাল্যবিবাহ শুধু সামাজিক প্রথার সমস্যা নয়; এটি দারিদ্র্য ও সুযোগের বৈষম্যের সঙ্গেও যুক্ত। তাই দরিদ্র পরিবারকে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনতে হবে। শিক্ষা সহায়তা সময়মতো পৌঁছাতে হবে। মায়েদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার উদ্যোগ নিতে হবে। নারীদের জন্য প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্রঋণ ও উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ বাড়াতে হবে। তবে সহায়তা যেন শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে। প্রকৃত উপকারভোগী নির্বাচন করতে হবে। অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। কর্মসূচির ফলাফল নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে কন্যাশিশুদের ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করা জরুরি। তাদের কারিগরি শিক্ষা, ডিজিটাল দক্ষতা ও বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষায় উৎসাহিত করতে হবে। উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি বাস্তব কর্মজীবনের প্রস্তুতিও দিতে হবে। কারণ শিক্ষা শেষ করেও যদি একটি মেয়ে কাজের সুযোগ না পায়, তাহলে তার সম্ভাবনার পূর্ণ বিকাশ ঘটে না। কন্যাশিশুর নিরাপত্তা শুধু পরিবারের ভেতরের বিষয় নয়। বিদ্যালয়, রাস্তাঘাট, গণপরিবহন, খেলার মাঠ এবং অনলাইন—সব জায়গায় তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। যৌন হয়রানি, নির্যাতন, পাচার ও অনলাইন হয়রানির বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়তে হবে। অভিযোগ জানানোর সহজ ও নিরাপদ ব্যবস্থা থাকতে হবে। ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করা যাবে না। তার পরিচয় ও মর্যাদা রক্ষা করতে হবে। দ্রুত তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। অভিভাবকদেরও সচেতন হতে হবে। মেয়েদের চলাফেরা সীমিত করে নিরাপত্তার দায় শেষ করা যায় না। বরং নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে হবে। ছেলেশিশুদেরও ছোটবেলা থেকে সমতা, সম্মান ও সম্মতির শিক্ষা দিতে হবে। নারীকে সম্মান করার মানসিকতা পরিবার থেকেই গড়ে তুলতে হবে। কন্যাশিশুর মতামতকেও গুরুত্ব দিতে হবে। তার শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তার কথা শুনতে হবে। সে কী হতে চায়, কী শিখতে চায় এবং কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন—এসব প্রশ্নের উত্তর জানার চেষ্টা করতে হবে। তাকে শুধু সুরক্ষার বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। তাকে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার সক্রিয় অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।


বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর এক কোটিরও বেশি মেয়ে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে বিয়ের শিকার হয়। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৫ বছরে শিক্ষা, আইন সংস্কার ও সামাজিক সুরক্ষায় বিনিয়োগের ফলে আনুমানিক ৬ কোটি ৮০ লাখ বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে। এই অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, পরিকল্পিত উদ্যোগ ও ধারাবাহিক বিনিয়োগে পরিবর্তন সম্ভব। বাংলাদেশেও এখন প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। সরকারকে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে নির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, অভিভাবক, ধর্মীয় নেতা ও নাগরিক সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। বাল্যবিবাহের খবর পেলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। জন্মনিবন্ধন ও বয়স যাচাই নিশ্চিত করতে হবে। বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া মেয়েদের তালিকা তৈরি করে তাদের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। বাজেট বরাদ্দের পাশাপাশি তার কার্যকর ব্যবহার ও ফলাফল নিশ্চিত করতে হবে। পরিবারকে বুঝতে হবে, মেয়ের বিয়ে দেওয়া নয়, তাকে যোগ্য করে তোলাই প্রকৃত দায়িত্ব। সমাজকে বুঝতে হবে, মেয়ের স্বপ্নের কোনো লিঙ্গভিত্তিক সীমা থাকতে পারে না। রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে, জন্মের পরিচয় যেন কোনো শিশুর সম্ভাবনার পথে বাধা না হয়। আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবসে তাই আমাদের অঙ্গীকার হোক স্পষ্ট। কোনো মেয়ের শৈশব দারিদ্র্যের কাছে হার মানবে না। কোনো কিশোরীর পড়াশোনা বাল্যবিবাহের কারণে থেমে যাবে না। কোনো মেয়ে নিরাপত্তাহীনতার ভয়ে স্বপ্ন দেখা ছেড়ে দেবে না। কন্যাশিশুর ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করা মানে শুধু একটি শিশুকে রক্ষা করা নয়। এর অর্থ একটি পরিবারকে শক্তিশালী করা, সমাজকে এগিয়ে নেওয়া এবং দেশের মানবসম্পদকে সমৃদ্ধ করা।


প্রতিটি মেয়ের মধ্যে রয়েছে দেশ গড়ার সম্ভাবনা। সেই সম্ভাবনাকে বিকশিত করার দায়িত্ব আমাদের সবার। কন্যাশিশুর অধিকার নিশ্চিত হোক। বাল্যবিবাহ বন্ধ হোক। প্রতিটি মেয়ে শিক্ষা, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিয়ে বেড়ে উঠুক। কারণ আজকের সুরক্ষিত কন্যাশিশুই আগামী দিনের সমৃদ্ধ বাংলাদেশের ভিত্তি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.