
গাজীপুর প্রতিনিধি
রাজধানী ঢাকা শুধু বাংলাদেশের প্রশাসনিক কেন্দ্র নয়। এটি দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা, চিকিৎসা ও কর্মসংস্থানের প্রধান কেন্দ্র। প্রতিদিন লাখো মানুষ নানা প্রয়োজনে ঢাকার পথে বের হন। কেউ কর্মস্থলে যান। কেউ চিকিৎসার জন্য আসেন। কেউ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যান। কেউ জীবিকার তাগিদে রাস্তায় নামেন। তাদের সবার একটি মৌলিক প্রত্যাশা—নিরাপদে ঘরে ফেরা। কিন্তু সেই নিরাপত্তাই আজ বড় প্রশ্নের মুখে।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনে ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ে প্রাণ হারিয়েছেন বগুড়ার বাগবাড়ি সরকারি বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রনজিনা পারভীন। চিকিৎসার জন্য স্বামীর সঙ্গে ঢাকায় এসেছিলেন তিনি। ভোরে গাবতলী থেকে রিকশায় করে ফার্মগেটের দিকে যাচ্ছিলেন। সংসদ ভবনের সামনে মোটরসাইকেলে আসা ছিনতাইকারীরা তাঁর ব্যাগ ধরে টান দেয়। তিনি চলন্ত রিকশা থেকে পড়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান। পরে হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। ঘটনাটি শুধু একটি পরিবারের জন্য শোকের নয়। এটি পুরো রাজধানীর নিরাপত্তাব্যবস্থার জন্য একটি কঠিন প্রশ্ন। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, ঘটনাটি ঘটেছে জাতীয় সংসদ ভবনের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার সামনে। জায়গাটি রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। সেখানে নিরাপত্তা, নজরদারি ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার ঘাটতি থাকার কথা নয়। তারপরও ছিনতাইকারীরা মোটরসাইকেলে এসে প্রকাশ্যে একজন নারীর ব্যাগ ধরে টান দেওয়ার সাহস পেল। প্রশ্ন হলো, তারা এতটা নিশ্চিন্ত হলো কীভাবে? ঘটনার পর র্যাব দুজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে। তাদের একজনকে মূল সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মোটরসাইকেলও জব্দ করা হয়েছে। এটি অবশ্যই স্বস্তির খবর। কিন্তু শুধু গ্রেপ্তার যথেষ্ট নয়। তদন্ত দ্রুত শেষ করতে হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনের সর্বোচ্চ সীমার মধ্যে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে এই চক্রের পেছনে আর কারা আছে, সেটিও খুঁজে বের করতে হবে। কারণ ছিনতাই এখন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ঢাকা মহানগর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ জুন থেকে ২০২৬ সালের ৩১ মে পর্যন্ত রাজধানীর ৫০টি থানায় ছিনতাইয়ের ঘটনায় ৪১৮টি মামলা হয়েছে। অর্থাৎ গড়ে মাসে প্রায় ৩৫টি মামলা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে তেজগাঁও বিভাগে—১০৬টি। এরপর ওয়ারীতে ৯১টি এবং মতিঝিলে ৭৩টি মামলা হয়েছে। তবে মামলার সংখ্যা দিয়ে পুরো চিত্র বোঝা যায় না। সব ঘটনা থানায় মামলা হয় না। অনেকে ঝামেলা এড়াতে মামলা করেন না। কেউ পরিচয় বা সময়ের অভাবে অভিযোগ করেন না। ফলে সরকারি পরিসংখ্যানের বাইরে আরও ঘটনা থাকার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ডিএমপির অপরাধ তথ্যভান্ডারও উদ্বেগের চিত্র তুলে ধরে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে ছিনতাই ও ডাকাতির সঙ্গে জড়িত ৬ হাজার ১৯৮ জনের তথ্যভান্ডার রয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৭৩৭ জন ছিনতাইয়ে জড়িত হিসেবে তালিকাভুক্ত। এত বড় একটি অপরাধী নেটওয়ার্ক থাকলে শুধু অভিযান চালিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। প্রয়োজন ধারাবাহিক ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা।
