কাজল মালেক
জুমন আলী প্রধান গরুর পাল নিয়ে আর দূরে যেতে চায়না। গফুর বুঝতে পারে,এখন ঘর তাকে টানে। সন্তানের মায়া বড়ো মায়া। জয়গুনও মা হতে যাচ্ছে। সে যে মা হবে তা তহরজান সবার আগে ধরতে পেরেছিলো। সেদিন জয়গুনকে বমি করতে দেখে , তহরজান সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠে, “বুজান,কাম বাজাইছ নাহি? মুহে খালি তিতা তিতা লাগেনি। মাতা ঘুরায়?”
জয়গুন লজ্জা পায়। বলে, “যা এইহানতে। কি আবল তাবল বকতাছছ। গলায় তিতা ঢেহুর উডলো,বমি আইয়া পড়লো, আর কি অইবো?”
“না বুজান,কয়দিন থাইকা আমার পোলারে কোলে নিলেই কেমন নাক টানো। কও,কি গন্ধ গন্ধ লাগে। হাসেমরে সাবান দিয়া গোছল করাইছ ত। আমি কই, বুজান কি কয়। ওরে ত পরতেকদিন জলেভাসা সাবান দিয়া গোছল করাই, শইল্যে ছুনু পাউডার মাহি। পোলার শরীল থাইহা সুন্দর খুশবু বাইর অয়, আর তুমি কইলা পঁচা গন্ধ। হাছা কতা কও তো বু। তোমার কি মাতা ঘুরায়?” জয়গুনের মুখ আশার আলোয় উদ্ভাসিত হয়। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি খেলে। মাথা নাড়িয়ে জানায় তার মাথা ঘুরায়, বসা থেকে উঠতে গেলে পড়ে যাবে মনে হয়। তহরজান জয়গুনের পেটে হাত দেয়। বলে, “তুমি যে চিকনার চিকনা, এই ছোডো পেডে বড় পোলা ধরবা কেমনে। খাওন বাড়াও।”
“ফাইজলামি রাখ। তর ভাসুররে কিরমে কই, ক ত?”
” তোমার কিছু কইতে অইবোনা। আমি কইতাছি। হাসেমরে দেইহো।” বলে পুকুরপাড়ের দিকে ছুটে যায় তহরজান। পিছনে ডাকে জয়গুন, ” তহর, কইচনা,এহনি কইচনা। হাঁচা না মিছা বুইঝ্যা লই।” বিশাল জামগাছটার নিচে কাঠের বেঞ্চি পাতা। সেখানে বসে আছে গফুর আর জুমন। বৈশাখ মাসের খা খা রোদ আর খরতাপে এই ছায়ায় বসেও ঘামছে তারা। কয়দিন একটানা কালবৈশাখীর ঝড় বাদল গেছে। এখন আবার আকাশ ভরা কড়া রোদ আর তার সঙ্গে শুরু হয়েছে চামড়াপোড়া গরম। তহরজান এগিয়ে তাদের সামনে চলে আসে। জুমনকে ইশারা করে গফুর বলে, “দ্যাক, তর বউ তরে কিছু কইবো মনে অয়।” তহরজান হাসিমুখে বলে, “ভাইজান। এহনথাইহা বুজানের বেশি কইরা যত্ন নিবাইন। খবর আছে। আমনেহ বাপ অইতাছুইন।” তহরজান ফিক করে হেসে দ্রুত আবার ঘরে ফিরে যায়। জুমন লাফিয়ে উঠে, বলে, “ছোড়দা,তুই কিন্তু আইজ আমারে জিলাপি খাওয়াইবি, ছারমুনা।”
গফুর প্রসন্ন হয়ে বলে,”আগে অইতে দে। জিলাপি কেন, তরে আস্ত মোরগ খাওয়াইবাম।” একটু থেমে আবার বলে,”তর না আউজকা পিটি প্যারেডের ট্রেনিং আছে। যাইতি না?”
