নজমুল হক, স্টাফ রিপোর্টার গাজীপুর
একটি দেশের উন্নয়নের গল্প কেবল পরিসংখ্যান, অবকাঠামো বা জিডিপির প্রবৃদ্ধির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর গভীরে লুকিয়ে থাকে কোটি শ্রমজীবী মানুষের নিরলস পরিশ্রম, ত্যাগ ও স্বপ্ন। বাংলাদেশ আজ যে মধ্যম আয়ের দেশের পথে এগিয়ে যাচ্ছে, তার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান শ্রমিক শ্রেণির—যাদের ঘামে ভিজে গড়ে উঠেছে কারখানা, সড়ক, সেতু, শহর ও অর্থনীতির ভিত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশের শ্রমশক্তির সংখ্যা ৭ কোটিরও বেশি। এদের একটি বড় অংশ কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতে যুক্ত। তৈরি পোশাক শিল্প—যা দেশের রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশেরও বেশি জোগান দেয়—সেখানে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করেন, যার অধিকাংশই নারী। তাদের পরিশ্রমই বাংলাদেশকে বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশে পরিণত করেছে। কিন্তু এই সাফল্যের আড়ালে শ্রমিকদের জীবনমানের বাস্তবতা কতটা উন্নত—সেই প্রশ্ন আজও প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশে প্রায় ৮৪ শতাংশ শ্রমিক অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর নেই চাকরির নিরাপত্তা, নেই পেনশন, স্বাস্থ্যবীমা বা সামাজিক সুরক্ষা। প্রতিদিনের আয়ে নির্ভরশীল এই শ্রমিকদের জন্য অর্থনৈতিক ধাক্কা মানেই জীবনের অনিশ্চয়তা। শহরের নির্মাণশ্রমিক থেকে শুরু করে গ্রামের দিনমজুর—সবাই একই বাস্তবতার মুখোমুখি।
মজুরি বৈষম্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। যদিও গার্মেন্টস খাতে সর্বনিম্ন মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছে, তবুও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে তা যথেষ্ট নয় বলে শ্রমিকদের অভিযোগ। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার মতে, একটি ‘লিভিং ওয়েজ’ বা জীবনধারণযোগ্য মজুরি এখনও অনেক ক্ষেত্রেই নিশ্চিত হয়নি। ফলে শ্রমিকরা দীর্ঘ সময় কাজ করেও সঞ্চয় বা উন্নত জীবনযাপনের সুযোগ পান না। শ্রমঘণ্টার দিক থেকেও বাংলাদেশি শ্রমিকরা অত্যন্ত পরিশ্রমী। অনেক ক্ষেত্রেই নির্ধারিত সময়ের বাইরে অতিরিক্ত কাজ করতে হয়, যা সব সময় যথাযথভাবে পারিশ্রমিক পায় না। এতে একদিকে উৎপাদন বাড়লেও অন্যদিকে শ্রমিকের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। শ্রমিক নিরাপত্তা প্রসঙ্গেও এখনও উদ্বেগ রয়ে গেছে। অতীতের বিভিন্ন শিল্প দুর্ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে—নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা কতটা জরুরি। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কারখানার নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কিছু অগ্রগতি হয়েছে, তবুও সব খাতে তা সমানভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। অন্যদিকে, নারী শ্রমিকদের অবদান অনস্বীকার্য হলেও তারা এখনও বৈষম্যের শিকার। সমান কাজের জন্য সমান মজুরি, মাতৃত্বকালীন সুবিধা এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অথচ নারীর অংশগ্রহণ ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।
এতসব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও শ্রমিকরাই দেশের উন্নয়নের চাকা ঘুরিয়ে চলেছেন। তাদের ঘামেই রচিত হচ্ছে অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গল্প। তাই উন্নয়নের এই ধারাকে টেকসই করতে হলে শ্রমিকদের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। এক্ষেত্রে সরকার, মালিকপক্ষ ও শ্রমিক সংগঠন—তিন পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
ন্যায্য মজুরি নির্ধারণ, অনানুষ্ঠানিক খাতকে ধীরে ধীরে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় আনা, দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি জোরদার করা এবং সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনী সম্প্রসারণ—এসব পদক্ষেপ সময়ের দাবি। শ্রমিক কেবল উৎপাদনের উপাদান নয়; তারা উন্নয়নের অংশীদার। তাদের বাদ দিয়ে কোনো উন্নয়নই টেকসই হতে পারে না। তাই উন্নয়নের গল্প যেন কেবল সংখ্যার খাতায় সীমাবদ্ধ না থাকে—তা নিশ্চিত করতে হবে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে। অতএব, আজ সময় এসেছে শ্রমিকের ঘামকে কেবল অর্থনৈতিক সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে নয়, বরং সম্মান ও ন্যায়বিচারের প্রতীক হিসেবে দেখার। কারণ সত্যিকার অর্থেই—শ্রমিকের ঘামেই রচিত হয় উন্নয়নের গল্প, আর সেই গল্প তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তাদের জীবনে আসে নিরাপত্তা, মর্যাদা ও প্রাপ্য অধিকার।

Leave a Reply