ঢাকার প্রতিটি ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক চিহ্নিত করতে হবে। কোন এলাকায় কখন বেশি ছিনতাই হয়, তার একটি হটস্পট ম্যাপ তৈরি করা দরকার। ভোর, রাত ও গভীর রাতে কোন সড়কে অপরাধ বেশি হয়, সেই তথ্য বিশ্লেষণ করতে হবে। সিসিটিভি ক্যামেরা বাড়াতে হবে। শুধু ক্যামেরা বসালেই হবে না। সেগুলো সচল রাখতে হবে। নিয়মিত মনিটরিং করতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও স্থাপনার আশপাশে ক্যামেরার ফুটেজ সংরক্ষণের কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে। মোটরসাইকেল ব্যবহার করে ছিনতাই এখন একটি পরিচিত কৌশল। তাই সন্দেহজনক মোটরসাইকেল চলাচল শনাক্তে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। প্রয়োজন হলে নম্বরপ্লেট শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে। অপরাধে ব্যবহৃত যানবাহনের তথ্য দ্রুত সব থানায় পৌঁছাতে হবে। পুলিশের টহলও হতে হবে তথ্যভিত্তিক। একই জায়গায় নিয়মিত টহল দেখিয়ে দায়িত্ব শেষ করলে চলবে না। অপরাধের সময় ও স্থান বিশ্লেষণ করে টহল দিতে হবে।
অভিযান যে হচ্ছে না, তা নয়। ২০২৫ সালের শেষ তিন মাসে রাজধানীতে ৮১০ জন ছিনতাইকারী গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছিল ডিএমপি। ডিসেম্বরেই গ্রেপ্তার করা হয়েছিল ৫৬৪ জন। তারপরও ছিনতাই পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। এখানেই মূল সমস্যা। প্রশ্ন হলো, গ্রেপ্তার হওয়ার পরও একই অপরাধীরা কীভাবে আবার মাঠে ফিরে আসে? মামলার তদন্ত কোথায় আটকে যায়? জামিনের পর নজরদারি থাকে কি না? অপরাধীদের তথ্যভান্ডার কি মাঠপর্যায়ের পুলিশের কাজে যথেষ্ট ব্যবহার হচ্ছে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। শুধু ছিনতাইকারী ধরলেই হবে না। অপরাধের অর্থনৈতিক ভিত্তিও ভাঙতে হবে। চোরাই মোবাইল, ছিনতাই করা মালামাল কোথায় বিক্রি হয়, কারা সেগুলো কেনে বা বিক্রি করে—সেই চক্রও শনাক্ত করতে হবে। অপরাধী যেমন গুরুত্বপূর্ণ, অপরাধের বাজারও তেমন গুরুত্বপূর্ণ।
নাগরিকদের সচেতনতাও প্রয়োজন। চলন্ত রিকশা বা মোটরসাইকেলে ব্যাগ এমনভাবে রাখা উচিত নয়, যাতে বাইরে থেকে সহজে টানা যায়। তবে এই পরামর্শ কখনোই অপরাধের দায় ভুক্তভোগীর ওপর চাপাতে পারে না। ব্যাগের অবস্থান নয়, অপরাধীর অপরাধই মূল বিষয়। রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব নাগরিককে নিরাপত্তা দেওয়া। একজন শিক্ষক চিকিৎসার জন্য রাজধানীতে এসে যদি রাস্তায় প্রাণ হারান, তাহলে সেই মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি নয়। এটি নাগরিক আস্থার ওপর আঘাত। রাজধানীর মানুষ পুলিশের উপস্থিতি দেখতে চায়। তারা শুধু অভিযান নয়, ফলাফল দেখতে চায়। তারা চায় রাতের ঢাকা নিরাপদ হোক। ভোরের ঢাকা নিরাপদ হোক। ব্যস্ত সড়ক নিরাপদ হোক। নির্জন সড়কও নিরাপদ হোক।
জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে রনজিনা পারভীনের মৃত্যু আমাদের জন্য সতর্কবার্তা। এই মৃত্যু যেন আরেকটি সংবাদ হয়ে হারিয়ে না যায়। তাঁর মৃত্যুর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করতে হবে। জড়িতদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে রাজধানীর ছিনতাইপ্রবণ এলাকাগুলোতে সমন্বিত নিরাপত্তা পরিকল্পনা নিতে হবে। নাগরিক নিরাপত্তা কোনো বিলাসিতা নয়। এটি মানুষের মৌলিক অধিকার। আমরা এমন একটি ঢাকা চাই, যেখানে চিকিৎসার জন্য আসা একজন শিক্ষক নিরাপদে হাসপাতালে পৌঁছাতে পারবেন। একজন শ্রমজীবী মানুষ রাতের কাজ শেষে নিরাপদে বাড়ি ফিরবেন। একজন নারী ভোরে রাস্তায় বের হলে আতঙ্কিত হবেন না। আর কোনো রনজিনা পারভীনকে যেন ছিনতাইকারীর হ্যাঁচকা টানে জীবন দিতে না হয়। নিরাপদ রাজধানী গড়তে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ চাই। আর প্রাণহানি নয়।

Leave a Reply