স্বাধীন পাকিস্তানের উৎসব হবে। সেখানে কুচকাওয়াজে অংশ নেবে বাছিরের প্যারেড দল। তারজন্য কুচকাওয়াজের অনুশীলন চলছে ক’দিন থেকে। জুমন এই প্যারেড বা কুচকাওয়াজ দলের অন্যতম চৌকস সদস্য।
এদিকে বিভিন্ন জায়গা থেকে দেশে হিন্দু মুসলিম দাঙ্গার খবর আসছে।যেখানে মুসলমান বেশি সেখানে হিন্দুদের মেরেধরে তাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিচ্ছে। সে অবর্ণনীয় মর্মান্তিক কাহিনী। ছোটো ছোটো শিশুদের অসহায় কান্না, বিতাড়িত হিন্দু যুবক-যুবতীদের অসম শক্তির প্রতিরোধে তারা শুধু মার খাচ্ছে। বয়ষ্করা এক কাপড়ে বাড়ি ছেড়ে অজানা নতুন ভারতের দিকে পাড়ি জমাচ্ছে। উল্টো চিত্র যে এলাকা হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা সেখানে। আসাম, এবং ভারত সীমারেখার পূর্বাঞ্চল থেকে মুসলমানরা নির্যাতিত হয়ে তারা বাড়িঘর ছেড়ে পূর্ব বাংলায় চলে আসছে। মৃত্যুর,অত্যাচারের আর সম্পত্তি বিসর্জনের এমন স্বাধীনতা চায়নি কেউ। কী ভয়ানক নির্মমতা। কাল যে ছিলো নিকট প্রতি, উৎসবে পার্বনে যাদের উপস্থিতি ছিলো অনিবার্য সেই ভালবাসার মানুষগুলো হঠাৎ শত্রুতে পরিণত হলো। প্রতিবেশীর যে শিশুটিকে কাল কোলে নিয়ে চুমো খেয়েছে আজ সেই একই মানুষ নিষ্পাপ অবোধ শিশুটিকে শূন্যে ছুঁড়ে আছরে মারছে। মানবতা,মানবাধিকার উধাও হয়ে গেছে।
এই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার জন্য উৎসবের দিন পিছিয়ে দেয়া হয়েছে। গাজীপুরের দিকে দাঙ্গা হাঙ্গামার তেমন কোন ঘটনা ঘটেনি। এই অঞ্চলে হিন্দুদের বসত কম। কয়েকটি উপজাতীয় মান্দাই পরিবার আছে। এরা অত্যন্ত নিরীহ ও দরিদ্র। তাদের প্রতি এলাকার মানুষের বরং সহানুভূতি বেশি।
দীর্ঘ প্রায় ২০০ বছরের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান স্বাধীনতা লাভ করে। এই স্বাধীনতা অর্জনের পথটি ছিল দীর্ঘ, সংগ্রামপূর্ণ এবং অসংখ্য মানুষের আত্মত্যাগে পূর্ণ। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের মাধ্যমে স্বাধীনতা আন্দোলন জোরালো রূপ নেয়। পরবর্তীতে মহাত্মা গান্ধী, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু, জওহরলাল নেহরু, সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল, ভগত সিং, চন্দ্রশেখর, মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, লিয়াকত আলী, একে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীসহ অসংখ্য নেতার নেতৃত্বে এই আন্দোলন পরিচালিত হয়।
প্রচন্ড ঝড় বয়ে গেলো গতরাতে। প্রধানবাড়ির পুকুরপাড়ের একটা আমগাছ উপড়ে গেছে। গাছের আমগুলো এখনো কচি, আটিও হয়নি।ছড়িয়ে ছিটিয়ে গাছের চারপাশে মাটিতে ছড়িয়ে আছে। তহরজান কিছু আম কুড়িয়ে নিচ্ছে। আচার বানাবে। জয়গুন আচার পছন্দ করে। তার
কোলে ছোট্ট শিশু ইসমাইল। হাটঁতে হাঁটতে সে ও চলে এসেছে। তহরজানের আম কুড়ানো দেখে বললো, “ঘরে কত আম। দুইক্কা ছালা ভইরা নিয়া আইছে। চালার আমবাগানের পড়া আম কতজনে লইয়া গেছে। এমন তুফান অইলো,সব আম পইড়া শ্যাষ। এইবার আর পানহা আম খাওন লাগতনা। তা তুই ইতা কি করতাচছ? ঘরে আয়, হাসেম দেকলাম বাইরে। টিপ টিপ কইরা হাঁটতাছে। পরধানী বাপজানরে সাবধানে রাহিস। হাঁটতে শিখছে। কখন পুষ্ককুনিতে আইয়া পড়ে। ঘরে কত আম আয় কইতাছি।” তহরজান আম কুড়াতে কুড়াতে উত্তর দেয়, “দুইক্কা কইথাইক্কা কইথাইক্কা টুহাইছে। জঙ্গইলা জাগা, বেক্কলডা তো গু মুত বাছেনা। যেহান থাইহা পাইছে নিয়া আইছে। আমি অই আম ছুইতামনা। বুজান,তোমারে এই বালা আম দিয়া আচার বানায়া দিবাম। তা তোমার হাসেম পরধানিরে কই দেখলা। আম্বির মার কাছে রাইখা আইলম তারে।”
জয়গুনের কোল থেকে শিশুটি নিচে নামতে চাইছে। তহরজানের কোলে যাবে বলে দুইহাত বাড়িয়ে আছে।
তহরজান আমগুলো আঁচলে নিয়ে বলে, “না ইসমাইল সোনা। আমার হাত ময়লা। অহন তরে কোলে নিতামনা। ঘরে যাও বাজান, ছোডো পরধানী। আমি একবারে গোসলডা সাইরা লই।”
১৩শ পর্ব। চলবে …

Leave a Reply