মস্কোর রেড কার্পেটে লাল শাড়িতে ভাবনা: আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলার ‘যাত্রাপালা’র গল্প

মস্কোর রেড কার্পেটে লাল শাড়িতে ভাবনা: আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলার ‘যাত্রাপালা’র গল্প

অনলাইন ডেস্ক

​বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ চলচ্চিত্র উৎসব ‘মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব’-এর ৪৬তম আসরে উজ্জ্বল উপস্থিতি জানান দিল বাংলাদেশ। উৎসবের রেড কার্পেটে এবার সবার নজর কেড়েছেন বাংলাদেশের তরুণ নির্মাতা আসিফ ইসলাম এবং মেধাবী অভিনেত্রী আশনা হাবিব ভাবনা। তাঁদের নতুন চলচ্চিত্র ‘কিং ইন দ্য ল্যান্ড অব দ্য প্রিন্সেস’ (King in the Land of the Princess) উৎসবের সম্মানজনক ‘আর্টকোর’ (Art-Core) বিভাগে নির্বাচিত হয়েছে।

​মস্কোর কনসার্ট হল ‘রসিয়া’র সামনে বিছানো রেড কার্পেটে অভিনেত্রী ভাবনাকে দেখা যায় জমকালো লাল পাড়ের সাদা শাড়িতে, যা আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাঙালির ঐতিহ্যকে ফুটিয়ে তুলেছে। পাশে পরিচালক আসিফ ইসলামও তাঁর মার্জিত উপস্থিতিতে নজর কাড়েন। উৎসবের উদ্বোধনী আয়োজনে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের চলচ্চিত্র সমালোচক ও নির্মাতাদের মাঝে বাংলার এই সিনেমার জয়জয়কার লক্ষ্য করা গেছে।

​সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের আনন্দের মুহূর্তটি ভক্তদের সঙ্গে শেয়ার করেছেন পরিচালক আসিফ ইসলাম। তিনি বলেন:

​”আমার নতুন চলচ্চিত্র ‘কিং ইন দ্য ল্যান্ড অব দ্য প্রিন্সেস’ মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের আর্টকোর বিভাগে নির্বাচিত হয়েছে। এই স্বীকৃতি আমার জন্য বিশাল এক প্রাপ্তি। আমি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ এবং উচ্ছ্বসিত। এই দীর্ঘ যাত্রার প্রতিটি মুহূর্ত আমি সবার সঙ্গে ভাগ করে নিতে প্রস্তুত।”

​আসিফ ইসলাম আরও জানান, বৈশ্বিক মঞ্চে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে উপস্থাপন করতে পারাটাই বড় সার্থকতা। আর্টকোর বিভাগটি মূলত চলচ্চিত্রের নান্দনিক ও শৈল্পিক গুণকে প্রাধান্য দেয়, যেখানে বাংলাদেশের এই সিনেমাটি স্থান করে নেওয়া বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

​অভিনেত্রী আশনা হাবিব ভাবনা এই চলচ্চিত্রে এক শক্তিশালী এবং জটিল চরিত্রে অভিনয় করেছেন। সিনেমার মূল কাহিনী আবর্তিত হয়েছে বাংলার হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী লোকনাট্য ‘যাত্রাপালা’-র বর্তমান করুণ দশা নিয়ে।

​ভাবনার ভাষায়, সিনেমাটি কেবল বিনোদন নয়, বরং একটি বিলুপ্তপ্রায় শিল্পের অবক্ষয়ের দলিল। তিনি বলেন: বাংলার যাত্রাপালা একসময় মানুষের বিনোদনের প্রধান উৎস ছিল। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে এবং আধুনিকতার নামে অশ্লীলতার চাপে এই শিল্পটি কীভাবে ধ্বংসের পথে, তা-ই এখানে দেখানো হয়েছে।

গল্পে ‘প্রিন্সেস’ চরিত্রটি একজন আবেদনময়ী নৃত্যশিল্পী। বাণিজ্যিক চাহিদা এবং দর্শকদের সস্তা বিনোদনের খোরাক জোগাতে মঞ্চ দখল করে নেয় এই ‘প্রিন্সেস’ সংস্কৃতি, যার আড়ালে ঢাকা পড়ে যায় মূল যাত্রাশিল্পী বা অভিনেতাদের মেধা।

​‘কিং ইন দ্য ল্যান্ড অব দ্য প্রিন্সেস’ সিনেমায় উঠে এসেছে শিল্পীদের টিকে থাকার লড়াই। যাত্রাপালার যে মঞ্চে একসময় পৌরাণিক বা ঐতিহাসিক বীরদের কাহিনী উচ্চারিত হতো, সেখানে এখন কীভাবে নগ্ন নৃত্য বা স্থূল বিনোদনের আধিপত্য বিস্তার হয়েছে, পরিচালক আসিফ ইসলাম অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে তা ফুটিয়ে তুলেছেন। সিনেমার ‘কিং’ চরিত্রটি হারানো সেই গৌরব ফিরে পাওয়ার আকুতি নিয়েই পুরো গল্প এগিয়ে নিয়ে যান।

​মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশের সিনেমার এই অংশগ্রহণ বিশ্ব সিনেমার মানচিত্রে আমাদের অবস্থানের জানান দিচ্ছে। এর আগে ‘মরীচিকা’ বা ‘আদিম’-এর মতো সিনেমাগুলো এই উৎসবে প্রশংসা পেলেও, যাত্রাপালার মতো একটি লোকজ বিষয় নিয়ে আসিফ ইসলামের কাজ সিনেমা বোদ্ধাদের নতুন করে ভাবাচ্ছে।

​বিশেষজ্ঞদের মতে, লোকনাট্যের এই অবক্ষয় কেবল বাংলাদেশের সমস্যা নয়, দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশেই লোকসংস্কৃতির এই রূপান্তর এক বড় সংকট। ফলে রাশিয়ার দর্শকদের কাছেও এই গল্পের আবেদন থাকবে চিরন্তন।

​মস্কোর ঠান্ডা আবহাওয়ায় বাংলাদেশের এক টুকরো উষ্ণতা নিয়ে আসা এই সিনেমাটি কেবল একটি উৎসবের অংশ নয়, বরং এটি আমাদের শেকড়ের গল্প। ভাবনা এবং আসিফের এই যাত্রা দেশের চলচ্চিত্র প্রেমীদের মধ্যে আশার আলো জাগিয়েছে। বাংলার ‘যাত্রাপালা’ যেন আবার তাঁর হারানো সিংহাসন ফিরে পায়, সেই বার্তাই পৌঁছে গেল মস্কোর রাজপথে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.