শ্রীপুরে প্রসূতি মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত শেষ না হতেই হাসপাতাল খোলার তোড়জোড়-প্রশাসনের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য

শ্রীপুরে প্রসূতি মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত শেষ না হতেই হাসপাতাল খোলার তোড়জোড়-প্রশাসনের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য

শ্রীপুর (গাজীপুর) প্রতিনিধি

গাজীপুরের শ্রীপুরে ভুল চিকিৎসায় প্রসূতি মৃত্যুর ঘটনায় অভিযুক্ত ‘লাইফ কেয়ার হাসপাতাল’ নিয়ে নাটকীয় মোড় নিয়েছে। চাঞ্চল্যকর এই মৃত্যুর ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন জমা হওয়ার আগেই হাসপাতালটি পুনরায় চালু করার তোড়জোড় শুরু হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগ যেখানে বিষয়টি নিয়ে চরম বিস্ময় প্রকাশ করেছে, সেখানে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার নামে ‘মৌখিক অনুমতি’ দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। প্রশাসনের এমন পরস্পরবিরোধী অবস্থানে জনমনে নানা প্রশ্ন ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

​গত ৮ তারিখ শ্রীপুর উপজেলার উজিলাব গ্রামের মানিক মিয়ার স্ত্রী রুমা (২৫) প্রসব বেদনা নিয়ে মাওনা চৌরাস্তার লাইফ কেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হন। স্বজনদের অভিযোগ, অভিজ্ঞ সার্জন ছাড়াই তড়িঘড়ি করে রুমার সিজারিয়ান অপারেশন করা হয়। অপারেশনের পর রোগীর অবস্থার অবনতি হলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গোপন রাখে। এক পর্যায়ে ভুল চিকিৎসা ও কর্তৃপক্ষের অবহেলায় রুমার মৃত্যু হয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে নিহতের স্বজন ও স্থানীয় জনতা হাসপাতালে বিক্ষোভ প্রদর্শন করলে এলাকায় উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় হাসপাতালটি সাময়িকভাবে সিলগালা করে দেন।

​আজ শুক্রবার সরেজমিনে মাওনা চৌরাস্তার ওই হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায় এক ভিন্ন চিত্র। সিলগালা করা হাসপাতালটির কলাপসিবল গেট খোলা এবং ভেতরে পুরোদমে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ চলছে। সংবাদকর্মীদের উপস্থিতি টের পেয়ে হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন।

​সেখানে দায়িত্বরত ম্যানেজার সংবাদকর্মীদের প্রশ্নের জবাবে দাবি করেন, তারা হাসপাতালটি দ্রুতই চালু করতে যাচ্ছেন। তবে আপাতত অপারেশন থিয়েটার (ওটি) বন্ধ থাকবে এবং অন্যান্য সাধারণ কার্যক্রম শুরু হবে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, তারা প্রশাসনের উচ্চমহলের সাথে যোগাযোগ করেই এই প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাদের আত্মবিশ্বাসী আচরণ দেখে মনে হয়েছে, পুনরায় চালুর বিষয়ে তারা সব ধরনের সবুজ সংকেত পেয়ে গেছেন।

​হাসপাতাল খোলার এই তোড়জোড় নিয়ে শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোঃ শফিকুল ইসলামের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, “এই হাসপাতালের বিরুদ্ধে পূর্বের একাধিক অভিযোগ রয়েছে। সর্বশেষ প্রসূতি মৃত্যুর ঘটনায় এটি সিলগালা করা হয়েছিল। একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে যার কাজ এখনো চলমান। তদন্ত রিপোর্ট জমা দেওয়ার আগে হাসপাতাল পুনরায় চালুর অনুমতির কোনো প্রশ্নই ওঠে না। স্বাস্থ্য বিভাগ এ বিষয়ে কোনো অনুমতি দেয়নি এবং হাসপাতাল খোলা থাকার বিষয়ে আমি কিছুই জানি না।”

​একই বিষয়ে গাজীপুরের সিভিল সার্জন জানান, লাইফ কেয়ার হাসপাতাল চালুর বিষয়ে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে কোনো নির্দেশনা বা অনুমতি দেওয়া হয়নি। স্বাস্থ্য বিভাগের এমন কঠোর অবস্থানের বিপরীতে উপজেলা প্রশাসনের অবস্থান বেশ রহস্যজনক।

​মুঠোফোনে শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি হাসপাতাল খোলার বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে তিনি একে ‘আংশিক অনুমতি’ হিসেবে দাবি করে বলেন, “দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় হাসপাতালের ভেতরে অনেক মালামাল ড্যামেজ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই সেগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার জন্য তাদের মৌখিক অনুমতি দেওয়া হয়েছে।” তবে সিলগালা করা একটি প্রতিষ্ঠান তদন্ত চলাকালীন এভাবে খোলার অনুমতি দেওয়া যায় কি না, সে বিষয়ে তিনি কোনো সদুত্তর দেননি।

​তদন্তাধীন একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে ভুল চিকিৎসায় মৃত্যুর মতো গুরুতর ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ রয়েছে, সেটি প্রতিবেদন জমা হওয়ার আগেই প্রশাসনের এমন নমনীয়তায় সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, এতে তদন্ত প্রক্রিয়ায় প্রভাব পড়তে পারে এবং আলামত নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

​নিহত রুমার স্বামী মানিক মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা স্ত্রীর হত্যার বিচার চেয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরছি। এখনো তদন্ত রিপোর্টই আসলো না, এর মধ্যেই খুনিদের হাসপাতাল খুলে দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। বিচার পাওয়ার আগেই যদি তারা আবার ব্যবসা শুরু করে, তবে আমরা কার কাছে বিচার পাবো? আমরা আশঙ্কা করছি, প্রভাবশালী মহলের চাপে তদন্ত রিপোর্ট পাল্টে যেতে পারে।”

​আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সিলগালা করা কোনো প্রতিষ্ঠান যদি তদন্তাধীন থাকে, তবে ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে আলামত সংগ্রহের প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু প্রশাসনের একক সিদ্ধান্তে মৌখিক অনুমতিতে গেট খুলে দেওয়া তদন্তের নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। শ্রীপুর থানা পুলিশ জানিয়েছে, তারা পুরো বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে। কোনো ধরনের অনিয়ম পেলে বা তদন্তে বিঘ্ন ঘটলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

​এদিকে, স্বাস্থ্য বিভাগ ও উপজেলা প্রশাসনের এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানে মাওনা এলাকায় চাঞ্চল্য বিরাজ করছে। এলাকাবাসীর দাবি, অবিলম্বে তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করতে হবে এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না করা পর্যন্ত কোনোভাবেই এই ‘মরণফাঁদ’ হাসপাতালকে কার্যক্রম শুরুর সুযোগ দেওয়া যাবে না।

​প্রশাসনের এই রহস্যজনক ভূমিকার শেষ কোথায়, আর নিহত রুমার পরিবার আদৌ ন্যায়বিচার পাবে কি না, তা এখন দেখার বিষয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published.