বেকারত্ব দূরীকরণে বৃত্তিমূলক শিক্ষার বিকল্প নেই: সময়ের দাবি দক্ষ মানবসম্পদ

বেকারত্ব দূরীকরণে বৃত্তিমূলক শিক্ষার বিকল্প নেই: সময়ের দাবি দক্ষ মানবসম্পদ

নজমুল হক, স্টাফ রিপোর্টার গাজীপুর

বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার বিস্তার বর্তমানে এক বিস্ময়কর পর্যায়ে পৌঁছেছে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি উচ্চশিক্ষায় ভর্তির সুযোগও আগের চেয়ে অনেক সহজতর হয়েছে। কিন্তু এই বাহ্যিক অগ্রগতির আড়ালে দেশে এক গভীর সংকট দানা বাঁধছে—আর তা হলো উচ্চশিক্ষিত বেকারের ক্রমবর্ধমান সংখ্যা। সম্প্রতি এক বিশেষ আলোচনায় বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ প্রফেসর ড. মো: আবু তালেব মত প্রকাশ করেছেন যে, বাংলাদেশের এই বেকারত্ব সমস্যা সমাধানের একমাত্র কার্যকর পথ হলো বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষার প্রসার।

​ দেশের শ্রমশক্তি জরিপের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে ২৬ লাখ বেকারের মধ্যে প্রায় ৮ লাখ ৮৫ হাজারই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক ডিগ্রিধারী। অর্থাৎ দেশের মোট বেকারের একটি বিশাল অংশ উচ্চশিক্ষিত। পরিসংখ্যান বলছে, স্নাতকদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১৩.৫ শতাংশেরও বেশি, যা অন্য যেকোনো শিক্ষাগত যোগ্যতার তুলনায় সর্বোচ্চ। এই চিত্র প্রমাণ করে যে, দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা কেবল তাত্ত্বিক জ্ঞানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, যেখানে কর্মমুখী দক্ষতার চরম অভাব রয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও (আইএমএফ) বাংলাদেশের এই ‘স্কিল গ্যাপ’ বা দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের মধ্যকার ব্যবধান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের প্রায় ৬০ শতাংশ শিক্ষার্থী এমন সব বিষয়ে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিচ্ছেন যার সাথে শ্রমবাজারের বাস্তব চাহিদার কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই। এর ফলে একদিকে যেমন ডিগ্রিধারী বেকার বাড়ছে, অন্যদিকে দেশীয় শিল্পখাত দক্ষ শ্রমিকের অভাবে ভুগছে। এই অদ্ভুত বৈপরীত্যের কারণে দেশের অর্থনীতি কাঙ্ক্ষিত গতি পাচ্ছে না। বর্তমানে দেশে প্রায় এক কোটি মানুষ আংশিক বেকার হিসেবে জীবন অতিবাহিত করছেন, যারা তাদের মেধা বা যোগ্যতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কাজ পাচ্ছেন না।

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হলো রেমিটেন্স। কিন্তু দক্ষ জনশক্তির অভাবে প্রবাসী বাজারেও বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে। বর্তমানে বিদেশে কর্মরত অধিকাংশ বাংলাদেশি অদক্ষ শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন, যার ফলে তাদের আয় অনেক কম। যদি পরিকল্পিতভাবে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা নিশ্চিত করা যায়, তবে একই সংখ্যক কর্মী পাঠিয়ে বর্তমানে অর্জিত রেমিটেন্সের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি অর্থ দেশে আনা সম্ভব হবে। বিশেষ করে আইটি, স্বাস্থ্যসেবা এবং নির্মাণ শিল্পে দক্ষ কর্মীর বিশ্বব্যাপী যে চাহিদা রয়েছে, তা কাজে লাগাতে পারলে দেশের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।

প্রফেসর আবু তালেব এই সংকট থেকে উত্তরণে তিনটি মৌলিক সুপারিশ প্রদান করেছেন:- উচ্চশিক্ষায় ভর্তির অযৌক্তিক সম্প্রসারণ বন্ধ করে শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা। মাধ্যমিক স্তর থেকেই বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত ও জনপ্রিয় করা।শিল্পখাতের সাথে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যকর সংযোগ স্থাপন করা যাতে শিক্ষার্থীরা হাতে-কলমে শিখতে পারে।

​সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে তিনি চিহ্নিত করেছেন সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিকে। আমাদের সমাজে এখনো কারিগরি শিক্ষাকে ‘দ্বিতীয় শ্রেণির’ শিক্ষা হিসেবে দেখা হয়। অথচ বাস্তব সত্য হলো, একজন দক্ষ টেকনিশিয়ান বা কারিগর অনেক সময় সাধারণ গ্রাজুয়েটের চেয়ে বেশি আয় করেন এবং দ্রুত কাজ খুঁজে পান।

​বাংলাদেশ বর্তমানে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনসংখ্যাগত সুবিধার এক স্বর্ণালী সময় পার করছে। এই বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীকে যদি কারিগরি শিক্ষায় দক্ষ করে তোলা না যায়, তবে তারা দেশের জন্য আশীর্বাদ না হয়ে বড় বোঝায় পরিণত হতে পারে। টেকসই উন্নয়ন ও বেকারমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসার এখন আর কোনো বিলাসিতা নয়, বরং সময়ের অনিবার্য দাবি। সঠিক পরিকল্পনা ও আধুনিক কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমেই এই জনশক্তিকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব।

Leave a Reply

Your email address will not be published.