মেহেদী হাসান রাসেল
তখন আমি বেশ ছোট, সালটা ঠিক মনে পড়ছে না। একটু ভাবলে হয়তো সালটা বের করা যাবে, কিন্তু এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে গভীর চিন্তা করতেও কেন যেন এখন আলসেমি লাগে। তবে সেই সময়টার স্মৃতিগুলো এখনো মনের আয়নায় বড্ড স্বচ্ছ। আমি তখন তৃতীয় কি চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ি। আমাদের কাছে পহেলা বৈশাখ মানেই ছিল খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠা।
বাবা ছিলেন আমাদের সেই ভোরের অ্যালার্ম। খুব ভোরে শিয়রে এসে ডাকতেন, আর আমরাও এক লাফে বিছানা ছাড়তাম। পহেলা বৈশাখের প্রথম প্রহরে মায়ের হাতের সেই বিশেষ খাবারটির স্বাদ আজও জিভে লেগে আছে। আগের দিন রাতে ভিজিয়ে রাখা পান্তা ভাত, সাথে কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ আর মচমচে ইলিশ মাছ ভাজা। খেতে খেতে মা-বাবার কত শত গল্প চলত! সেই গল্পের মাঝে থাকতো এক অদ্ভুত মায়া।
খাওয়া শেষ করেই বের হতাম পাড়ার মোড়ে। সেখানে এক উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হতো। পাড়ার চাচা-জেঠারা মিলে গরু জবাই দিতেন। বড়দের মুখে শুনতাম, বছরের প্রথম দিনটা যদি আনন্দ আর উৎসবে কাটানো যায়, তবে নাকি বাকি দিনগুলোও বেশ ভালো কাটে। গরু জবাইয়ের সেই কর্মযজ্ঞ দেখা থেকে শুরু করে দুপুরের সেই গরুর মাংস দিয়ে তৃপ্তির খাওয়া-সে এক আলাদা আনন্দ।
তবে আমার আসল লক্ষ্য থাকতো অন্য জায়গায়। দুপুরের খাওয়া শেষ করেই শুরু হতো আব্বাকে রাজি করানোর মিশন। যেভাবেই হোক, আব্বাকে নিয়ে মেলায় যেতেই হবে। বাড়ির কাছেই বিশাল এক মেলা বসত। দুপুরের তপ্ত রোদ একটু কমতে না কমতেই আলমারি থেকে বের করতাম প্রিয় সেই সাদা টি-শার্টটি, যার বুকে বড় করে লেখা থাকত ‘এসো হে বৈশাখ’। সেই শার্ট গায়ে চড়িয়ে মেলায় যাওয়ার আনন্দ ছিল রাজকীয়।
মেলায় গিয়ে আমার প্রথম কাজ ছিল বাঁশি কেনা। একটা লম্বা, বড় বাঁশি। বন্ধুদের মধ্যে কার বাঁশিটা সবচেয়ে বড় হবে, তা নিয়ে এক নীরব প্রতিযোগিতা চলত আমাদের মনে। তারপর মেলা ঘুরে ঘুরে খেলনা গাড়ি কেনা, চিনির সাজ বা মণ্ডা-মিঠাইয়ের ঘ্রাণ এসবই ছিল আমার শৈশবের পহেলা বৈশাখ। আজ যখন পেছনে ফিরে তাকাই, নববর্ষের কথা বলতে গেলেই এই দৃশ্যগুলো সবার আগে চোখে ভাসে।
পহেলা বৈশাখ এখনো আসে, নিয়ম করে প্রতি বছর ক্যালেন্ডারের তারিখ বদলে যায়। তবে সেই রঙিন দিনগুলো এখন কেবল স্মৃতির ফ্রেমে বন্দি। এখন আমি বড় হয়েছি। কাঁধে চেপেছে পড়াশোনা, চাকরি আর ব্যবসার পাহাড়সম দায়িত্ব। সব সামলে এখন আর মেলায় যাওয়া হয়ে ওঠে না। বৈশাখের সকালে সেই আলসেমি মাখা ঘুম এখন অলীক কল্পনা; বরং ভোরের আলো ফোটার আগেই ল্যাপটপের নীল আলোয় চোখ রাখতে হয়। ইনবক্সে জমা হয়ে থাকে ক্লায়েন্টের জরুরি ইমেইল কিংবা কোনো প্রজেক্টের ডেডলাইন।
শৈশবে বৈশাখ ছিল কেবল নির্ভেজাল আনন্দের নাম, আর এখন বৈশাখ মানেই ব্র্যান্ডিং স্ট্র্যাটেজি, ক্যাম্পেইন লঞ্চ আর মার্কেটিং ফানেল মেলানোর ব্যস্ততা। মাটির মেলার সোঁদা গন্ধের বদলে এখন সময় কাটে ডিজিটাল স্ক্রিনের ‘ভার্চুয়াল’ ভিড়ে। এখন বৈশাখের আগেই আমাকে ভাবতে হয় বিজ্ঞাপনের স্ক্রিপ্ট নিয়ে। মানুষের আবেগকে পুঁজি করে কীভাবে একটা ব্র্যান্ডকে তুলে ধরা যায়, সেই শব্দ খুঁজতে খুঁজতে নিজের আবেগগুলো কখন যে যান্ত্রিক হয়ে গেছে, তা টেরও পাইনি।
তবুও, দিনশেষে যখন ল্যাপটপ বন্ধ করি, চারপাশটা যখন নিস্তব্ধ হয়ে আসে, তখন যেন সেই পুরনো বাঁশির সুরটা কোথাও অস্পষ্টভাবে বেজে ওঠে। বড় হওয়ার এই এক বিষাদময় যন্ত্রণা আমাদের প্রিয় উৎসবগুলো এখন হৃদয়ের স্বতঃস্ফূর্ততা হারিয়ে ক্যালেন্ডারের লাল পাতায় আটকে গেছে।
উৎসবের ধরণ পাল্টেছে, পাল্টেছে পালনের আঙ্গিক। পান্তা-ইলিশ এখন হয়তো এক প্রকার আভিজাত্য বা কেবলই ঐতিহ্যের প্রদর্শনী। তবুও মনের কোনো এক কোণে বিশ্বাস করি, বৈশাখের সেই আদি আর অকৃত্রিম অনুভূতিটা আজও রয়ে গেছে বুকের কোনো এক নিভৃত কোণে। হয়তো সেই বাঁশিটা আর হাতে নেওয়া হয় না, কিন্তু বৈশাখ এলেই নিজের অজান্তেই আমি সেই ছোটবেলার ‘আমি’টাকে খুঁজে ফিরি। ব্যস্ত এই শহরের ভিড়ে আজও বৈশাখ আসে নতুনের বার্তা নিয়ে, আর আমি সেই বার্তার মাঝে আমার হারিয়ে যাওয়া শৈশবকে খুঁজি।

Leave a Reply