ব্রি’র মহাপরিচালক শূন্য পদে আওয়ামী ফ্যাসিবাদীদের দৌড়াত্ব

ব্রি’র মহাপরিচালক শূন্য পদে আওয়ামী ফ্যাসিবাদীদের দৌড়াত্ব

স্টাফ রিপোর্টার, গাজীপুর

বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার প্রধান চালিকাশক্তি এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) এখন নেতৃত্ব সংকটে ভুগছে। গত ৪ এপ্রিল বিদায়ী মহাপরিচালক ড. মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান অবসরে যাওয়ার পর থেকে প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ পদটি শূন্য রয়েছে। এই গুরুত্বপূর্ণ শূন্য পদটি দখল করতে পতিত আওয়ামী সরকারের সুবিধাভোগী ও ফ্যাসিবাদী মতাদর্শের অনুসারীদের তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ বিজ্ঞানী, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে।

​জানা গেছে, গত ২ এপ্রিল কৃষি মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে কৃষি সচিবের সভাপতিত্বে ছয়জন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে নিয়ে ব্রি’র সার্বিক অবস্থা এবং পরবর্তী মহাপরিচালক নিয়োগের বিষয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তবে সেই বৈঠকের পর এক সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত মহাপরিচালক পদে কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। দীর্ঘ সময় শীর্ষ পদটি খালি থাকায় প্রতিষ্ঠানের গবেষণা ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। বর্তমানে জরুরি সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য সবাই গবেষণা পরিচালকের কাছে গেলেও, তার কাছে মহাপরিচালকের পূর্ণ প্রশাসনিক ক্ষমতা না থাকায় তিনি আইনগতভাবে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিতে পারছেন না। এতে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ অনেক প্রজেক্টের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হচ্ছে।

​সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, মহাপরিচালক পদটি বাগিয়ে নিতে কমপক্ষে ১০ জন সম্ভাব্য প্রার্থী পর্দার আড়ালে ব্যাপক লবিং শুরু করেছেন। অভিযোগ উঠেছে, এই প্রার্থীদের মধ্যে এমন কিছু কর্মকর্তা রয়েছেন যারা বিগত আওয়ামী ফ্যাসিস্ট শাসনামলে রাজনৈতিক প্রভাবে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে পদোন্নতি পেয়েছেন। তাদের অনেকেই তৎকালীন প্রভাবশালী মন্ত্রীদের আত্মীয় পরিচয় দিয়ে বা দলীয় প্রভাব খাটিয়ে ব্রি’র গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হয়েছিলেন। এখন সরকার পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটেও তারা খোলস পাল্টে বিভিন্ন কৌশলে শীর্ষ পদটি দখল করার চেষ্টা চালাচ্ছেন।

​ব্রি’র সকল স্তরের বিজ্ঞানী ও কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, যদি মহাপরিচালক পদে পুনরায় কোনো আওয়ামী ফ্যাসিস্ট আদর্শে বিশ্বাসী ব্যক্তি নিয়োগ পান, তবে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার যে জাতীয় লক্ষ্য, তা চরমভাবে ব্যাহত হবে। বর্তমান সরকারের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে এমন নিয়োগ অন্তরায় হিসেবে কাজ করবে এবং সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হওয়ার বড় ঝুঁকি রয়েছে।

​নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী জানান, “বিগত বছরগুলোতে যারা মেধার তোয়াক্কা না করে কেবল তোষামোদি আর আত্মীয়তার জোরে ব্রি’র ওপর খবরদারি করেছেন, তারা আবারও ক্ষমতায় এলে গবেষণা কার্যক্রম রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কবলে পড়বে। আমরা চাই এমন একজন দক্ষ এবং নির্দলীয় বিজ্ঞানী এই দায়িত্বে আসুক, যিনি ব্রি’র দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে পারবেন।

​প্রতিষ্ঠানের সাধারণ কর্মীদের বিশ্বাস, ব্রি’র অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম ও গবেষণার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হলে বাইরের কাউকে নয়, বরং ব্রি’র নিজস্ব অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের মধ্য থেকেই যোগ্য একজনকে মহাপরিচালক নিয়োগ দেওয়া উচিত। তাদের মতে, বাইরের কোনো ব্যক্তিকে এই কারিগরি ও সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে নিয়োগ দিলে তার কার্যক্রম বুঝতে অনেক সময় লেগে যাবে, যা বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রতিষ্ঠানের জন্য ক্ষতিকর। এছাড়া বাইরের প্রার্থীদের অনেকের বিরুদ্ধেই বিগত সরকারের আমলে অনিয়ম করে উচ্চপদে বসার অভিযোগ রয়েছে।

​মন্ত্রণালয় এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত না নিলেও ব্রি’র সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবস্থান খুবই স্পষ্ট। তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, কোনোভাবেই ফ্যাসিবাদী ঘরানার কাউকে মহাপরিচালক হিসেবে মেনে নেওয়া হবে না। যদি বিতর্কিত বা আওয়ামীপন্থী কাউকে এই পদে বসানোর চেষ্টা করা হয়, তবে ব্রি’র সকল স্তরের কর্মচারীরা ঐক্যবদ্ধভাবে তা প্রতিহত করবে।

​কৃষি মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের দিকে এখন তাকিয়ে আছে পুরো ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট। ব্রি’র বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যোগ্য, সৎ এবং নিরপেক্ষ কোনো গবেষককে এই পদের জন্য মনোনীত করবে, যা বাংলাদেশের কৃষি খাতের ভবিষ্যতের জন্য মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে

Leave a Reply

Your email address will not be published.